"আমরা প্রত্যেকে রাজাধিরাজ ঈশ্বরের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী।"
মধু মে জিহবায়াং দধাতু পরমেশ্বর
যেনা হং সর্বপ্রিয়ঃ সর্বজনেভ্যঃ ভূয়ামম ।
অর্থঃ— আলোকের দেবতা! আমাকে মধুর মিষ্টত্বে পূর্ণ করাে, যেন আমি জনসমষ্টিকে বেদের অপরূপ বাণী শােনাতে পারি।
সনাতন হিন্দুদের দৃষ্টিতে ঈশ্বর একমাত্র পরম আরাধ্য দেবতা। অন্য কোনও দেবতাকে ঈশ্বর জ্ঞান করার কোনও প্রশ্ন নাই। ঈশ্বর (দেবতে/দেবাডু/ঈশ্বরণ/কাডাভু/ইরাইবন, এই সব নামেও দক্ষিণ ভারতে অভিহিত হয়ে থাকেন) সর্বব্যাপী এবং সর্বশক্তিমান, কোন কার্য সমাধা করবার জন্যে তাঁর কোনোরকম সহযোগীর প্রয়োজন হয় না। পরমেশ্বর তাঁকেই বলা হয় যাঁর নাম ও রূপ থেকে এই সমগ্র বিশ্বের উৎপত্তি। তাঁরই করুণায় পৃথিবীর অস্তিত্ব বিদ্যমান, তাঁরই ইচ্ছায় এর বিলয়।
ईश्वरः परमैकस्वरूपः ॥
स नित्यः सर्वव्यापी विभुरनादिरनन्तञ्च स निराकारो निरूपो वर्णनातीतो निष्कम्पञ्च ।
क्वचित् शब्दरूपेण स आत्मानं प्रकाशयति स विधाता
कारणानां कारणं तथा सर्वशक्तिमान् तदिच्छापुरणाय कस्यापि सहायस्य प्रयोजनं न वर्तते यत्तो द्वितीयः कोऽपि नास्ति ।
ঈশ্বরঃ পরমৈকস্বরূপঃ
স নিত্যঃ সর্বব্যাপী বিভুরনাদিরনন্তশ্চ স নিরাকারো নিরূপো বর্ণনাতীতো নিষ্কম্পশ।
কচিৎ শব্দরূপেণ স আত্মানং প্রকাশয়তি স বিধাতা
কারণানাং কারণং তথা সর্বশক্তিমান্ তদিচ্ছাপুরণায় কস্যাপি সহায়স্য প্রয়োজনং ন বর্ততে।
যতো দ্বিতীয়ঃ কোঅপি নাস্তি।
ঈশ্বর পরমৈশ্বর্যস্বরূপ, নিত্য, সর্বব্যাপী, অনাদি-অনন্ত, নিরূপ, বর্ণনাতীত, নিষ্কম্প। কখনও কখনও শব্দরূপে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি সৃষ্টিকর্তা, সমস্ত কারণের কারণ, তিনি সর্বশক্তিমান, তাঁর ইচ্ছাপূরণের জন্য তাঁর কোনও সহায়কের প্রয়োজন হয় না।
ঈশ্বর পরম সত্য তাই তাঁর আরেক নাম ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব সনাতন ধর্মের আদি দেবতা হিসাবে বিবেচিত তাই আমাদের সনাতন ধর্মে যেনম ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব এই ত্রিমূর্তি দেবতাকে আলাদা করা উচিত নয়। ত্রিমূর্তি দেবতাকে আলাদা করা সাদৃশ্যের জন্যে ভ্রান্তির উৎপত্তি হয়। সে-বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সনাতন ধর্মের পবিত্র বেদ মতে এই ত্রিমূর্তি আদিতে একজন প্রকৃতিতে তাদের লীলাময় অনন্ত অসীম। ব্রহ্ম শব্দটি 'ব্রহ' মূল থেকে এসেছে, যার অর্থ 'বৃদ্ধি হওয়া, 'প্রসারিত হওয়া' ইত্যাদি। শিব শব্দের উৎপত্তি "শী" ধাতু (শয়ন) থেকে, অথাৎ সবই তথা এই ব্রহ্মান্ডের সবকিছু যার মধ্যে শায়িত বা অধিষ্ঠিত। শিবের মূল শব্দগুলি হল শী যার অর্থ হল "যার মধ্যে সমস্ত কিছু নিহিত, তিনিই পরিব্যাপ্ততা। বিষ্ণু শব্দটির উৎপত্তি 'বিস' থেকে, যার অর্থ ব্যাপ্তি। বিষ্ণু সর্বব্যাপী ঈশ্বর যার আদিও নেই, অন্তও নেই। তাঁর জন্মদাতার প্রয়োজন হয়নি। মানুষই এই পরমপুরুষকে নাম দিয়েছে 'ঈশ্বর', বিভিন্ন ধর্মের লোক তাঁর বিভিন্ন নাম দিয়েছে, হিন্দুরা তাঁকে বলেন ঈশ্বর/ব্রহ্ম প্রভৃতি। ঈশ্বরের প্রতীক 'ॐ'।
পবিত্র বেদ বলেছেনঃ—
इंश्वरः तस्य दूतरूपेण पृथिव्यां प्रेरयति देवान् तस्माच्च मड-लं मनुष्यत्वं प्रापोति ॥
ঈশ্বরঃ তস্য দূতরূপেণ পৃথিব্যাং প্রেরয়তি দেবান্ তস্মাচ্চ মঙ্গলং মনুষ্যত্বং প্রাপ্নোতি।
ঈশ্বর পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে দেবতাদের তাঁর দূতরূপে প্রেরণ করেন, যার ফলে মানবজাতির মঙ্গল হয়।
হিন্দুরা বিশ্বাস করেন যে, ঈশ্বর তাঁর নিজের এক অংশ দেবতারূপে বিশ্ববাসীর কাছে প্রেরণ করেন মানুষকে অধিকতর ফলদায়ী সুসমঞ্জস জীবন যাপনের পথ প্রদর্শনের জন্য।
এই দূতগণকে হিন্দুরা ঈশ্বরের প্রতিরূপ হিসাবে গণ্য করেন এবং তাঁরা দেবতা নামে অভিহিত হন। এঁরা অতিশয় আদৃত ও শ্রদ্ধাস্পদ হিন্দুবীর। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন এই পৃথিবীতে লীলার অন্তে (অর্থাৎ মর্ত্যজীবের ন্যায় পার্থিব জীবনের অবসানে) তাঁরা স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করে ঈশ্বরের মধ্যে লীন হয়ে যান।
হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, দেবতাগণ এই পৃথিবীতে বর্তমান না থেকেও পথপ্রদর্শন ও সাহায্য করতে পারেন। হিন্দুরা এই দেবদূতদের মূর্তি নির্মাণ করে উৎসব করেন এবং তাঁদের মাধ্যমে ঈশ্বরের পূজা করেন। এই দূতদের বলা হয় প্রতিমা অথবা দেবতা। হিন্দুরা জানেন এই মূর্তি ঈশ্বর নন। ঈশ্বরের ওপর মনঃসংযোগ করার জন্য একটি মাধ্যম মাত্র এবং প্রতিমাকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন প্রকৃতপক্ষে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের উপাসনা। যেমন, একজন দেশভক্ত তার জাতীয় পতাকাকে অভিবাদন করে, পৃথিবীর যেখানেই তাকে দেখতে পান না কেন।
সকলেই জানেন জাতীয় পতাকা একখণ্ড বস্ত্র এবং কিছু রঙ মাত্র, সেটি জাতি নয়। তবু জাতীয় পতাকার অসম্মান দেখলে একজন দেশভক্ত তার জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে। জাতীয় পতাকাকে সম্মান প্রদর্শন একপ্রকার মূর্তিপূজা। পাথরের মূর্তির নিকট কেউ প্রার্থনা করে না, ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করে, সেই কারণেই সকল মন্ত্রের প্রারম্ভে প্রথমে 'ॐ' উচ্চারণ করতে হয়। 'ॐ' শব্দের অর্থ "ঈশ্বর সকলের চেয়ে মহৎ”।
পূজার পরে হিন্দুরা মূর্তি বিসর্জন দেন। তাতে প্রমাণ হয়, মূর্তির কোনো গুরুত্বই নেই। মূর্তির মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রতিমার ওপর মনোসংযোগ করাই মূর্তির একমাত্র উপযোগিতা। মূর্তিপূজা উৎসবের আনন্দ উপভোগ, জনসমাগম ও জনসংযোগের উপায়।
হিন্দুধর্ম যখন সারা পৃথিবীতে বিস্তৃত হল, বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন উপজাতির পূজিত অনেক দেবতার মূর্তি হিন্দুধর্মের মূল উৎসব স্রোতের সঙ্গে মিশে গেল। তার ফলে অনেক মূর্তির পূজা হতে আরম্ভ করল। অবশ্য এই মূর্তিগুলির প্রভাব বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ।
উত্তর ভারতের হিন্দুরা মূর্তিকে বলেন দেবতা, ভগবানকে বলেন ঈশ্বর। আদি দেবতা ছিলেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর। মহেশ্বরের পুত্র পূজিত হন কার্তিক নামে। অপরপক্ষে ভারতের দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে তাঁদের পূজা হয় যথাক্রমে মূর্তি/বিগ্রহম/ঈশ্বর/ঈশ্বরাড়/ভগবান বেঙ্কটেশ্বর/ভগবান বালাজী (বিষ্ণু), মুরুগণ/সম্মুখ/কুমার স্বামী (কার্তিকেয়) রূপে।
তবে হিন্দুরা সকলেই এক। তাঁরা সকলেই এক ও অদ্বিতীয়, সর্বব্যাপী সর্বশক্তিমান ঈশ্বর অর্থাৎ পরম ব্রহ্মে বিশ্বাস করেন এবং বিশ্বাস করেন যে ঈশ্বরই সকল কারণের কারণ।
অস্ত্রের ব্যবহারে অথবা জ্ঞানের ক্ষেত্রে অতিমানবিক ক্ষমতার অতিরঞ্জিত বিবরণ দিয়ে কাহিনীকারগণ দেবতাদের সম্পর্কে নানা অলীক কল্পকথার সৃষ্টি করেছেন। অত্যুৎসাহী শিল্পী ও ভাস্করগণ তাঁদের বল্লাহীন কল্পনা অনুযায়ী দেবতাদের মূর্তির অতিপ্রাকৃত রূপদান করেছেন। দেবতারা সকলেই মনুষ্য ছিলেন, প্রাকৃতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে কেউই ছিলেন না। প্রত্যেকেরই একটি করে মস্তক ও দুটি করে হস্ত ছিল।
বেদমন্ত্রে তাঁর এই রূপ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছেঃ—
ॐ त्रिमस्तकानां ज्ञानम् एकशिरे अवस्थितं ।
चतुर्बाहुतुल्यबलं द्विहस्ते रोपितम् ॥
भक्तेच्छापूरणाथं पुनः पुनः आविर्भूतम् ।
प्रणमामि तं हि ईश्वरप्रेरितदूतम् ॥
ওঁ ত্রিমস্তকানাং জ্ঞানম্ একশিরে অবস্থিতং চতুবাহুতুল্যবলং দ্বিহস্তে রোপিতম্।
ভক্তেচ্ছাপূরণার্থং পুনঃ পুনঃ আবির্ভূতম্ প্রণমামি তং হি ঈশ্বরপ্রেরিতদূতম্।
হে ঈশ্বর, তুমি পুনঃপুন মনুষ্যরূপী দেবতাদের প্রেরণ করেছ। দেবতারা অতিশয় জ্ঞানী এবং তাঁদের একটি মস্তকে তিনটি মস্তকের শক্তি। তাঁদের দুটি হাত এত শক্তিশালী যে মনে হয় চারটি হাত কর্মরত। আমরা সকলে ঈশ্বরের দূতদিগকে প্রণাম করি।
গত ২০০০০ বৎসরে হিন্দুরা পেয়েছেন অনেক দেবতা/দেবদূত এবং তাঁদের গ্রহণ করেছেন আদি দেবতা ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বরের অবতার রূপে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ 'রাম', যাঁর জন্ম হয়েছিল ৫০০০ বৎসর আগে এবং 'শ্রীকৃষ্ণ', যাঁর জন্ম হয়েছিল ৩৫০০ বৎসর আগে, তাঁরা উভয়েই বিষ্ণুর অবতার হিসাবে পূজা, প্রেম ও শ্রদ্ধার পাত্র। হিন্দু ঈশ্বরপ্রেমী, সবর্দা ঈশ্বরের সান্নিধ্য আকাঙা করেন। সেই সব সাধারণ হিন্দু যাঁরা বেদ এবং গীতা পাঠ করেননি, তাঁরা মূর্তি পূজা করেন। যাঁরা বেদ ও গীতার জ্ঞানসম্পন্ন, তাঁরা জানেন ঈশ্বরই একমাত্র ভগবান। মানুষ যা কিছু তাঁকে দিতে পারে, ঈশ্বর তার সবই পাওয়ার অধিকারী। মূর্তি শুধুমাত্র তাঁর প্রতীক। একমাত্র ঈশ্বরের উপাসনাই প্রকৃত ফলপ্রদায়ী।
গীতার সপ্তম অধ্যায়ে, কুড়ি নং শ্লোকে স্পষ্ট করে বলা আছে যেঃ—
कामैस्तैस्तैर्हतज्ञानाः प्रपद्यन्तेऽन्यदेवताः ।
तं तं नियममास्थाय प्रकृत्या नियताः स्वया ॥
কামৈস্তৈস্তৈর্হতজ্ঞানাঃ প্রপদ্যয়ন্তেঅন্যদেবতাঃ
তং তং নিয়মমাস্থায় প্রকৃত্য নিয়তাঃ স্বয়া।
যাঁরা নিজ বিচারবুদ্ধি হারিয়েছেন এবং নিজ ইচ্ছা অনুসারে ভ্রান্তিবশে দেবদেবীর গুণাবলীর সমঝদার হয়েছেন তাঁরাই অজ্ঞতাবশে নানান দেবদেবীর মূর্তি পূজা করেন, যখন কিনা সর্বশক্তিমান নিরাকার ব্রহ্মর পূজাই একমাত্র লাভদায়ক।
ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ
শ্রী বাবলু মালাকার
সনাতন সংস্কৃতি ও বেদ
বেদান্তদর্শন প্রচারক, বাংলাদেশ।
জয় শ্রীকৃষ্ণ, জয় শ্রীরাম,
হর হর মহাদেব।
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার