Bablu Malakar

पवित्र वेद धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते

গর্ভাধান কি, গর্ভধান সম্বন্ধীয় তত্ত্ব ও প্রাচীন বাংলায় মাতৃত্ব প্রসবের জন্য প্রস্তুতি কি?

গর্ভাধান অর্থাৎ একজন নারীর নির্দিষ্ট বয়সে মাসিক শুরু হবার পর থেকে প্রতি মাসে একটি করে ডিম্বাণু পরিপক্ব হয়। এই ডিম্বাণু সাধারণত দুই মাসিকের মাঝামাঝি সময়ে ডিমের থলি থেকে ডিম্ববাহী নালীতে আসে। এই সময়ে যদি যৌন মিলন হয়, তাহলে পুরুষের শুক্রাণু যোনিপথ দিয়ে ডিম্ববাহী নালীতে গিয়ে পৌঁছে। সেখানে ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হবার ফলে ভ্রুণ তৈরি হয়। একে গর্ভধারণ বলে। এই ভ্রুণ কয়েক দিন পর জরায়ুতে এসে পৌঁছে এবং সেখানে বড় হয়ে শিশুতে পরিণত হয়।

         গর্ভাধান কি ও গর্ভধান সম্বন্ধীয় তত্ত্ব
গর্ভাধান অর্থ জরায়ুতে শুক্র স্থাপন হিন্দুধর্মের ষোড়শ সংস্কারের প্রথম সংস্কার। এটি স্ত্রীর দ্বিতীয় বিবাহরূপ সংস্কার। গর্ভাধান সংস্কারে স্ত্রীর প্রথম রজোদর্শনের ষোলো দিনের মধ্যে স্বামী পবিত্র হয়ে সন্ধ্যায় সূর্যার্ঘ্য প্রদান করে যথাবিধি বহ্নিস্থাপনের পর পঞ্চগব্য দ্বারা স্ত্রীকে শোধন করে সন্তান উৎপাদনার্থ গ্রহণ করেন। বিবাহিত অর্থাৎ দাম্পত্য জীবনের মূল লক্ষ্য হল সুস্থ-সবল, গুণবান, যশস্বী, ধার্মিক, সুশীল সন্তান প্রাপ্তি। স্ত্রী পুরুষের স্বাভাবিক গঠন এমন যে তারা পরস্পর মিলিত হলে স্ত্রী গর্ভবতী হয়। কিন্তু এই মিলনের জন্য তিথি নক্ষত্র, দিন ক্ষণ, শুভ ও অশুভ বিচার করে দিন নির্ধারণ করা হয় তবে তার সুপ্রভাব সন্তানের ওপর পড়ে।

ধৰ্ম্মশাঙ্গের মতে রজোদর্শনের প্রথম তিনরাত্রির পর গুতবার, তিথি ও নক্ষত্রে গর্ভাধান সংস্কার করবেন। কিন্তু গোভিলের মতে ঋতুমতী স্ত্রীর শোণিতস্রাব বন্ধ হইলে সঙ্গমকাল উক্ত হয়েছে, কোন রাত্রি বা দিনের সংখ্যা নাই। এতে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, ঋতুর পর যতদিন পর্য্যন্ত শোণিতপাত হয়, ততদিন সঙ্গম বা গর্ভাধান করা উচিত নয়, করলে সস্তানের অনিষ্ট হয়। অপর ধর্মশাস্ত্রকারগণ প্রায়শ তিনরাত্রির পরে রক্তপতন বন্ধ হয় বলে থাকেন। প্রথম ঋতুতে গর্ভাধান সংস্কার করিলে তাহার পর আর কোন ঋতুতে সংস্কারের আবগুক হয় না। দেবল বলেন—

“মকৃচ্চ সংস্কৃত নারী সর্ব্ব গর্ভেযু সংস্কৃত”

অর্থাৎ— রমণীগণের এক বার সংস্কার হইলে সকল গর্ভেরই সংস্কার হয়। অতএব গর্ভাধান, পুংসবন ও সীমস্তোন্নয়ন একবারই কর্তব্য।

গোভিলখৃহস্থত্রে গর্ভাধানপ্রণালী এইরূপ লিখিত আছে–
“দক্ষিণেন পাণিনেপস্তমভিমৃশেদ বিষ্ণুর্যোনিং কন্নয়ত্বিতেতিয়চর্চা গর্ভং ধেহি লিনীবালাতি চ সমাপার্টেী সম্ভবতঃ ॥” (গেভিলগুহাস্থত্র ৯,১০৫)।

গার্য্যসূত্র মতে, এই সংস্কারের সূচনায় স্ত্রী যথাবিধি সুসজ্জিত হন এবং স্বামী সৃষ্টি সংক্রান্ত বৈদিক স্তোত্র উচ্চারণ করতে করতে দেবগণকে আহ্বান জানান, যাতে তারা তার স্ত্রীকে গর্ভধারণে সহায়তা করেন। অতঃপর ঋতুর প্রথম তিন দিনের পর শুভদিনে কোনরূপ দোষ বা প্রতিবন্ধক না থাকলে গর্ভাধান করবেন। গর্ভাধানের দিবসে সায়ং সন্ধ্যা অতীত হইলে পতি পবিত্র ভাবে ও পবিত্র, বেশে “নমো বিবস্বতে বিষ্ণু” ইত্যাদি মন্থদ্বারা স্ব্যার্থ প্রদান করিবে।

“পরে বিষ্ণুর্যেনিং কল্পর্কীয়তু ত্বষ্টারূপাণি পিংশভু।
আসিঞ্চতু প্রজাপতি ধাত। গর্ভং দধাতু তে" মন্ত্রত্র ১.৪। ৬)

এই মন্ত্রটি ও “গর্ভং ধেহি সিনাবালি গর্ভং ধেহি সরস্ব শ্রী। গর্ভন্তে অশ্বিনৈ দেব বাপত্তাং পুষ্করত্রজে।” (মন্ত্ররা ১৪৭)
এই মন্ত্রটি উচ্চারণ করে। দক্ষিণ হস্তদ্বারা পত্নীর গোপনাঙ্গ স্পর্শ করবেন এবং তৎপরে উভয়ে সঙ্গত হইবে। একেই গর্ভাধান সংস্কার বলে। স্বামী পুরুষের উৎপাদন ক্ষমতা সংক্রান্ত স্তোত্র উচ্চারণ করতে করতে স্ত্রীর দেহে নিজ শরীর ঘর্ষণ করবেন। আলিঙ্গনের পর পূষণের নিকট প্রার্থনার মাধ্যমে গর্ভস্থাপনের কাজ শুরু হয়। স্বামী স্ত্রীর দক্ষিণ স্কন্ধের উপর থেকে ঝুঁকে তার স্ত্রীর বক্ষ স্পর্শ করেন।

"হে সুবিন্যস্ত কেশধারী, তোমার হৃদয় বাস করে স্বর্গে, বাস করে চন্দ্রে, আমি তাহাকে জানি, তাহা আমাকে জানুক। আমি যেন শত শরৎ বাঁচিয়া থাকি।”

পদ্ধতি প্রণেতা ভবদেবভট্টের মতে যোনিদেশ স্পর্শ করে উপরি কোন কোন মতে বিবাহের ন্যায় গর্ভাধানের দিনে ও আভ্যুদায়িক শ্রাদ্ধ করতে হয়।

(১) ছন্দোগপরিশিষ্টের মতে বিবাহাদি গর্ভাধানান্ত সংস্কারের মধ্যে একটি শ্রাদ্ধ করলেই চলতে পারে, প্রত্যেক কর্ম্মের প্রথমেই আভ্যুদায়িক শ্রাদ্ধ করতে হয় না।

(২) লৌকিক প্রথা অনুসারে অথবা বিলুপ্ত শাখীয় বিধি অনুসারে গর্ভাশয়ের শুদ্ধির জন্য মন্ত্রপূত পঞ্চগয্য তক্ষণ করবার নিয়ম আছে।

বিবাহিত অর্থাৎ দাম্পত্য জীবনের মূল লক্ষ্য হল সুস্থ-সবল, গুণবান, যশস্বী, ধার্মিক, সুশীল সন্তান প্রাপ্তি। যে স্ত্রী পুরুষের স্বাভাবিক গঠন এমন তারা পরস্পর মিলিত হলে স্ত্রী গর্ভবতী হয়। কিন্তু এই মিলনের জন্য তিথি নক্ষত্র, দিন ক্ষণ, শুভ ও অশুভ বিচার করে দিন নির্ধারণ করা হয় তবে তার সুপ্রভাব সন্তানের ওপর পড়ে। তাই আমাদেরকে সবসময় শাস্ত্রের অন্তর্গত নিয়ম গুলো পালন করতে হবে এবং জীবন যাপন করতে হবে। কারন আমাদের পূর্বের মুনি ঋষিরা ও এভাবে চলে আসছে। শাস্ত্রের বহির্গত যে কাজ গুলো আছে তা আমাদের করা উচিত নয় তাই একজন আদর্শ পিতা মাতা হওয়ার প্রারম্ভিক সোপানই হলো, শাস্ত্রের নিয়মকে অনুসরণ করে সন্তান ধারণে প্রবৃত্ত হওয়া।

তাই বিবাহিত জীবনে একজন নারী এবং পুরুষের পূর্ণতা পিতৃত্বে এবং মাতৃত্বে। আর পিতৃত্ব এবং মাতৃত্বের পূর্ণতা একজন সুস্থ-সবল, গুণবান, যশস্বী, সুশীল, এবং কৃষ্ণ ভক্ত সন্তান লাভ করার মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের সনাতন ধর্মের এক তৃতীয়াংশ লোকেরাই জানিনা কেমন করে গর্ভধারণ করতে হয়? কোন প্রকারে সহবাস করলে একজন সুসন্তান লাভ করা সম্ভব? অনেকেই আক্ষেপ করে বলি এমন পিতা মাতার এমন কুসন্তান কোথা থেকে আসলো? আদৌ আমরা তার অন্তর্নিহিত কারন অনুসন্ধান করার চেষ্টা করি না।

এবার চলুন সনাতন শাস্ত্রের আঙ্গিকে যৎকিঞ্চিত আলোচনায় অগ্রসর হওয়া যাক—

সন্তান লাভের মনোরথে স্বামী স্ত্রীর মিলনের জন্য তিথি-নক্ষত্র, দিন-ক্ষণ, শুভ-অশুভ বিচার বিশ্লেষণ আবশ্যক। উপরিউক্ত বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে স্বামী স্ত্রীর সঙ্গম করা অপরিহার্য।

স্মৃতি শাস্ত্রে বর্ণিত আছে—
নিষেকাদ্ বৈজিকং চৈনো গার্ভিকং চাপমৃজ্যতে।
ক্ষেত্রসংস্কার সিদ্ধিশ্চ গর্ভাধানফলং স্মৃতম্ ।।

অর্থাৎ- বিধি বিধান মতো এবং সংস্কার মতো গর্ভাধান থেকে শুভগুণ সম্পন্ন সুযোগ্য সন্তান সৃষ্ট হয়। আর এই সংস্কার থেকেই বীর্য ও গর্ভ সংক্রান্ত পাপের নাশ হয়, দোষ নষ্ট হয়, ক্ষেত্র সংস্কার হয়। এগুলিই হল গর্ভাধান সংস্কারের ফল বা পরিণতি।

নানা সমীক্ষা ও গবেষণার দ্বারা এটা প্রত্যক্ষ প্রমাণিত হয়েছে যে, গর্ভাধান কালে স্ত্রী-পুরুষ যেমন ভাবনায় ভাবিত থাকেন, বা তাদের মানসিক অবস্থা যেমন থাকে তা তাদের রজঃ বীর্যে প্রতিফলিত হয়। সেই থেকে সৃষ্ট সন্তানের উপরে সেই ভাবনা পড়ে। পিতা মাতা যে মানসিকতা নিয়ে সন্তান ধারণে প্রবৃত্ত হন সেই মানসিকতা নিয়ে সন্তানের জন্ম হয়। তাই অনেকে কষ্ট পেয়ে বলেন সন্তানটাকে মানুষ করতে পারলাম না।

শাস্ত্রে বলছেন—
মানুষ যা করার গর্ভকালীন সময়েই হয়ে যায়, পরবর্তীতে শত চেষ্টা করলেও তা পূর্ণতার স্তরে আসীন হয় না। 

সুশ্রত সংহিতায় লেখা আছে— 

আহারাচার চেষ্টা ভিয়াদৃশোভি সমন্বিতৌ ।
স্ত্রীপুংসৌ সমুপেয়াতাং তয়োঃ পুত্রোত্তপি তাদৃশঃ ।।
(সুশ্রত সংহিতা/শরীর ২/৪৩/৫০)।

অর্থাৎ— নর নারী যেমন আহার করবেন, যে ব্যবহার বা প্রচেষ্টায় মিলিত হয়ে পরস্পর সহবাস করবেন, তাদের পুত্র সন্তানও তেমনি স্বভাব প্রাপ্ত হবে।

ভরদ্বাজের মতে রজস্বল স্ত্রী প্রথমদিনে চাণ্ডালী, দ্বিতীয় দিনে ব্রহ্মঘাতিনী ও তৃতীয়দিনে রঞ্জকীর ন্যায় অপবিত্র ও অস্পৃশু হয়। চতুর্থদিবসে শুদ্ধিলাভ করে। চতুর্থদিন হইতে যোলদিন পর্য্যন্ত গর্ভাধানের যোগ্যকাল । বুহজন্নাতকের নিষেকাধায়ে শিথিত আছে যে, গর্ভের প্রথমমাসে শুক্র ৭ শোণিত মিশ্রিত হয়, ইহাকে কললা! বস্থা বলে, এই সময়ের অধিপতি শুক্র । দ্বিতীয়মাসে গর্ভ অপেক্ষাকৃত কঠিন হয়, তাহার অধিপতি মঙ্গল। তৃতীয় মাসে হস্তপদাদি উৎপন্ন হইতে থাকে, তাহার অধিপতি বৃহস্পতি। চতুর্থমাসে অস্তির সঞ্চার হয়, অধিপতি সুর্য্য। পঞ্চমমাসে চর্ম্মের উৎপত্তি, অধিপতি চন্দ্র, ষষ্ঠে রোম জন্মে, তাহার অধিপতি শনি, সপ্তমে চেতনার প্রাদুর্ভাব হয় অধিপতি বুধ; অষ্টমে ভোজন শক্তি উৎপন্ন হয়, লগ্নাধিপতিই তাহার অধিপতি; নবমমাসে উদ্বেগ জন্মে, সেই সময়ের অধিপতি চন্দ্র ও দশমমাসে প্রসব হয়, তাহার অধিপতি স্বর্য্য। যে সকল গ্রহের উল্লেখ করা হইল, গর্ভাধানকালে ইহায় মধ্যে কোন গ্রন্থপীড়িত থাকিলে সেই গ্রহের মাসে গর্ভপাতাদি ঘটিয়া থাকে। আর যদি ইহারা বলবান থাকে, তবে সেই সেই মাসে গর্ভের পুষ্টি হয়। সুশ্রুতের মতে অতিশয় বুদ্ধ, চিররোগিণী বা অন্য কোনরূপ বিকারযুক্ত রমণীর গর্ভাধান করা একান্ত নিষিদ্ধ এবং অতিশয় বৃদ্ধ চিরয়োগগ্রস্ত বা অপর কোন প্রকার বিকারযুক্ত পুরুষের পক্ষেও গর্ভাধান করা উচিত নহে।

গর্ভাধান অমরকোশ ভারতের অভিধানে লিখিত আছে—
"স্ত্রীর গর্ভ বা পেটে পুরুষের বীর্য থেকে জীব বা প্রাণীর সৃষ্টির সূত্রপাত"।
"গ্রন্থাদিতে অভীষ্ট সন্তান প্রাপ্তির জন্য গর্ভাধানের নির্দিষ্ট স্থান এবং কাল নির্দেশ করা আছে"।

                         "हिन्दी में अर्थ"
स्त्री के गर्भ या पेट में पुरूष के वीर्य से जीव या प्राणी की सृष्टि का सूत्रपात।
ग्रंथों में अभिष्ट संतान की प्राप्ति के लिए गर्भाधान की निश्चित स्थिति एवं काल बताया गया है।
              गर्भधारण, गर्भाधान, वीर्याधान।

বাংলাতে অর্থ—
নারীর গর্ভে বা পেটে পুরুষের বীর্য থেকে জীব বা প্রাণীর সৃষ্টির সূচনা।
শাস্ত্রে কাঙ্খিত সন্তান লাভের জন্য কিছু শর্ত ও গর্ভধারণের সময় উল্লেখ করা হয়েছে।
গর্ভধারণ, গর্ভধারণ, গর্ভধারণ।

                            "हिन्दी में अर्थ"
हिन्दू धर्म का वह संस्कार जो गर्भ के धारण के समय होता है।
गर्भाधान संस्कार के द्वारा एक अच्छी संतान की कामना की जाती है।
गर्भधारण, गर्भधारण संस्कार, गर्भाधान, गर्भाधान संस्कार

বাংলাতে অর্থ—
হিন্দু ধর্মের সেই আচার যা গর্ভধারণের সময় ঘটে।
গর্ভাধান সংস্কারের মাধ্যমে একটি ভাল সন্তান কামনা করা হয়।
গর্ভধারণ, গর্ভধারণ অনুষ্ঠান, গর্ভধারণ, গর্ভধারণ অনুষ্ঠান।

Meaning in English—
Any customary observance or practice.
rite, ritual.

বাংলাতে অর্থ—
কোন প্রথাগত পালন বা অনুশীলন.
আচার, আচার।

শাস্ত্রীয় মতে কোন দিন গর্ভধারণ করলে সুসন্তান লাভ সম্ভব জানেন?

সন্তান না থাকা যে কোনও দম্পতির কাছেই এক চরম অভিশাপ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে সন্তান না হওয়ার একাধিক কারণ রয়েছে। এই নিবন্ধে এর ব্যাখ্যা করা হবে না। এখানে দৃষ্টিপাত করা হবে শাস্ত্রীয় মতে কী কী নিয়ম মেনে চলতে পারলে সুসন্তান লাভ অসম্ভব নয়। ঋতুর প্রথম দিন থেকে ১৬ দিন পর্যন্ত স্ত্রীর গর্ভধারণ করার শক্তি থাকে।

দেখে নেওয়া যাক, সুসন্তান লাভ করতে চাইলে কী কী বিষয় মেনে চলা উচিতঃ— ঋতুর প্রথম চার দিন, ১১তম ও ১৩তম দিন সহবাস করবেন না।

রমনীগণের ঋতুর পর ষোড়শ দিন পর্যন্ত গর্ভধারণযোগ্য ক্ষমতা থাকে, ইহাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু সুসন্তানকামী ও সুস্থ শরীরাভিলাষী ব্যক্তি ঋতুর ১ম চারি দিবস ১১শ ও ১৩শ দিবস একেবারেই বর্জন করবে। এই ৬ দিন বাদে বাকি ১০ দিনের মধ্যে উত্তরোত্তর যত বেশী দিন গত করে গর্ভাধান করবে সন্তান ততই ভাল হবে। অর্থ্যাৎ সন্তান বলবান ও ধনবান, সৌভাগ্যশালী ও আয়ুষ্মান হবে।

১) ঋতুর প্রথম চার দিন, ১১তম ও ১৩ তম দিন সহবাস করবেন না।

২) এই ছয় দিন বাদ দিয়ে বাকি দশ দিনের মধ্যে গর্ভাধান করবেন। ৩। এই দশ দিনের মধ্যেও যত বেশি দিন পরে গর্ভধারণ করবেন, সন্তান তত বেশি সুস্থ ও বলবান হবে ও তার পরমায়ু বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ এই ১০ দিন সময়কালের মধ্যে দশম দিন সবচেয়ে কার্যকর। তারপর ক্রমান্বয়ে নবম দিন, অষ্টম দিন ইত্যাদি।

৪) অবশ্য উল্লেখিত এই দশ দিনের মধ্যেও অমাবস্যা, পূর্ণিমা, চতুর্দশী, অষ্টমী ও সংক্রান্তির দিনগুলিতে সহবাস করবেন না। কারণ এই দিনগুলি পুরুষ ও স্ত্রীর শুক্র ও শনি দুষ্ট থাকে। যুগ্ম রাত্রিতে গর্ভাধান করিলে কথা এবং অযুগ্ম রাত্রিতে গর্ভাধান করিলে পুত্র হয়।

৫) জ্যেষ্ঠ, মূলা, মধা, অশ্লেষা, রেবতী, কৃত্তিক, অশ্বিনী, উত্তরাষাঢ়া, উত্তরভাদ্রপদ ও উত্তরফাল্গুনীলক্ষত্রে গর্ভাধান করিবে না। হস্ত। শ্রবণ, পুনর্বসু ও মৃগশিরা * কয়ট নক্ষত্রকে পুংনক্ষত্র বলে, ইহার গর্ভাধানকার্যে শুভ। গর্ভাধান কার্যে রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার এবং বুধ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কণ্ঠা, তুলা, ধল্প ও মীন লগ্ন প্রশস্ত।

৬) রাত্রির প্রথম প্রহরে গর্ভধারণ করলে, সেই গর্ভস্থ সন্তান রুগ্ন ও স্বল্প আয়ুর হয়। রাত্রির দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রহর গর্ভধারণের জন্য খুব একটা ভাল সময় নয়।

৭) চতুর্থ প্রহরে গর্ভধারণ করলে, সন্তান দীর্ঘায়ু ও নীরোগ হয়, পুত্র বা কন্যা সর্ববিষয়ে ভাল হয়।

৮) চতুর্থ প্রহরে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে খুবই উপযুক্ত সময় ও ভাল সময়। কিন্তু ৪র্থ প্রহর বলে ভোর বেলা বা শেষ রাত্রে কেহ গর্ভাধান করবে না। ৩য় প্রহর অতীত হলে ৪র্থ প্রহরের প্রারম্ভে গর্ভাধান করতে হবে।

৯) পঞ্চপর্বে গর্ভাধান নিষিদ্ধ।

১০) সোমবার, বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার রাত্রে সহবাস করলে খুব ভাল। মঙ্গলবার রাত্রে সহবাস না করাই ভাল।

১১) সকাল, সন্ধ্যা এবং দ্বিপ্রহরে সহবাস হানি কারক।

১২) আপনি সন্তান লাভের চিন্তা তখনই করবেন, যখন আপনার শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ থাকবে এবং মনের ভিতর কোনও রূপ খারাপ চিন্তা থাকবে না এবং পেট খালি থাকবে না। তখনই সহবাস করবেন।

১৩) পায়খানা, প্রস্রাব, খিদে ও পিপাসার্ত থাকা অবস্থায় সহবাস করা উচিত নয়।

১৪) যখন সন্তান গর্ভে আসবে, তখন ধর্ম চিন্তা ও সৎ চিন্তা করলে, সন্তান ধার্মিক ও সুখী হয়।

১৫) গর্ভবতী রাগ, হিংসা, মিথ্যা কথা বলা প্রভৃতি অন্যায় আচরণ এবং লোভ করলে গর্ভস্থ সন্তান সেই সমস্ত খারাপ গুণ নিয়ে জন্মায়।

১৬) গর্ভাবস্থায় দিবা নিদ্রা, উপবাস, সহবাস এবং রাত্রি জাগরণ পরিত্যগ করা উচিত।

১৭) রজঃস্বলা অবস্থায় সহবাস করা উচিত নয়। এই সময়ে সহবাস করে গর্ভধারণ হলে এই সমস্ত সন্তান স্বল্পায়ু ও অসুস্থ হয়।

১৮) গর্ভের চতুর্থ মাসে, গর্ভস্থ সন্তানের অঙ্গ ও প্রতঙ্গ ও চৈতন্যের প্রকাশ পায়। এই সময় মা যে ধরনের বিদ্যাচর্চা করবে, সন্তান সেই ধরনেরই গুণ নিয়ে জন্মাবে।

ঋতুকালের চতুর্থ দিনে স্নান করে পবিত্র হয়ে শ্রদ্ধা ভরে সাত্বিক ভাবে ঈশ্বর, মহাপুরুষ দিগকে প্রণাম করে তাহার পর স্বামীর সাথে সহবাস করলে সুশীল, ধার্মিক, উত্তম সন্তান লাভ হয়। রাত ১২ টা থেকে ভোর ৩ টা পর্যন্ত আসুরিক সময় সে সময় সহবাসের ফলে যে সন্তান জন্ম হয়- সে ভক্ত হয়, অর্থাৎ ধার্মিক হয়। রাত ১২ টা থেকে ভোর ৩ টা পর্যন্ত আসুরিক সময় এই আসুরিক সময়কালে সন্তান ধারণ করলে সন্তানের মধ্যে আসুরিক গুণ পরিলক্ষিত হবে।

ঋতুর চতুর্থ, ষষ্ঠ, অষ্টম, দশম, দ্বাদশ, পঞ্চম, সপ্তম, নবম, একাদশ রাত্রে সহবাস অতি উত্তম। একদশী, দ্বাদশী বা কোন ব্রতের আগে বা ব্রতের দিন বা ব্রতের পরের দিন সহবাস করলে সন্তান অসুর হয়ে জন্মায় তাই অমাবস্যা, পূর্ণিমা, চতুর্দশী, রবিবার, সংক্রান্তি, অষ্টমী, গ্রহণ, বারবেলা, কালবেলা, রাক্ষসীবেলা, শণিবার, মঙ্গলবার, পূজা পর্বের দিন সহবাসে উৎপন্ন সন্তান আসুরিক কিংবা রাক্ষস মনোভাব নিয়ে জন্ম নেয়, সেই সন্তান দ্বারা সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র, পিতা- মাতা, আত্মীয় স্বজন সর্বদা উদ্বেগ প্রাপ্ত হবেন তাই ভোরবেলা, সন্ধ্যায় গোধূলি লগ্নে এবং দুপুরে সহবাস নিষিদ্ধ বলা হয়েছে।

দৈত্যমাতা দিতি জোর করে কশ্যপ মুনিকে প্রাতঃকালে সহবাসে বাধ্য করলে তাহাদিগের হিরণ্যক্ষ এবং হিরন্যকশ্যপ নামক দুই অসুর পুত্র ও হোলিকা নামক এক আসুরী কন্যা জন্ম নিয়েছিল।

কেকসী সন্ধ্যাকালে বিশ্রবা মুনিকে সহবাসে বাধ্য করলে তাদের সন্তান রাবণ রাক্ষস হয়। সুতরাং ঐ সময়ে সহবাস নিষিদ্ধ। কেকসী সন্ধ্যাকালে বিশ্রবা মুনিকে সহবাসে বাধ্য করলে তাদের সন্তান রাবণ রাক্ষস হয়, তাই সহবাস দ্বারা যে সন্তান জন্ম নেয় তা রাক্ষস মনোভাব সম্পন্ন হয়, নাম তার রাবণ আর এই রাক্ষস রাবনের আসুরিক মনোভাব আমরা সবাই অবগত সুতরাং ঐ সময়ে সহবাস নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। 

অল্প কথায় গর্ভাধান একটি পবিত্র কর্ম, একটি সাধনা।
শুদ্ধ বস্ত্রে, শুদ্ধ শয্যায়, শুদ্ধ চিত্তে সহবাসে লিপ্ত হতে হয় তবেই সুশীল, ধার্মিক, সুকুমার সুকুমারী পুত্র বা কন্যা সন্তান লাভ হয়। ক্লান্ত, চিন্তিত, ভয়ার্ত, বাহ্যক্রিয়া কিংবা প্রস্রাবের বেগ, ক্ষুধা, পিপাসা, মানসিক প্রতিকূলতার সময় সহবাস নিষিদ্ধ। গর্ভধারণের সময় ধর্ম চিন্তা করলে সন্তান ধার্মিক হবে তা শতসিদ্ধ নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন শাস্ত্র।

গর্ভাধানের আগে এই মন্ত্র পড়তে হয়—

গর্ভং ধেহি সেনাবালি গর্ভং ধেহি প্রথুষ টুকে।
গর্ভং তে অশ্বিনী দেবাবাধাতাং পুষ্কর স্রজৌ ।।

অর্থাৎ— সেনাবালি দেবি! এবং হে বিস্তৃত প্রথুষটুকা দেবী, তুমি এই স্ত্রীকে গর্ভধারণের সামর্থ্য দাও ও তাকে পুষ্ট করো। কমল মালায় অশ্বিনীকুমার ভাতৃদ্বয় তার গর্ভকে পুষ্ট করুন।

তাই আমরা যদি সুসন্তান লাভ করতে চাই তাহলে অবশ্যই স্বামী স্ত্রীকে গর্ভধারণের সময়টাকে সাধনার সময়রুপে গ্রহণ করতে হবে।

মনে রাখা আবশ্যক,
আদর্শ পিতা মাতা হওয়ার প্রারম্ভিক সোপানই হলো, শাস্ত্রের নিয়মকে অনুসরণ করে সন্তান ধারণে প্রবৃত্ত হওয়া।

সুতরাং, সন্তান উৎপাদন করা শুধু এই জন্যই নয় যে সে আপনাকে শেষ বয়সে ভালো-মন্ধ খাওয়াবে, দেখা-শুনা করবে, সেবা করবে। মৃত্যুর পর যদি আপনি আর আমি নিজ কর্ম দোষে নরকগামী হই সেই সন্তান যেনো নরক থেকে উদ্দার করতে পারে। তাই সুষ্ঠ, সবল, ভক্ত ও ধার্মিক সন্তান সবারই কাম্য হউক।

প্রাচীন বাংলায় মাতৃত্ব প্রসবের জন্য প্রস্তুতি

গবেষক আলতেকারের মতে 'মাতৃত্বের ওপরে দেবত্বের আরো ভারতবর্ষে যেমন উচ্চতম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, এমন আর কোথাও নয়'। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এই দেবত্বের আরোপ সমাজে নারীর অবস্থানের চিত্র প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হতে পারে। এটা থেকে বোঝা যায় মায়ের প্রতি সমাজের নিশ্পৃহতা; তবে একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, বাঙালি সমাজে মাতৃত্বের এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা। বাঙালি লোকাচারে মাতৃত্ব আবশ্যিক। একটি মেয়েকে জন্মের পর থেকেই শেখানো হয় ভালো স্ত্রী এবং সর্বোপরি ভালো মা হওয়ার জন্য। বাঙালি লোকাচারে একটা মেয়েকে সবসময়ই একাধিক পুত্রের জননী হওয়ার জন্য আশীর্বাদ দেওয়া হতো। এই প্রসঙ্গে বাঙালী সাহিত্যের অবতারণা এই মন্তব্যটিকে সুদৃর ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। অভিজ্ঞান শকুন্তলম নাটকের চতুর্থ অঙ্কে তপস্বিনীরা গর্ভবতী মেয়েটিকে আশীর্বাদ করেন সে যেন বীরপ্রসবিনী সম্মানটি লাভ করে। এখন দেখা যাক গর্ভাধান এবং গর্ভধারণ অনুষ্ঠানগুলির তাৎপর্য।

১) বিবাহের মূল কারণ—
বিবাহ অনুষ্ঠানের কিছু পরেই নব দম্পতি প্রার্থনা করতেন যেখানে বধু শুধুমাত্র নিরব সমর্থন জানোতো স্বামীর উক্তিতে 'এসো আমরা মিলিত হই, যাতে আমরা পুত্র সন্তান লাভ করতে পারি, সম্পত্তির বৃদ্ধির প্রয়োজনে পুত্রলাভ করতে পারি।' এ সঙ্গে বর আরো প্রার্থনা করতেন 'পুত্র, পৌত্র, দাস, শিষ্য, বস্ত্র, কম্বল, ধাতু, পত্নী, রাজা, অন্ন, নিরাপত্তা।' অন্যদিকে বধূর পক্ষ থেকে শুধুমাত্র প্রার্থনা করা হতো যে, সে যেন কখনোই কোল শূন্য অবস্থায় না থাকে - যা থেকে এটাই বোঝা যায় যে তার কোলে সন্তান যেন সবসময় থাকে। তাই বাঙালি লোকাচারে বিবাহের মূল কারণ সে সময় ছিল পুত্র সন্তান লাভ। সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় যেহেতু একজন পত্নী শুধু যে পুত্রসন্তানই প্রসব করবে এরম নাই হতে পারে, তাই কোন ঝুঁকি না নিয়ে বহু পত্নীর অবতারণা অনেক বর করতেন এবং বহু পত্নীর প্রার্থনা সে নববিবাহিত বধুর সাক্ষাতেই করতেন এবং সামাজিকভাবে এটাই আশা করা হতো যে বধু সেই প্রার্থনা মেনে নেবেন কারণ পুত্র সমৃদ্ধি, বৃদ্ধি, বংশ রক্ষা, সম্পত্তি সবকিছুর জন্যই প্রয়োজনীয়।

২) গর্ভাধান—
গর্ভাধান অনুষ্ঠানটি মূলত পুত্র সন্তানের কামনায়, যার উল্লেখ অথর্ববেদে পাওয়া যায়। শুধুমাত্র অথর্ববেদ না, উপনিসদেও বিভিন্ন রকম সন্তান লাভের জন্য স্বামীর স্ত্রীকে কি কি খাওয়ানো উচিত তার নির্দেশিকা দেওয়া আছে। এক্ষেত্রে প্রার্থনা শুরু হয় 'এস আমরা দুজনে মিলে পুত্র সন্তান লাভের চেষ্টা করি।' মনে রাখা ভালো, এক্ষেত্রে স্ত্রী শুধুমাত্র গ্রহীতা এবং তার কিছুই করার কোন অনুমতি বা সুযোগ নেই। এমনকি তার নিজের মন্তব্য প্রকাশ করা বা কথা বলারও স্থান নেই। গর্ভবতী হওয়ার পরে দুটো অনুষ্ঠান হয়। পুত্র সন্তানই যাতে হয় তার জন্য পুংসবন আর সিঁথিভাগ করার জন্য সীমাস্তোনয়ন। পুংসবন নামটি পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেয় এই অনুষ্ঠানের তাৎপর্য: যেখানে পুত্র লাভই মূল উদ্দেশ্য। সব অনুষ্ঠান গুলি বা প্রার্থনা গুলি খুব পরিষ্কারভাবে কন্যা সন্তানের বিরোধী বলে বোঝা যায়। সিমাস্তনয়ন প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে আরো জটিল। একজন নারী, যিনি সধবা এবং সন্তান গরবে গর্বিত তিনি গর্ভবতী মহিলার সামনে নাচবেন, বিনা বাজাবেন এবং গান গাইবেন। এরপর ভাতের একটি পিণ্ড সেই গর্ভবতী মহিলার সামনে ধরা হবে এবং স্বামী জিজ্ঞাসা করবে সে কি দেখছে; উত্তর দিতে হবে সন্তান এবং তার পরবর্তী সে আশীর্বাদ পাবে 'অবিধবা হও, বীর প্রশবিনী হও'। ভরদ্বাজূত্র অনুযায়ী তিনটি রান্না করা ভাতের পাত্র রেখে এই একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হলে বধুকে উত্তর দিতে হয় পশু ও পুত্র। আবার জৈমনীয় গৃহসূত্র অনুযায়ী কচুসার পাত্রে জল ভরে তার মধ্যে সোনা রাখা হয় এবং বধুকে কি দেখছে প্রশ্নটি করা হলে বধূ বলে 'স্বামীর জন্য দীর্ঘ জীবন, আমার জন্য সৌভাগ্য এবং সন্তান ও পশু'। মজার বিষয় এই যে, বাঙালি লোকাচারে তদানীন্তন কালে মাতৃত্বের অপরিসীম গুরুত্ব থাকলেও মায়ের বা গর্ভবতী নারীর জন্য কোন প্রার্থনাই নেই। আর সেই প্রসঙ্গেই এটাও মনে রাখা দরকার যে, চিকিৎসা শাস্ত্রের অভাবের জন্য এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ডাক্তার না থাকায়, প্রসবত্তর মৃত্যুর হার সেই সময়ে এখনকার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। তাও শুধুমাত্র স্বামীর দীর্ঘ জীবনের কামনাই শোনা যায়। এর ব্যাখ্যা প্রার্থনায় পত্নী শব্দের যে বহুবচন ব্যবহৃত হয়েছে তার মধ্যে পাওয়া যায়। বলা হয়েছে যে, সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে যদি পত্নীর মৃত্যু হয়, তবে স্বামী আরেকটি বিবাহ করবেন এবং শাস্ত্রসম্মতভাবে স্ত্রী এর সৎকারের ঠিক পর দিনই স্বামী বিবাহ করতে পারবেন। সংখ্যায়ন গৃহসূত্র অনুযায়ী যে নারীর স্বামী এবং সন্তান বেঁচে আছে সে নবপরীণীতা কে মদ ও নিরামিষ খাদ্য দেবে এবং তারপরে গান-বাজনা নাচ ইত্যাদি করবে। আর এ সবকিছুই শুধুমাত্র পুত্র সন্তান লাভের আশায়। ঋগ্বেদ অনুসারে গর্ভধারণের অনুষ্ঠানটির নাম উদরামাময়ং। গর্ভাবস্থার চতুর্থ মাসে স্বামী তার স্ত্রীর চুল সজারুর কাঁটা দিয়ে আচড়ে দেয় যা কিনা ভুমিতে হলকর্ষণের প্রতীক। এর সঙ্গে একগুচ্ছ ফল জোড় সংখ্যায় দেয়, যেটি অসম্পূর্ণ ভ্রূণের প্রতীক। তারপর গান বাজনা হয় যাতে ভ্রুন ধ্বংসকারিনী রাক্ষসীদের তাড়ানো যায় এবং সবশেষে ঘৃতের দিকে তাকিয়ে যখন প্রশ্ন করা হয় যে গর্ভবতী মহিলা কি দেখছে, সেখানে উত্তর করতে হয় সন্তান। পুরো পদ্ধতি বা অনুষ্ঠানে গর্ভবতী মহিলার ভূমিকা শুধুমাত্র আজ্ঞা পালন এমনকি উত্তরটিও তাকে নির্দেশ মতন দিতে হয়।

৩) পুংসবন—
গর্ভধানের পরের অনুষ্ঠান হল পুংসবন যেটির উল্লেখ অথর্ববেদে পাওয়া যায় যদিও অনুষ্ঠানের অনুপুংখগুলি বাঙালি সাহিত্যে পাওয়া যায়। বাঙালি সাহিত্য থেকে এ কথা জানা যায় যে, গর্ভাবস্থার তৃতীয় মাসে গর্ভবতী একদিন উপোস করার পর তার স্বামী তাকে খেতে দেন ভাত এবং দুটি সিম, এক দানা যাব, এক গ্লাস দই। তারপর স্ত্রীকে স্বামী যখন জিজ্ঞাসা করে তুমি কি পান করবে? স্ত্রী উত্তর দেন পুংসবন। গর্ভাবস্থায় কখনো কখনো অনবলবন নামে একটি অনুষ্ঠান করা হয় যার উদ্দেশ্য গর্ভপাত নিরোধ। এই অনুষ্ঠানের কথা আসিলায়ন গৃহসুত্র থেকে পাওয়া যায়

৪) শোস্যমভীকর্ম—
প্রসবের সময় যত কাছে এসে যায় তখন অর্থাৎ ঠিক জন্মের আগে শোস্যমভীকর্ম নামে একটি শেষ অনুষ্ঠান করা হয়। এটি বাঙালি লোকাচারের একটি অত্যন্ত প্রাচীন অনুষ্ঠান। সন্তানের আগমনের সময়ে সমাজ ও পরিবারের মধ্যে একটি নাটকীয় টানটান ভাব থাকে এবং এই অনুষ্ঠানটি তারই চিত্র বহন করে। প্রসবের ঠিক আগের মুহূর্তে স্বামী স্ত্রীর ওপর জল ছিটায় এবং প্রসব না হওয়া অব্দি এটি ক্রমান্বয়ে চালিয়ে যেতে থাকে।

৫) জাতকর্ম—
শিশুর জন্মের ঠিক মুহূর্ত থেকে জন্মের পর অবধি প্রধান লক্ষ্য হলো দুষ্ট প্রেতদের দূরে রাখা কারণ এরা সদ্যজাতর ক্ষতি করে এমনকি প্রাণ নাশেরও কারণ হতে পারে। তাই জাতকর্ম অনুষ্ঠানটিতে সুতিকাগ্নীর উল্লেখ আছে। জন্ম সংস্কারের জন্য এই অনুষ্ঠানটিতে আগুনে সরষে ও তুষ আহুতি হিসেবে দেওয়া হয় এবং এটি ১১ বার দেওয়া হয়। এই আহুতি সদ্যজাতর পিতা দিয়ে থাকেন এবং তার সঙ্গে গোপন নামটি অস্পটভাবে উচ্চারণ করেন যেটি শুধুমাত্র পিতা-মাতাই জানে। এর পরে শিশুটির বাবা সোনা এবং অন্যান্য মাঙ্গলিক দ্রব্য শিশুর মুখে ছুঁয়ে তাকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আগে মধু ও ঘি খাওয়ান এর পরেই শিশুকে দেওয়া স্তন্যপান করতে দেওয়া হতো।

৬) মাতৃত্ব—
যদিও বাঙালি লোকাচারে মায়ের কোনরকম অবস্থান খুঁজে পাওয়া যায় না কিন্তু যেহেতু মাতৃত্ব একমাত্র একজন নারী সমাজকে উপহার দিতে পারে, তাই গর্ভবতী নারীদের খাদ্যের ক্ষেত্রে বাঙালি লোকাচারে যথেষ্ট সচেতনতার প্রকাশ দেখা যায়। লোকাচারে বলা হয়েছে গর্ভবতী নারীকে অতিথির আগে খেতে দিতে হবে। যদিও শাস্ত্র অনুযায়ী 'অতিথি দেবো ভব', তাহলে বোঝাই যাচ্ছে পুত্র সন্তান সেই সময় বাঙালি সমাজের ক্ষেত্রে ঠিক কতটা প্রয়োজনীয়। পুত্রের জন্মাবার পর থেকে তার কৈশোরকাল পর্যন্ত তাই বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা হতো

৭) বিষ্ণুবলি—
এ প্রসঙ্গে প্রথম অনুষ্ঠানটি হত বিষ্ণুবলি। তারপরে মেধা জনন এবং পরবর্তীকালে নামকরণ। নামকরণের পরেই বাবা সন্তানটিকে আঁতুর ঘরের বাইরে নিয়ে আসতেন বাইরের প্রকৃতির সঙ্গে তার সংস্রবের জন্য। শিশুর প্রথম ভাত খাবার অনুষ্ঠানটি অন্নপ্রাশন যেখানে তার দীর্ঘায়ু কামনা করা হয়; এবং শিশু যখন শিক্ষা শুরু করে তখন তা হয় বিদ্যারম্ভ। এই প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানে বাবার ভূমিকা অপরিসীম এবং মায়ের শুধু উপস্থিতি থাকে, কিন্তু অনুষ্ঠানে তার কিছু বলার বা করার থাকে না।

শিশুকে মানুষ করার ব্যাপারেও বাঙালি লোকাচারে মায়ের ভূমিকা খুবই কম; মায়ের ভূমিকা শুধুমাত্র মাতৃত্বের যেখানে সে সন্তানকে খাদ্য দেবে এবং লালন পালন করবে কিন্তু তার ব্যাপারে কোনরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনভাবেই সম্ভব না। শিশুর লালন-পালনেও আনুষ্ঠানিক ছাড়া মায়ের কোন ভূমিকা সে সময়ের বাঙালি সমাজে খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। শিক্ষা, তদারক, শাসন বা পেশাগত বিদ্যা, সবটাই নিয়ন্ত্রিত হয় শিশুর পিতার দ্বারা। মায়ের একমাত্র কাজ হল সন্তানের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করে বিভিন্ন ব্রত করা।

৮) বৈদিক সাহিত্য—
বাঙালি লোকাচারে যে কটি সাহিত্যের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায় সেখানে বৈদিক সাহিত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান লাভ করেছে। বৈদিক সাহিত্যেও সমাজ পুত্র সন্তানের প্রতি অত্যন্ত বেশি রকম ভাবে পক্ষপাত করে। এই সাহিত্য সরাসরি ভাবে বলে থাকে যে বন্ধ্যা নারীকে পরিত্যাগ করা উচিত যেহেতু তার ওপর নিরীতি ভর করেছে। যেহেতু মা হওয়া নারীর একমাত্র কর্তব্য তাই বন্ধা নারী সর্বক্ষেত্রে অশুভ এবং সমস্ত শুভ বিষয় কে সে নষ্ট করতে পারে। এমনকি এই সাহিত্যে বন্ধ্যা নারীকে পরিত্যাগের কথাও বলা হয়েছে। বন্ধ্যা নারীকে ১০ বছর পরে, মৃতবৎসা মাকে ১৫ বছর পরে, এবং কন্যা সন্তানের মাকে ১২ বছর পরে পরিত্যাগ করা যায়। এই সবকটি ক্ষেত্রেই কন্যা সন্তানের সামাজিক অবস্থান খুব ভালোভাবে নির্মিত বা বিশিষ্ট হয়েছে। তদানীন্তনকালে সমাজে নারীর বা ভালো নারীর লক্ষণ হল 'যে স্বামীকে সন্তুষ্ট করে, পুত্রের জন্ম দেয় এবং কখনো স্বামীর কথা, উত্তর করে না'।

৯) পুরাণ ও ধর্মশাস্ত্র—
পরবর্তীতে পুরাণে ও ধর্মশাস্ত্রে সন্তান লাভের ইচ্ছুক নারীর জন্য বহুব্রতের প্রচলন হয়েছে। সেই সময় থেকে ষষ্ঠীর ধারণা বাঙালি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় যিনি সন্তান ধাত্রী দেবী। ষষ্ঠী ব্রত পালন করার উদ্দেশ্য হলো গর্ভধারণের ক্ষমতা বাড়ানো। জন্মের ঠিক ছয় দিন পরে আতুর ঘরে তার পুজো হয়। মনে করা হয় যে, তিনি সন্তানদের রক্ষা করেন এবং তার ওপরে সন্তান লাভের সবটা নির্ভর করে। তাই সন্তান লাভে ইচ্ছুক নারীকে তাকে তুষ্ট করতে নানান অনুষ্ঠান করা হয়। তাতে তিনি শিশুদের মঙ্গল করেন মনে করা হয়। শিশু যত ছোট হবে তার বিপদের আশঙ্কা তত বেশি; তাই গর্ভস্থ শিশুর বিপদের আশঙ্কা সবথেকে বেশি। এজন্যই ষষ্ঠীকল্প অনুষ্ঠান বিশেষ প্রয়োজন যা কিনা শিশুর মঙ্গল করে।

"শ্রী বাবলু মালাকার"
(সনাতন ধর্মের প্রচারক, বাংলাদেশ)।

জয় শ্রীকৃষ্ণ, জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব।

Post a Comment

0 Comments