সনাতন ধর্মে মানব জীবন প্রকৃত অর্থে বড়ই রহস্যময়। আমাদের সনাতন ধর্মশাস্ত্র মানবজীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ও পৃথিবীতে সংক্ষিপ্ত এই জীবন পরিক্রমার দিক নির্দেশনা দেওয়া আছে। এই জীবন বাস্তবমুখী। সব যেন নিউটনের সূত্রের মত প্রতিটি ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া পরমাত্মা যেন সৃষ্টির বিধান করে রেখেছেন। কার্য, কারণ, জন্ম, মৃত্যু এবং পুনজন্মের বৃত্তকারে পরম্পরাই হল সংসার। এই সংসারে মানবাত্মা তার সংস্কার লাভ করে তার শারীরিক ও মানবিক কর্মের মধ্যে দিয়ে। মানুষ মৃত্যুর পর তার সংস্কার বিদ্যমান থাকে। এই সংস্কারগুলো পরজন্মে তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করে।
অন্যভাবে বলতে গেলে জন্মান্তরবাদের সাথে কর্মফলের ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে। পার্থিব জগতে মানুষকে কর্ম করতে হয়। সে যেন প্রকৃতির মধ্যে অবশ হয়েই কর্ম সম্পাদন করে। কর্ম সম্পাদনের ফলে কর্মফলের উৎপত্তি ঘটে আর জীব পুনরায় জন্মগ্রহণ করে সেই কর্মফল ভোগের জন্যেই জীবের এই জন্মের কর্ম অনুসারে তার পরবর্তী জন্ম হবে। এই জন্মের ফল আগামী জন্মে তাকে ভোগ করতে হবে। তাহলে স্বভাবত প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক তাহলে কি জীব জন্ম মৃত্যুর চক্রে ঘুরতেই থাকবে। প্রশ্নের উত্তর হবে 'না'। পূণ্য কর্মের দ্বারা জীব এক সময় মোক্ষ লাভ করেন। পুণঃজন্মের এই চক্র থেকে পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলনই হল মুক্তি বা মোক্ষ। এই মোক্ষ লাভই হিন্দু ধর্মের মূল লক্ষ্য।
নাভুক্তং ক্ষীয়তে কর্ম কল্প কোটি শতৈরপি।
অবশ্যমেব ভোক্তব্যং কৃতংকর্ম শুভাশুভম্”।।
অবশ্যমেব ভোক্তব্যং কৃতংকর্ম শুভাশুভম্”।।
অর্থাৎ— মানুষকে তার কর্মফল ভোগ করতেই হবে।আর সেই কর্মফল ভোগ করতে যদি শতকোটি জন্ম লাগে তবুও তাকে বার বার আসতে হবে, অভুক্ত কর্মফল ভোগ করার জন্যে জন্ম নিতে হবে। কেননা, যতক্ষণ এই কর্মফল ভোগ শেষ না হচ্ছে, ততক্ষণ তার মুক্তি বা মোক্ষ কিছুই হবে না।
পুনর্জন্মের অর্থ হলোঃ— “জীবের মৃত্যুর পর আত্মা পুনরায় নতুন দেহ ধারণ করে”।
সুতরাং একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই যে, কর্মফল বাদ হিন্দু ধর্মের অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর। আধুনিক বিজ্ঞান নিজেও এই সত্য স্বীকার করতে বাধ্য যে কারণ ছাড়া যেমন কোনো কাজ হয়না তেমনি কোনো কাজ করলে সেখানে ফলাফল থাকবেই। হিন্দু ধর্মে এই কার্য কারণ সম্পর্ককে হেতুবাদও বলে। তাই হিন্দু ধর্ম ঘোষণা করে সৎ বা অসৎ যে কোন কর্মের ফল উৎপন্ন হবেই। যে কোনো ব্যক্তি এই সৎ বা অসৎ কর্ম সম্পাদন করুক না কেন তাকে সেই কর্মের ফল ভোগ করতে হবে। সনাতন ধর্মের দুইটি মূল ভিত্তি কর্মফল ও জন্মান্তরবাদ। কর্ম করলে কর্মানুযায়ী ফল হবে, সনাতন ধর্মের বিখ্যাত এই তত্ত্বটি পাশ্চাত্যবিশ্বে Karma বলে বর্তমানে পরিচিত। এই সংস্কৃত শব্দটি এতই প্রভাবশালী যে Karma শব্দটি বর্তমানে ইংরেজি অভিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সারাজীবন অপকর্ম করে কোন বিশেষ স্থানে ভ্রমণ করলে বা কোন বিশেষ রাতে প্রার্থনা করলে কর্মফল মোচন হয় না। কর্ম করলে তার ফল অবশ্যম্ভাবী। ঈশ্বর কদাপি বৈষম্য বা পক্ষপাত করেন না। পবিত্র বেদের কর্মফল নিয়ে অতি তাৎপর্য ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্র আজ আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবো।
ডাঃ তুলসীরাম শর্মাকৃত অথর্ববেদের সংস্কৃত বেদমন্ত্র ও ইংরেজি অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো—
पुनः॑ कृ॒त्यां कृ॑त्या॒कृते॑ हस्त॒गृह्य॒ परा॑ णय।
स॑म॒क्षम॑स्मा॒ आ धे॑हि॒ यथा॑ कृत्या॒कृतं॒ हन॑त् ॥
(अथर्ववेद - काण्ड » 5; सूक्त » 14; मन्त्र » 4)
পুনঃ কৃত্যাং কৃত্যাকৃতে হস্তাগৃহ্য পরা ণয়।
সমক্ষমস্মা আ ধেহি যথা কৃত্যাকৃতং হনৎ।।
(অথর্ববেদ, ৫/১৪/৪)
ইংরেজি অনুবাদঃ— And also, having caught up the evil deed in hand, send it back in this way: Put it right in front of him so that he face it himself and it may, by itself, destroy him.
বাংলা অর্থ হলোঃ— এবং এছাড়াও, মন্দ কাজটি হাতে ধরার পরে, এটিকে এইভাবে ফেরত পাঠান: এটি তার সামনে রাখুন যাতে সে নিজেই এটির মুখোমুখি হয় এবং এটি নিজেই তাকে ধ্বংস করতে পারে।
অনুবাদে মূলকথা হলোঃ— অসৎকর্ম আমাদের হতে দূরে থাকুক। কারো নিজ হস্তে কৃত অসৎকর্ম তার নিজ সম্মুখেই ফিরে আসে আর সেই অসৎ কর্মই তার হনন করে।
उदे॒णीव॑ वार॒ण्य॑भि॒स्कन्धं॑ मृ॒गीव॑।
कृ॒त्या क॒र्तार॑मृच्छतु ॥
(अथर्ववेद - काण्ड » 5; सूक्त » 14; मन्त्र » 11)
উদেণীব বারণ্য ভিস্কন্দং মৃগীব।
কৃত্বা কর্তারমৃচ্ছতু।।
(অথর্ববেদ, ৫/১৪/১১)
ইংরেজি অনুবাদঃ— Let the evil deed turn upon the perpetrator like a doe at bay, a female elephant or a tigress pouncing upon the hunter.
বাংলা অর্থ হলোঃ— মন্দ কাজটি অপরাধীর উপর পরিণত হোক যেমন উপসাগরে ডোবার মত, একটি মহিলা হাতি বা বাঘিনী শিকারীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
অনুবাদে মূলকথা হলোঃ— অসৎকর্ম কর্তার দিকেই ফল হয়ে ফিরে আসে যেমন মৃগ ব্যাধের দিকে, বাঘ শিকারীর দিকে, হস্তী লুব্ধকের দিকে ফিরে আসে।
इष्वा॒ ऋजी॑यः पततु॒ द्यावा॑पृथिवी॒ तं प्रति॑।
सा तं मृ॒गमि॑व गृह्णातु कृ॒त्या कृ॑त्या॒कृतं॒ पुनः॑ ॥
(अथर्ववेद - काण्ड » 5; सूक्त » 14; मन्त्र » 12)
ইস্বা ঋজীয় পততু দ্যাবাপৃথিবী তং প্রতি।
সা তং মৃগমিব গৃহ্নাতু কৃত্যা কৃত্যাকৃতং পুনঃ।।
(অথর্ববেদ, ৫/১৪/১২)
ইংরেজি অনুবাদঃ— O heaven and earth, let the evil deed turn and fall back upon the evil doer fast and straight like an arrow and seize him like a tiger seizing its prey.
বাংলা অর্থ হলোঃ— হে স্বর্গ ও পৃথিবী, মন্দ কাজটি তীরের মতো দ্রুত এবং সোজা দুষ্টের উপর ফিরে আসুক এবং বাঘের মতো তার শিকারকে ধরে ফেলুক।
অনুবাদে মূলকথা হলোঃ— দ্যুলোক ও পৃথিবীলোকে দুষ্টকর্ম ফল হয়ে ফেরত আসে কর্তার দিকে যেমন উপরে ছোঁড়া ধনুক নিচের দিকে দ্রুত তেড়ে আসে, যেমনটা আসে বাঘ হরিণের দিকে।
अ॒ग्निरि॑वैतु प्रति॒कूल॑मनु॒कूल॑मिवोद॒कम्।
सु॒खो रथ॑ इव वर्ततां कृ॒त्या कृ॑त्या॒कृतं॒ पुनः॑ ॥
(अथर्ववेद - काण्ड » 5; सूक्त » 14; मन्त्र » 13)
অগ্নিরিবৈতু প্রতিকূলমনুকূলমিবোদকম্।
সুখো রথ-ইব বর্ততাং কৃত্যা কৃত্যাকৃতং পুনঃ।।
(অথর্ববেদ, ৫/১৪/১৩)
ইংরেজি অনুবাদঃ— Let the deed turn and come back upon the doer like a smoothly moving chariot, punitive like fire to the evil doer, and favourable and cool like water to the person who does good.
বাংলা অর্থ হলোঃ— কাজটি ঘুরে দাঁড়াও এবং একটি মসৃণ চলমান রথের মতো ক্রিয়াকারীর উপর ফিরে আসুক, দুষ্টকারীর জন্য আগুনের মতো শাস্তিমূলক এবং যে ভাল কাজ করে তার পক্ষে জলের মতো অনুকূল এবং শীতল।
অনুবাদে মূলকথা হলোঃ— যেমন দ্রুতগামী রথ, তেমনি কর্ম ফল হয়ে দ্রুত ফিরে আসে কর্তার দিকে, তপ্ত অগ্নির ন্যায় প্রতিকূল দণ্ড হয়ে অসৎকর্মার দিকে, শীতল জলের ন্যায় অনুকূল সুখ হয়ে সৎকর্তার দিকে।
মানুষ যে কর্ম করে তার ফল ভোগ তাকেই করতে হয়। প্রতিটি কর্মেরই একটা সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে যদি স্থান-কাল-পাত্র অপরিবর্তিত থাকে। স্থান-কাল-পাত্রের পরিবর্তনের ফলে প্রতিক্রিয়ার ধরণ ও মাত্রায় পরিবর্তন এসে থাকে। মানুষ ভাল বা মন্দ যে ধরণের কর্মই করুক না কেন, তার ফলে তার মনে এক ধরণের বিকৃতি তৈরী হয়। মন সব সময় এই বিকৃতি সরিয়ে পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে চায়। যে বিপরীত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে মন তার পূর্বের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে তাকে বলে কর্মফল ভোগ। এই কর্মফল ভোগ সঙ্গে সঙ্গে হতে পারে আবার নাও হতে পারে। যে ক্ষেত্রে কর্ম করা হয়েছে কিন্তু ফল ভোগ করা হয়নি সেই অভুক্ত কর্মফলকে বলে সংস্কার। প্রতি মুহুর্তে কর্মের মাধ্যমে আমাদের মনে নতুন নতুন সংস্কার তৈরী হয়। এই সংস্কার ভোগ ২, ৪ দিনে হতে পারে ৫, ১০ বা ২০ বৎসরে হতে পারে। আবার এ জন্মে না হয়ে পরবর্তী জন্মেও হতে পারে। আমাদের প্রত্যেকের মনে জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কার পুঞ্জীভুত হয়ে রয়েছে। এই সংস্কার ভোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ মুক্তি বা মোক্ষ পেতে পারে না।
অবিদ্যা জাত প্রকৃতি হতে বন্ধন থেকে তথা দুঃখ থেকে মুক্তি তথা ব্রহ্মে অব্যাহত গতিতে বিচরণ করা হলো মোক্ষ।
(কঠ উপনিষদ, ১/২/১৭)
জীবাত্মার কর্ম স্বার্থ অত: জীবাত্মার ফলও স্বার্থ লাভ করে। মোক্ষে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবস্থান করার পর জীবাত্মার পুনরাবৃত্তি হয়।
"স বা অয়মাত্মা ব্রহ্ম বিজ্ঞানময়ো মনোময়ঃ প্রাণময়শ্চক্ষুর্ময়ঃ শ্রেত্রময়ঃ পৃথিবীময় আপোময়ো ব্যয়ুময় আকাশময়স্তেজোময়োহ- তেজোময়ঃ কামময়োহ কামময়ঃ ক্রোধময়োহ ক্রোধময়ো ধর্মময়োহ ধর্মময়ঃ সর্বময়স্তদ্ যদেতদিদংময়োহদোময় ইতি যথাকারী যথাচারী তথা ভবতি সাধুকারী সাধু ভবতি পাপকারী পাপো ভততি পূণ্যঃ পূন্যেন কর্মণা ভবতি পাপঃ পাপেন। অথো খল্বহু” কামময় এবায়ং পুরুষ ইতি স যথাকামো ভবতি তৎক্রতুর্ভবতি যৎক্রতুর্ভবতি তৎকর্ম কুরুতে যৎ কর্ম কুরুতে তদভিসংপদ্যতে।
(বৃহদারণ্যক উপনিষদ, ৪/৪/৫)
অর্থাৎ— সেই এই আত্মা ব্রহ্মস্বরূপই, ইনিই বিজ্ঞানময় (বুদ্ধিরূপ উপাধিযুক্ত), মনোময়, প্রাণময়, চক্ষুময়, শ্রোত্রময়, পৃথিবীময়, জলময়, বায়ুময়, আকাশময়, তেজোময়, অতেজোময়, কামময়, অকামময়, ক্রোধময়, অক্রোধময়, ধর্মময়, অধর্মময় এবং সর্বময়। ইহা এই প্রকারে গঠিত। যে ব্যাক্তি যে রকম কাজ করে ও যেই রকম আচরণ করে, সে ব্যক্তি সেই রকম হয়- শুভকারী সাধু হয়, পাপকারী পাপী হয়। পূণ্য কর্মের ফলে পুণ্যবান এবং পাপ কর্মের ফলে পাপী হয়। পুরুষ কামময়। সে যেমন কামনা করে সেরকম সংকল্পযুক্ত হয়।
যঃ প্রাণতো নিনিষতো মহিত্বৈক ইদ্রাজা জগতো বভূব। য ঈশে অস্য দ্বিপদশ্চতুষ্পদঃ কস্মৈ দেবায় হবিষা বিধেম॥
(যজুর্বেদ, ২৩/৩)
শব্দার্থঃ— (যঃ) যিনি (প্রাণতঃ) প্রাণী (নিমিষতঃ) অপ্রাণী (জগতঃ) জগতের (মহিত্বা) মহিমা দ্বারা (একঃ) এক (ইহ) ই (রাজা) রাজা বভূব) হইয়াছেন (যঃ) যিনি (অস্য) এই (দ্বিপদঃ) দ্বিপদ (চতুষ্পদঃ) চতুষ্পদকে (ঈশে) শাসন করেন (কস্মৈ) সুখস্বরূপ (দেবায়) পরমাত্মাকে (হবিষা) মনের দ্বারা (বিধেম) উপাসনা করি।
অনুবাদঃ— নিজের মহিমাবলে যিনি চেতন ও জড় জগতের রাজা, যিনি দ্বিপদ ও চতুষ্পদ প্রাণীর উপর শাসন করিতেছেন, সেই আনন্দ স্বরূপ পরমাত্মাকে আমরা মনের দ্বারা উপাসনা করি।
ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ
শ্রী বাবলু মালাকার
সনাতন সংস্কৃতি ও বেদ বেদান্তদর্শন
প্রচারক বাংলাদেশ।
জয় শ্রীকৃষ্ণ, জয় শ্রীরাম,
হর হর মহাদেব।
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার