হিন্দু শাস্ত্রে বলা আছে "ভ্রুণ হত্যা মহাপাপ", করলে পড়ে হবে নরকবাস’ একই ভাবে রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায় ভ্রুণ হত্যাকে চরম ভাবে ঘৃণা করে। এবং ইসলাম ধর্মেও ভ্রূণ হত্যা বারণ রয়েছে।
কন্যা ভ্রূণ হত্যা অনগ্রসর উপমহাদেশীয় সমাজে এখনো এক বড় সমস্যা। বিশ্বের সবচেয়ে অধিক ভ্রূণহত্যায় পাকিস্তান এখনো পর্যন্ত প্রথম ভারত দ্বিতীয় এবং বাংলাদেশ পঞ্চম অবস্থায় আছে। পাকিস্তান এর আর্থসামাজিক বিপর্যয় ও এই ধরনের সংবেদনশীল সংবাদ প্রাপ্তির অপ্রতুলতা থাকায় ধরা হয় পাকিস্তানে সরকারী হিসেব ৫০/১০০০ হলেও প্রকৃত সংখ্যা প্রতি ১০০০ এ ৬৫ এর অধিক হবে। ভারতে তা প্রতি ১০০০ এ ৪৭ এবং বাংলাদেশে ৩৯ আজকাল সভ্য সমাজে বৈধ কর্মের আবরণে যে অবৈধ কর্মগুলি চলে আসছে তার মধ্যে একটি হল গর্ভপাত। নিজের গর্ভের সন্তানকে পিতামাতা নৃসংশ ভাবে হত্যা করে চলেছে বর্তমান আধুনিক তথাকথিত সভ্য সমাজ। এর জন্য কোন মানবতাবাদীদের প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না। কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদ এর বিপক্ষে কঠোর অবস্থানে ছিলেন। তিনি তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থাবলীতে এ বিষয়ে বহুবার সতর্ক করেছেন তা ঠিক দেখা গেছে এবং পবিত্র বেদে ও একইরকম বলা হয়েছে।
এখন দেখা যাক গর্ভপাত সম্পর্কে সনাতন শাস্ত্র কি বলে?
শ্রীমদ্ভাগবতে (৩/৩১/৯) শ্লোকে বলা হয়েছে—
অকল্পঃ স্বাঙ্গচেষ্টায়াং শকুন্ত ইব পঞ্জরে।
তত্র লব্ধস্মৃতির্দৈবাৎ কর্ম জন্মশতোদ্ভবম্।।
অর্থাৎ— মাতৃগর্ভে ভ্রুণ পূর্বের শত জন্ম ও কর্মের কথা স্মরণ করতে পারে।" পূর্ব জন্মের কথা স্মরণ রাখা ঋষিদের পক্ষে সম্ভব।
তাই ভাগবতের (৩/৩১/১১) শ্লোকে— নাথমান ঋষির্ভীত এবং (৩/৩১/২২) শ্লোকে—
"দশমাস্যঃস্তুবন্নৃষিঃ"
এই দুটি শ্লোকেই মাতৃগর্ভের ভ্রুণকে ঋষি বলা হয়েছে। তাই গর্ভস্থ শিশুকে হত্যাকরা আর ঋষিকে হত্যাকরা একই কথা। এ বিভৎস হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে পরাশর স্মৃতি (৪/২০) শ্লোকে বলা হয়েছে—
যৎ পাপং ব্রহ্মহত্যায়া দ্বিগুণং গর্ভপাতনে।
প্রায়শ্চিত্তং ন তস্যাস্তি তস্যস্ত্যাগো বিধিয়তে।।
অনুবাদ— ব্রহ্মহত্যায় যে পাপ হয়, গর্ভপাতে তার দ্বিগুণ পাপ হয়। এ পাপের কোন প্রায়শ্চিত্ত নেই। যে গর্ভপাত করাবে তাকে অবশ্যই সমাজ থেকে ত্যাগ করতে হবে"।
মনু তাঁর মনুসংহিতার (৪/২০৮) শ্লোকে বলেছেন—
ভ্রুণঘ্নাবেক্ষিতং-
গর্ভপাত কারী যে অন্ন দর্শন করে সে অন্ন ভক্ষণ করাও পাপ।
"বৃদ্ধসূর্যারুণ কর্মবিপাক"
গ্রন্থে এর শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে—
পূর্বে জনুষি যা নারী গর্ভঘাতকরী হ্যভূত।
গর্ভপাতেন দুঃখার্তা স্যাহত্র জন্মনি জায়তে।। (৪৭৭/১)।
অনুবাদ— যে নারী পূর্বজন্মে গর্ভপাত করিয়েছিল, সে পরবর্তী জন্মে গর্ভপাত দুঃখের ভাগিনী হয় অর্থাৎ তার সন্তান হয় না। (অথবা তার গর্ভপাত ঘটে, বা সন্তান ধারণের ক্ষমতা থাকে না।
ঐ গ্রন্থের (৬৫৯/১) শ্লোকে আরো বলা হয়েছে—
বন্ধ্যেয়ং যা মহাভাগ পৃচ্ছতি স্বং প্রয়োজনম্।
গর্ভপাতরতা পূর্বে জনুষ্যত্র ফলং ত্বিদম্।।
অনুবাদ— যদি কোন স্ত্রীলোক প্রশ্ন করে যে, আমি কি কারণে এ জন্মে সন্তানহীনা হলাম? তাহলে তার উত্তর এই যে, তুমি পূর্বজন্মে গর্ভপাত করিয়েছিলে,- এ তারই ফল।"
ঐ গ্রন্থের (১১৮৭/১) শ্লোকে আবার বলা হয়েছে—
গর্ভপাতন পাপাঢ্যাবভূবপ্রাগ্ ভব্যেহণ্ডজ।
স্যাৎত্রৈব তেন পাপেন গর্ভস্থৈর্যং ন বিন্দতি।।
অনুবাদ— হে অরুন, যে পূর্বজন্মে গর্ভপাতরূপ পাপ কর্ম করে, এই জন্মে সেই পাপের ফলে তার গর্ভ স্থির হয় না। অর্থাৎ অকালে তার গর্ভ নষ্ট হয়ে যায়, সন্তান লাভ হয় না।
তাই এ ধরনের জঘন্যতম পাপ থেকে বিরত থাকা উচিৎ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, হাসপাতাল গুলোতে গর্ভপাত করানোর সমস্ত ব্যবস্থা সরকারি ভাবে আয়োজন করা হয়েছে।
চাণক্য বলেছেন—
"আত্মবৎ সর্বভূতেষু"
অন্যের সুখ দুঃখ নিজের মতো চিন্তা কর, আপনি চিন্তা করুন, আপনি আপনার মায়ের গর্ভে অসহায় অবস্থায় রয়েছেন, আর আপনাকে সেখানে ঔষদ বা যন্ত্র প্রয়োগ করে মেরেফেলা হচ্ছে। আর আপনি যন্ত্রণায় ছটফট করছেন।
এটাকে মানবতা বলা যায়?
আপনি একবার বিবেক দিয়ে বিচার করুন।
পবিত্র বেদ যেখানে কন্যা সন্তান প্রাপ্তিকে বিরাট সৌভাগ্য বলে ঘোষণা করে সেখানে বেদজ্ঞান এর অভাবে ভারত-নেপালের মত জায়গায় প্রচুর কন্যা ভ্রূণহত্যা সংগঠিত হয় যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
পবিত্র (ঋগ্বেদ, ৮/৩১/৮) বলা হয়েছে—
পুত্রিনা তা কুমারিনা বিশ্বমায়ুর্বৈশ্রুতঃ।
উভা হিরণ্যপেশস।।
অর্থাৎ কন্যা সন্তান প্রাপ্তি জগতে সুখের সাথে বেঁচে থাকার ও কল্যান লাভ করার এক হিরণ্য (সোনালী) উপায়।
পবিত্র (ঋগ্বেদ, ১০/১৫৯/৩) বলা হয়েছে—
"মম পুত্র শত্রুহনোহমে দুহিতা বিরাট"
অর্থাৎ পুত্র সন্তান যদি শত্রুঘাতক হয় তবে কন্যা সন্তান বিরাট সৌভাগ্যদায়ক, কন্যা সন্তান প্রাপ্তিতে এই মন্ত্রে বিজয়ী হিসেবে ঈশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে বলা হয়েছে।
(বৃহদারণ্যক উপনিষদ, ৬/৪/১৭) বলা হয়েছে—
"দুহিতামে পণ্ডিতা জায়তে, সর্বম আয়ুঃ ইতি"
(বৃহদারণ্যক উপ, ৬/৪/১৭)।
"আমার বিদুষী কন্যা জন্ম লাভ করুক এবং সে পূর্ণায়ু হোক।"
বৈদিক ধর্মে যে ৫ টি মহাপাতক বা গুরুপাপ এর কথা বলা হয় তার মধ্যে ভ্রূণহত্যা অন্যতম।
(মনুসংহিতা, ৫/৯০) বলা হয়েছে—
পাষণ্ডমাশ্রিতানাঞ্চ চরন্তীনাঞ্চ কামতঃ।
গর্ভভর্ভূদ্রুহাঞ্চৈব সুরাপীনাঞ্চ যোষিতাম।।
অর্থাৎ— যে ব্যাক্তি বেদের অবজ্ঞা করে যে কামাচারি অর্থাৎ একাধিক ব্যাক্তির সাথে যৌন সংসর্গ করে যে সুরাপান করে এবং গর্ভের ভ্রূণহত্যা করে তারা মহাপাতকী অর্থাৎ মহাপাপী।
আপস্তম্ব ধর্মসূত্র (প্রশ্ন ১,৭ম পাতাল, খণ্ড ২১, শ্লোক ৭-৮) বলা হয়েছে—
চুরি করলে, খুন করলে, ভ্রূণ হত্যা করলে, অবৈধ যৌন সংসর্গ করলে, ভ্রূণ হত্যা করলে এবং সুরাপান করলে ব্যাক্তির জাতচ্যুতি হয়।
(ধর্মসূত্র প্রশ্ন ১,৭ম পাতাল, খণ্ড ২১, শ্লোক ৭-৮)
(পরাশর স্মৃতি, ৪/২০) বলা হয়েছে—
"ভ্রূণ হত্যা করলে যে অপরাধ হয় তা কোন ব্যাক্তিকে হত্যা করলে যে অপরাধ হয় তার দ্বিগুন, এর কোনো প্রায়শ্চিত্ত নেই।" (পরাশর স্মৃতি, ৪/২০)।
অর্থাৎ— হিন্দু আইনের সকল শাস্ত্রই ভ্রূণ হত্যাকে মহাপাপ তথা প্রায়শ্চিত্ত সম্ভব নয় এমন পাপ বলে অভিহিত করেছে।
পুত্র সন্তান ও কন্যা সন্তানে কোনো পার্থক্য নেই, কন্যা সন্তানও নিজ গুণে পুত্রের সমান বা তার চেয়েও অধিক সৌভাগ্যজনক হতে পারে।
তোমার গর্ভপাত অর্থাৎ ভ্রুণ হত্যা করিও না আমার বোনদের বলছি এই মহাপাপ থেকে দূরে থাকো, এই জন্মে যদি এই মহাপাপ করো পরের জন্মে মাতৃ শক্তি ধারণ ক্ষমতা পাবে না। আর মৃত্যুর পর নরকেও কিন্তু স্থান পাবে না। সাময়িক সুখের জন্য নিজের মাতৃশক্তি টুকু হারায়ো না। সনাতন ধর্মের বৈদিক শাস্ত্রের এই মর্মবাণী গুলো যেন প্রতিটি হিন্দুদের অন্তরে প্রবেশ করে আমি এই প্রত্যাশা করি।
জয় শ্রীকৃষ্ণ, জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব।
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন ধর্মের প্রচারক, বাংলাদেশ)।
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার