হিন্দু বিবাহ হলো দুইজন ব্যক্তির (অধিকাংশক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী) চুড়ান্ত জীবনব্যাপী সম্মিলন, যাতে তারা ধর্ম (দায়িত্ব/কর্তব্য), অর্থ (ঐশ্চর্য) এবং কাম (দাম্পত্য প্রেম) এবং মোক্ষ অর্জন করতে পারে। এটি দম্পতি হিসেবে দুই ব্যক্তির ঐক্য, যা ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃত হয়। হিন্দু বিবাহ হল ধর্মশাস্ত্র গ্রন্থে বর্ণিত সমস্ত সংস্কারের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাসের পথে প্রান্তে দুটি প্রশ্ন দেখা যায়—
১) বাংলা ও উত্তর ভারতের আমাদের হিন্দু মেয়েরা মাথায় ঘোমটা দেয় কেন?
২) বাংলায় ও উত্তর ভারতে রাতে বিয়ে হয় কেন যেখানে দাক্ষিণাত্যে দিনে বিয়ে হয়?
একসময় আমাদের হিন্দু মেয়েরা ঘোমটা কাকে বলে এটা জানত না, মুসলমান শাসকদের লালসার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই হিন্দু মেয়েদের ঘোমটার প্রচলন শুরু হয়। অনেকেরই জানা নেই যে, বাংলায় ও উত্তর ভারতে হিন্দু মেয়েদের কেন রাতের অন্ধকারে বিয়ে দেওয়া হয় যেখানে দাক্ষিণাত্যে দিনের আলোতেই বিয়ে হয় এবং যজ্ঞ সম্পন্ন করা হয়। উত্তর ভারতে ও বাংলায় কেন রাতে বিবাহ যজ্ঞ করা হয় এবং কেন বর রাতে কনের বাড়ীতে যাওয়ার নিয়ম হল। কারণ রাতের অন্ধকারে কুমারী কন্যাকে পাত্রস্থ করে মুসলমান শাসকদের অগোচরে শ্বশুর বাড়ীতে নিরাপদে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্যই রাতে বিবাহ ও শ্বশুর বাড়ীতে পাঠিয়ে দেওয়ার নিয়ম চালু হল। অন্যদিকে দাক্ষিণাত্যে মুসলমানদের অনুপ্রবেশ কম হওয়ায় আজও দিনের আলোতেই সেখানে বিবাহ অনুষ্ঠান ও যজ্ঞ সম্পন্ন করা হয়।
এইবার আসি মূল কথাতে, হিন্দু বাঙালীদের বর্তমানে অধিকাংশ যে বিয়ে হয় তা প্রজাপত্য বিবাহ যা একসময় কেবল ব্রাহ্মণদের জন্য নির্ধারিত ছিল। এটি তিন চার দিনের অনুষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত রূপ। সকালবেলায় বৃদ্ধি শ্রাদ্ধ ও অধিবাস হয়। রাত্রে, জামাতা বরণ, কন্যাদান, শুভদৃষ্টি, মাল্যদান, সিঁন্দুরদান ও সপ্তপদীর মধ্যে দিয়ে ৯৫ ভাগ বিবাহ সম্পন্ন হয়। কেবল ব্রাহ্মণ ও অন্য কিছু জাতির পরের দিন কুসুমডিঙা বা "বাসি বিয়ে" তে সপ্তপদী ও হোম হয়। এখন দিনের বেলায় ধ্রুব ও অরুন্ধতী নক্ষত্র দেখিয়ে মন্ত্রপাঠ করানো হচ্ছে। এছাড়া গাত্রহরিদ্রা, ক্ষীর খাওয়া, জল সইতে যাওয়া, শুকচিড়া খাওয়ানো, হেঁসেল দেখানো, জামাকাপড়ের দ্বায়িত্ব নেওয়া, প্রীতিভোজ— সবকিছুই লোকাচার আজকাল মন্দিরে বিয়ে তো দিনেই হয়। তবে শুনেছি এইরকম বিয়ের শাস্ত্রীয় এবং আইনী বৈধতা নেই। এখন তো সব বিয়েই রেজিস্ট্রি করতে হয়। সেটাও দিনেই হয়, বৈদিক যুগে বিদ্যুত ছিল না, সুতরাং তখন বিয়ে হতো দিনের বেলাতে, শুনেছি সুলতানি ও মুঘল যুগে হিন্দু কন্যা অপহরণ করে নিয়ে যেতো তাই নাকি হিন্দুদের রাত্রে বিবাহের প্রচলন হয় এ ইতিহাস হিন্দুরা জানে না কারণ তাদের এ সম্পর্কে অজ্ঞ রাখা হয়।
১) হিন্দু বিবাহের ক্ষেত্রে উত্তর ও দক্ষিন ভারতে সম্পূর্ণ বিপরীত রীতি কেন প্রচলিত?
২) যজ্ঞ সহ যাবতীয় বিয়ের অনুষ্ঠান কেনই বা উত্তর ভারতের রাতে এবং পক্ষান্তরে দক্ষিন ভারতে দিনে সম্পাদিত হয়?
৩) কেনই বা বাল্যবিবাহ বা পর্দানশীন থাকার রেওয়াজ দক্ষিন ভারতে অপেক্ষাকৃত অনেক কম?
যজ্ঞের পুরোহিতের অপর এক নাম - 'হোতা'। তাঁকে অনেকে 'ঋত্বিক'ও বলে থাকেন। তিনি 'স্বহা' মন্ত্রে জ্বলন্ত অগ্নিতে আহুতি প্রদান করেন।
এই 'স্বহা' কে জানেন?
তিনি হলেন অগ্নির স্ত্রী। এবং বৈদিক নিয়মে দিনের আলো ব্যতিরেকে রাত্রিতে যজ্ঞের কোন নিয়ম নেই। রামায়ন— মহাভারত সহ একাধিক প্রাচীন গ্রন্থে দিনের বেলায় বিবাহনুষ্ঠানের প্রত্যক্ষ উদাহরন পাওয়া যায়। আজও দক্ষিন ভারতে বিবাহের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি প্রচলিত। কিন্তু আমাদের উত্তর ভারতে রাতেই বিয়ের চল দেখতে পাওয়া যায়।
ইতিহাস কিন্তু এই ঘটনার সুস্পষ্ট ও সুচারু ব্যাখ্যা করে—
সুলতানি আমল থেকে ব্রিটিশ আগমনের পূর্ব পর্যন্ত এক বিরাট সময় ব্যাপি (প্রায় ৮০০বছর) উত্তর ভারত ছিল মুসলমান শাসকদের পদানত। তাদের হিন্দু রমণী প্রীতি ছিল সুবিদিত। যুদ্ধের সময়ের আক্রমনের কথা বাদ দিয়েও অন্য সময়েও এই মেয়েদের নিস্তার ছিল না। ছলে বলে কৌশলে হিন্দুর 'মাটি' আর 'বেটী' অধিকার ছিল তাদের ধর্মীয় তথা পবিত্র কর্তব্য। আর সেই বিকৃত লালসা চরিতার্থে তারা 'সিন্দুকি' নামে এক ধরনের মহিলা গুপ্তচর নিয়োগ করতেন। যাদের প্রধান কাজই ছিল দেশের মধ্যে ঘুরে ঘুরে সুলতানের হারেমের জন্য নিত্য নতুন শিকারের তথ্য সংগ্রহ করে, তা যথাস্থানে পৌঁছান যা, পরবর্তীকালে বলপূর্বক বা অন্য কোন ছুতোয় অধিকার করে নেওয়া হত। এর ফলে হিন্দু মেয়ের অবিভাবকেরা সর্বদাই আতঙ্কে কাঁটা হয়ে থাকতেন এই বুঝি বা তাদের আদরের কন্যার উপর শাসকের কুদৃষ্টি নেমে এলো তাই রাতের অন্ধকারে নমো নমো করে, লুকিয়ে চুরিয়ে তাদের কন্যা সম্প্রদান করতে হতো, চোখের জলে রাতের আঁধারেই লোক চক্ষুর অন্তরালে, তাদের রওয়ানা করিয়ে দেওয়া ছাড়া মেয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হতভাগ্য মা-বাপের আর দ্বিতীয় কোন পথ খোলা থাকতো না।
এই ঘটনা আরও দুটি বিষয় সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করে, তা হল হিন্দু সমাজে 'বাল্য বিবাহ'প্রথা এবং 'ঘোমটা'র আড়াল প্রাচীন এমনকি মধ্যযুগেও হিন্দু সমাজে 'স্বয়ম্বর প্রথা' চালু ছিল। পৃথ্বীরাজ ও সংযুক্তার বিবাহ অনুষ্ঠান তার প্রত্যক্ষ প্রমান। 'স্বয়ম্বর প্রথা'র পাত্রিরা নিশ্চয়ই বাল্যবিবাহ অনুমোদন করে না। কারন একজন অপ্রাপ্তবয়স্কার পক্ষে তার স্বামী নির্বাচন কি ভাবে সম্ভব আর তার পরেই এলো মুসলমান যুগ।
পাঠক বর্গ আপনারা আশা করি এটা বুঝতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না, যে কেন হিন্দু মেয়েদের বাবারা খুব কম বয়েসেই তাদের মেয়েদের বিয়ে দিয়ে শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন একই ভাবে হিন্দু নারীর 'ঘোমটা'র বিষয়টিও আলোচ্য অংশে প্রাসঙ্গিক ভাবে আলোকপাত করে কথায় আছে।
নারীর সৌন্দর্যই তাদের প্রধান শত্রু তাই অবগুন্ঠনরতা হয়ে তারা যে তাদের আব্রু রক্ষার্থে সচেষ্ট হবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক বলাই বহুল্য যে, উপরিউক্ত, বাল্য বিবাহ বা পর্দানশীন প্রথা পরবর্তী কালে কুপ্রথা রূপে অপ্রয়োজনীয় ভাবে হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে দীর্ঘদিন ইসলামিক প্রভাব মুক্ত দক্ষিন ভারতে বিবাহের যজ্ঞ বা কন্যা সম্প্রদানের মত বিষয়টি আজও দিনের বেলাতেই সম্পন্ন হয়। পাশা পাশি মহিলাদের মধ্যে বাল্যবিবাহ বা পর্দানশীন থাকার রেওয়াজ দক্ষিন ভারতে বরাবরই নেহাতই অপ্রতুল।
বাঙালি হিন্দু বিবাহের ঐতিহাসিক বিবর্তন বিবাহের রীতিনীতির আড়ালে ন্যায় অন্যায়—
বিবাহ হল এমন একটি সামাজিক বন্ধন যাতে দুটি মানুষ পরস্পর পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে। প্রধানত ধর্ম বিবাহপ্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। বিয়ে সংক্রান্ত সকল নিয়মকানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় ধর্মীয় শাস্ত্রের বিধানই ছিল সামাজিক আইন, ধর্মীয় আইনের দ্বারাই শাসিত হতো সমাজ-সংসার। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতিও বৈবাহিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে।
বৈদিক যুগে নারীদের চরম স্বাধীনতা ছিল। সুতরাং খারাপ রীতিগুলো মধ্য যুগের। যে রীতি গুলো ভালো সেগুলো বৈদিক যুগ আর গত হাজার বছরে পরিবর্তিত রীতি। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই বিয়ের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হলেও শাস্ত্রীয় বিধানে বৈদিক যুগ থেকেই বিবাহ নারী-জীবনের প্রধান প্রাপ্তি ও পরম সার্থকতা বলে বিবেচিত, নারীর জন্য বিবাহ অপরিহার্য, পুরুষের জন্য নয়। ঋগ্বেদে বিয়ের সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ আছে।
আট প্রকারের হিন্দু-বিবাহ পদ্ধতি,
মনুস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্রে আট প্রকারের হিন্দু-বিবাহ পদ্ধতির উল্লেখ আছে। ‘ব্রাহ্ম’, ‘দৈব’, ‘আর্য’, ‘প্রজাপত্য’, ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’, ‘পৈশাচ’ ও ‘গান্ধর্ব’ এই আট ধরনের বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্মবিবাহই শুধু গ্রহণযোগ্য ছিল। দায়ভাগ গ্রন্থে জীমূতবাহন উল্লেখ করেছেন যে, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য এবং গান্ধর্ব বিবাহ অনিন্দনীয়। ভবদেবের মতে, বিবাহের আচারাদি শুরু হয় জ্ঞাতি করমন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। পিতার দিক থেকে কনের রক্তসম্পর্কীয়া আত্মীয়ারা বিবাহের প্রাথমিক পর্যায়ের কার্যাদি সম্পন্ন করে থাকে। ঋগ্বেদ ও অথর্ববেদে বর্ণিত বিবাহের মাঙ্গলিক আচরণগুলি আজও পালিত হয়। বিবাহকর্ম আরম্ভ থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত মাঙ্গলিক আচার-অনুষ্ঠানগুলি ছিল: শুভদৃষ্টি, মাল্যদান, মন্ত্রপাঠ, যজ্ঞসম্পাদন, কন্যাদান, পাণিগ্রহণ, অগ্নিপ্রদক্ষিণ, সপ্তপদীগমন এবং স্বস্তিবচন।
ধর্মশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী নিজ বর্ণের মধ্যে বিবাহ ছিল সাধারণ নিয়ম। সবর্ণে বিবাহ উৎকৃষ্ট হলেও মনু ব্রাহ্মণ পুরুষকে নিজ বর্ণ ছাড়া নিম্নতর তিন বর্ণে বিবাহের অধিকার দিয়েছিলেন।
হিন্দু শাস্ত্রীয় অনুশাসন এবং কৌটিল্যের মতে পুত্রপ্রজননই নারীর প্রধান কাজ। শাস্ত্রীয় বিধানমতে আট বছরের মধ্যে কোনো সন্তান প্রসব না করলে স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারে। আর দশ বছরের মধ্যে স্ত্রী শুধু কন্যাসন্তান প্রসব করলে অথবা বারো বছর পর্যন্ত শুধু মৃত পুত্র প্রসব করলে, স্বামী পুত্রলাভার্থে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারে। মনুর মতও তাই: ‘প্রজনার্থং স্ত্রিয় সৃষ্টা’- প্রজননের জন্যই স্ত্রীলোকের সৃষ্টি। প্রকৃতভাবে সব সংস্কৃতিতেই বিয়ের উদ্ভব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নিজস্ব তত্ত্ব আছে।
বিবাহ, বৈদিক এবং লৌকিক আচার বাঙালি ব্রাহ্মণ সমাজে পাঁচটি শাখা রয়েছে— রাঢ়ী, বারেন্দ্র, বৈদিক, সপ্তশতী ও মধ্যশ্রেণী। বাঙালি কায়স্থ সমাজে রয়েছে চারটি শাখা — উত্তর রাঢ়ী, দক্ষিণ রাঢ়ী, বারেন্দ্র ও বঙ্গজ। এই সকল বর্ণ এবং তাদের শাখা ও উপশাখাগুলির মধ্যে বিবাহ প্রথায় দুটি বিভাগ দেখা যায়— বৈদিক ও লৌকিক। লৌকিক প্রথাগুলি ‘স্ত্রী আচার’ নামে পরিচিত। বৈদিক আচারে সাম, যজুঃ ও ঋক্ বেদত্রয়ের অনুসরণকারী ব্রাহ্মণদের মধ্যে বিবাহ প্রথায় আবার সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। হিন্দু বিবাহের বৈদিক আচারগুলির মধ্যে অপরিহার্য হল কুশণ্ডিকা, লাজহোম (লাজ বা খই দিয়ে যজ্ঞানুষ্ঠান), সপ্তপদী গমন, পাণিগ্রহণ (কন্যার পাণি অর্থাৎ হস্ত গ্রহণ), ধৃতিহোম (ধারণ করার অর্থাৎ কন্যাকে ধরে রাখার যজ্ঞ) ও চতুর্থী হোম। এছাড়া পালিত হয় অরুন্ধতী নক্ষত্র দর্শন, ধ্রুব নক্ষত্র দর্শন, শিলারোহণ ইত্যাদি কয়েকটি বৈদিক প্রথাও। বৈদিক প্রথাগুলি বিধিবদ্ধ শাস্ত্রীয় প্রথা ও বিবাহের মূল অঙ্গ।
বাঙালি হিন্দু বিবাহের লৌকিক আচার বহুবিধ। এই প্রথাগুলি বর্ণ, শাখা, উপশাখা এবং অঞ্চল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের হয়। এগুলির সঙ্গে বৈদিক প্রথাগুলির কোনও যোগ নেই।
যৌতুকপ্রথা, বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহ,
১) যৌতুকপ্রথা বিয়ে সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিয়েতে পণপ্রথা হিন্দু ধর্মে একটি স্বীকৃত রীতি। চর্যাপদে বিবাহের সময়ে বরপক্ষকে যৌতুক গ্রহণ করতে দেখা যায়। তাতে মনে হয় পণ প্রথা অনেক প্রাচীন। বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম সমাজের বিবাহব্যবস্থায় পণ ও যৌতুক প্রথা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিবর্তিত হয়ে বাস্তবে একই রূপ পরিগ্রহ করেছে। বর্তমানে যৌতুক একটি বড় সামাজিক ব্যাধি।
২) বাংলার হিন্দু পরিবারগুলির মধ্যে প্রাচীনকাল থেকেই বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল। হিন্দু সমাজে ছেলেমেয়েদের বিশেষ করে মেয়েদের, বাল্যকালে বয়ঃসন্ধির পূর্বেই বিবাহ দেওয়াকে ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করা হতো। প্রাচীন হিন্দু আইনপ্রণেতা মনু নারীর বিয়ের বয়সের যে বিধান দিয়েছেন, তা হলো তিরিশ বছরের পুরুষ বারো বছরের কন্যাকে বিয়ে করবে। চবিবশ বছরের পুরুষ আট বছরের কন্যাকে বিয়ে করবে, নইলে ধর্ম লঙ্ঘিত হয়। মনু আবার বিধান দিয়েছেন, ‘কন্যা ঋতুমতী হওয়ার পর তিন বছরের মধ্যে আত্মীয়স্বজন তার বিয়ে না দিলে, কন্যা নিজের মনমতো পাত্র নির্ধারণ করলে কোনো বাঁধা নেই।’ উনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ভারতে যে সংস্কার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার উল্লেখযোগ্য একটি দিক ছিল বাল্যবিবাহের বিরোধিতা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি হয়। ১৮৭২ সালে হিন্দু বিবাহ আইন পাশ হলে বিবাহের সর্বনিম্ন বয়স মেয়েদের ১৪ এবং ছেলেদের ১৮ ধার্য করা হয়। ১৯২১ সালের আদমশুমারিতে বিয়ের গড় বয়স মেয়েদের ১২ এবং ছেলেদের ১৩ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯২৯ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন (Child Marriage Restraint Act) পাশ হয়। এ আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচের পাত্রী এবং ১৮ বছরের নিচের পাত্রের বিবাহ ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
৩) বহুবিবাহ প্রাচীনকাল থেকে এ দেশে প্রচলিত ছিল। জীমূতবাহনের ব্যাখ্যায় এবং প্রাচীন শিলালিপিতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ধর্মশাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী ব্রাহ্মণ চার পত্নী, ক্ষত্রিয় তিন পত্নী আর বৈশ্য দুই পত্নী গ্রহণ করতে পারেন। পুরুষের বহুবিবাহ শুধু শাস্ত্রীয় অনুমোদনই লাভ করে নি কার্যক্ষেত্রেও বহু প্রচলিত রীতিতে পরিণত হয়েছিল। আর দাম্পত্য জীবনে প্রাচীনকাল থেকেই নারীর প্রধান অশান্তির কারণ ছিল গৃহে সপত্নীর অবস্থান। ধর্মের বিধানে রাজারা যত ইচ্ছে বিয়ে করতে পারতো। শাস্ত্র পুরুষের শত শত বিবাহ সমর্থন করেছে। সেই শাস্ত্রের বিধানেই আবার নারীর একাধিক পতিত্ব কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হয়েছে। হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের প্রধান প্রবক্তা মনু নারীর একপতিত্বের বিধান দিয়েছেন এবং স্বামী দুশ্চরিত্র হলেও স্ত্রীকে সারাজীবন পাতিব্রত্য পালন করতে বলেছেন। পতিপরায়ণতা সাধ্বী স্ত্রীলোকের পরম ধর্ম। বাল্যবিবাহ প্রচলিত থাকায় হিন্দুসমাজে ‘পুনর্বিবাহ’ বলে আরেকটি আনুষ্ঠানিকতা প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ যদি বিবাহের পূর্বে কনের ঋতুস্রাব না হয়ে থাকে তাহলে বিবাহোত্তর প্রথম ঋতুস্রাবের পরে পুনর্বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়।
৪) দ্বাদশ শতাব্দীতে বল্লাল সেন প্রবর্তিত কৌলীন্যপ্রথা ধীরে ধীরে তার ধর্মীয় লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে এক ধরনের বিবাহ— ব্যবসায়ে পরিণত হয়। হিন্দুধর্মীয় কুলীন পুরুষের বহু স্ত্রী রাখার ব্যবস্থা ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে এবং উনবিংশ শতাব্দীর সূচনায় এই প্রথা ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধির আকার ধারণ করে। উনিশ শতকে কুলীন ব্যবসায়ীরা বিবাহের জন্য এককালীন পণ এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন উপলক্ষে অর্থলাভের আশা করতেন। ‘কুলমর্যাদা’ অর্থাৎ কিঞ্চিৎ অর্থগ্রহণ না করে এঁরা শ্বশুরবাড়িতে গমন করে উপবেশন, স্নান ও আহার কিছুই করতেন না, এমনকি স্ত্রীর সঙ্গে আলাপও করতেন না। দীর্ঘদিন পরে কুলীন জামাতা বেড়াতে এলে শ্বশুরশাশুড়ি এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজন তাই তাকে খুশী করার জন্যে সাধ্যমতো চেষ্টা করতেন। এমনকি অনেকে রাতে শোবার আগে শুভ সাক্ষাত উপলক্ষে জামাতা স্ত্রীর নিকট অর্থ দাবী করতেন।
৫) ব্রিটিশ শাসন আমলে ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রশ্রেণি পাশ্চাত্য ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে বহুবিবাহের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করতে শুরু করে। কালক্রমে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বহুবিবাহ বিরল হয়ে পড়ে এবং শিক্ষিত শ্রেণিতে এক বিবাহ দাম্পত্য আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায়, ধনী কিছু পরিবার ছাড়া সকল পরিবারে দ্বিতীয় স্ত্রী বিরল। ১৯৬১ সালের পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ একটি মাইলফলক। এতে পুরুষের বহুবিবাহের প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করার একটা প্রয়াস ছিল। পারিবারিক আইনে যখন দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন হয় তখন থেকে দ্বিতীয় বিয়ের হার আরও কমতে থাকে। বর্তমানে বহুবিবাহ নিম্নশ্রেণী ছাড়া উচ্চ শ্রেণিতে খুবই বিরল দেখা যায়। প্রাচীন বাংলায় একজন স্ত্রী গ্রহণই ছিল সমাজের সাধারণ প্রত্যাশা, তবে এর ব্যতিক্রমও ছিল। বিভিন্ন দেশে সংস্কৃতিভেদে বিবাহের সংজ্ঞার তারতম্য থাকলেও সাধারণ ভাবে বিবাহ এমন একটি রীতি যার মাধ্যমে দু'জন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ও সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে।
পুরুষতন্ত্র এবং বিবাহ,
উনিশ শতকের পরিবারে দাম্পত্যজীবনে পুরুষের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব লক্ষ্য করা যায়। পিতৃতন্ত্র দাম্পত্যজীবনের জন্য কতগুলি বিধিনিষেধ নির্ধারণ করে দেয়- যেমন, স্বামী হচ্ছে ইহজগতের প্রভু ও দেবতা, তাঁর প্রতি স্ত্রীর প্রশ্নাতীত ভক্তি প্রদর্শন করতে হবে ইত্যাদি। সনাতন বিয়ে দুটি ব্যক্তির মধ্যেই নয় শুধু, এর পারিবারিক গুরুত্ব ছিল স্বামী-স্ত্রীর পরিবারের মধ্যে পরিব্যপ্ত। সামাজিকভাবে একটি মেয়ের বিয়ে শুধু একটি ব্যক্তির সঙ্গে হতো না, পরিবারের সঙ্গেও অপরিসীম। একটি মেয়েকে শুধু স্বামীকেই তৃপ্ত করা যথেষ্ট ছিল না, পরিবারের সবাইকেই তুষ্ট করতে হত। নারীর দায়িত্ব ছিল পরিবারের সবাইকে খুশি করা।
বিয়েতে মন্ত্র পড়ে স্ত্রীকে অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করা হলেও দাম্পত্যজীবনে স্ত্রী অর্ধাঙ্গিনীর মর্যাদা পাওয়া বিরল ঘটনা। উনিশ শতকের শুরুতে বাঙালি পরিবারে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক কেমন ছিল তার একটি চিত্র পাওয়া যায় রামমোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩) প্রকাশিত ‘সহমরণ বিষয়ে প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের দ্বিতীয় সম্বাদে’ (১৮১৯)। তিনি লিখেছেন, ‘বিবাহের সময় স্ত্রীকে অর্ধঅঙ্গ করিয়া স্বীকার করেন, কিন্তু ব্যবহারের সময় পশু হইতে নীচ জানিয়া ব্যবহার করেন; যেহেতু স্বামীর গৃহে প্রায় সকলের পত্নী দাস্যবৃত্তি করে, অর্থাৎ অতি প্রাতে কি শীতকালে কি বর্ষাতে স্থান মার্জ্জন, ভোজনাদি পাত্র মার্জ্জন, গৃহ লেপনাদি তাবৎ কর্ম করিয়া থাকে; এবং সূপকারের কর্ম্ম বিনা বেতনে দিবসে ও রাত্রিতে করে, অর্থাৎ স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর ভ্রাতৃবর্গ অমাত্যবর্গ এ সকলের রন্ধন পরিবেষণাদি আপন নিয়মিত কালে করে, ঐ রন্ধনে ও পরিবেষণে যদি কোনো অংশে ক্রটি হয়, তবে তাহারদের স্বামী শাশুড়ি দেবর প্রভৃতি কে তিরস্কার না করেন; এ সকলকেও স্ত্রীলোকেরা ধর্মভয়ে সহিষ্ণুতা করে, আর সকলের ভোজন হইলে ব্যঞ্জনাদি উদর পূরণের যোগ্য অথবা অযোগ্য যৎকিঞ্চিৎ অবশিষ্ট থাকে, তাহা সন্তোষপূবর্বক আহার করিয়া কাল যাপন করে; ...বৈকালে পুষ্করিণী অথবা নদী হইতে জলাহরণ করেন, রাত্রিতে শয্যাদি করা যাহা ভৃত্যের কর্ম্ম তাহাও করেন, ...তবে ঐ স্ত্রীর সবর্বপ্রকার জ্ঞাতসারে এবং দৃষ্টিগোচরে প্রায় ব্যভিচার দোষে মগ্ন হয়, এবং মাস মধ্যে এক দিবসও তাহার সহিত আলাপ নাই।’
ঊনবিংশ শতাব্দীতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও ব্রাহ্মধর্মের বিকাশ সমাজে নারীর স্থান সম্বন্ধে একটি নতুন মূল্যবোধের সৃষ্টি করেছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও ইংরেজি শিক্ষা এবং ব্রাহ্মধর্মের বিকাশের সঙ্গে একটি নতুন নীতি-আদর্শ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নতুন শিক্ষা ও ভাবাদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণির মানসিক জগতে এক পরিবর্তনও সূচনা হয়েছিল। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এবং ব্রাহ্ম আন্দোলনের ফলে এক নতুন পবিত্রতা ও ঔচিত্যবোধের দ্বারা উদ্বধিত হয়েছিলেন। যার ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধ ও সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিকাশের সাথে সাথে শুরু হয় পরিবার, বিবাহ ব্যবস্থা এবং নারী পুরুষ সম্পর্ক উন্নয়নের প্রক্রিয়া। এর সাথে যুক্ত হয় নৈতিকতাবোধ।
বাঙালি হিন্দু বিবাহ,
ইতিহাস থেকে বর্তমানের আলোয় পদার্পণ হিন্দু বিবাহ একটি ধর্মীয় আচার বা আধ্যাত্মিক বিষয় এবং এ জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত দলিলের প্রয়োজন হয় না। হিন্দু পরিবারে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা কয়েকদিন ধরে চলে।
হিন্দু সমাজে পাত্র-পাত্রীর কোষ্ঠী বিচার করে দেখার রীতি আছে। পাত্রী-পাত্রীর অন্য কোন বিষয়ে আপত্তি না থাকলেও কোষ্ঠী বিচারে যোটক না মিললে বিবাহের আর অগ্রগতি হতো না বা এখনও অনেক ক্ষেত্রে হয় না।
১) হিন্দু সমাজে বিয়ের আগে কথা পাকাপাকি করার অনুূষ্ঠানকে ‘আশীর্বাদ’ বলে। পাত্র-পাত্রী পছন্দ হলে সোনার আংটি বা টাকা দিয়ে পাকা কথা হয়ে থাকে। নতুন পাটি, নতুন খাতা, কলম দিয়ে পুরোহিতের উপস্থিতিতে উভয়পক্ষের কর্তা ব্যক্তিরা বিয়ের কথা চূড়ান্ত করেন। এটাকে অনেকে ‘পাটিপত্র’ বা ‘মঙ্গলাচরণ’ বলে থাকেন। এতে উল্লেখিত থাকতো বিয়ের দিন-ক্ষণ-লগ্ন এবং দেনা-পাওনার কথাও। বিয়ের দিন সাধারণত নির্ধারিত হয়ে থাকে পঞ্জিকা-অনুসারে শুভলগ্ন দেখে এবং পাত্র-পাত্রীর জন্মকোষ্ঠী বিচার করে। (পাটিপত্র- পাটিপত্র বাঙালি হিন্দু বিবাহের প্রথম আচার। এই আচার লগ্নপত্র বা মঙ্গলাচরণ নামেও পরিচিত। সম্বন্ধ করে বিবাহ স্থির হলে বিয়ের তারিখ চূড়ান্তভাবে স্থির করার জন্য যে অনুষ্ঠান হয়, তাকেই পাটিপত্র বলে। এই আচারের মাধ্যমেই বিবাহের সূচনা ঘটে)।
২) পানখিল— পানখিল বাঙালি হিন্দু বিবাহের দ্বিতীয় আচার। এটি পাটিপত্রের ঠিক পরেই পালিত হয়। পানখিলের অর্থ পান পাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে খিল দেওয়া বা খড়কে বেঁধানো। এই আচারটি প্রথমে বরের বাড়িতে এবং পরে কনের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। পানখিল আচারে বাড়ির মেয়েরা এবং প্রতিবেশিরা বিয়ের গান গেয়ে থাকে। এই গানের বিষয়বস্তু হল রাম ও সীতার বিবাহ।
৩) বিয়ের আগের দিনকে বলা হয় ‘অধিবাস’। ঐ দিন বর-কনেকে পূজা করতে হয় এবং মধ্যরাতে নতুন কাপড়, গহনা পরে পাঁচ পদ দিয়ে খাবার খেতে হয়। বর-কনে উভয়ের বাড়িতেই অধিবাসের দিন একই আয়োজন হয়ে থাকে।
৪) শঙ্খ কঙ্কন কন্যাকে শাঁখা পরানো হয়, এরপর বিকালে বিবাহের মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়।
৫) দধি মঙ্গল বিবাহের দিন বর ও কন্যার উপবাস। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বর ও কনে উভয়কেই না খেয়ে থাকতে হয়। তবে উপবাস নির্জলা নয়। জল মিষ্টি খাওয়ার বিধান আছে। তাই সারাদিনের জন্য সূর্য্যোদয়ের আগে বর ও কন্যাকে চিড়ে ও দৈ খাওয়ানো হয়। বিয়ের দিন বর-কনেকে গিলা, চন্দন, কাঁচা হলুদ, কাঁচা দুধ, ঘি, মধু এবং পুকুরের জল দিয়ে স্নান করানো হয়।
৬) গায়ে হলুদ— সংস্কৃত ভাষায় এই রীতিকে বলা হয় গাত্রহরিদ্রা। হিন্দু ধর্মে কয়েকটি জিনিসকে শুভ বলা হয়। যেমন শঙ্খধ্বনি, হলুদ ইত্যাদি। প্রথমে বরকে ও নিতবরকে সারা গায়ে হলুদ মাখানো হয়। পরে সেই হলুদ কন্যার বাড়ি পাঠানো হয়। কন্যাকে সেই হলুদ মাখানো হয়।
৭) বর বরণ— বর বিবাহ করতে এলে তাকে স্বাগত জানান কন্যাপক্ষ। কন্যার মা তার জামাতাকে একটি থালায় প্রদীপ, ধান দুর্ব্ব ও অন্যান্য কিছু বরণ সামগ্রী নিয়ে বরণ করেন। এরপর বরকে বাড়ীর ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয় ও দুধ এবং মিষ্টি খাওয়ানো হয় ।
৮) সাত পাক— বিবাহের মণ্ডপে প্রথমে বরকে আনা হয়। এরপর কন্যাকে পিঁড়িতে বসিয়ে আনা হয়, কন্যার ভাই বন্ধুরা পিঁড়ি ধরে থাকে, কন্যা পান পাতা দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রাখেন, কন্যাকে পিঁড়িতে করে বরের চারপাশে সাতপাক ঘোরানো হয়।
৯) শুভদৃষ্টি— বিবাহের মন্ডপে জনসমক্ষে বর ও কন্যা একে অপরের দিকে চেয়ে দেখন।
১০) মালা বদল— কন্যা ও বর মালাবদল করেন। এই রীতির অর্থ হচ্ছে দুজন একে অন্যকে জীবনসঙ্গী হিসাবে মেনে নিলেন। মুসলমান মতে একই ভাবে কন্যাকে বলতে হয় "কবুল"। আবার ঠিক এই রকমই খৃষ্টান মতে চার্চের ফাদারের সামনে বর ও কন্যা বিবাহে সন্মতি জানান।
১১) কন্যা সম্প্রদান এবং অঞ্জলি— কন্যার পিতা কন্যাকে জামাতার হাতে সম্প্রদান করেন বেদমন্ত্রে বরও জানান যে তিনি কন্যার ভরন পোষনের দ্বায়িত্ব নিলেন। কন্যা ও বর খৈ অগ্নাহুতি দেন। প্রচলিত বাংলায় একে বলে খৈ পোড়া, বৈদিক যুগে মানুষ নানা ধরনের শক্তির উপাসনা করতেন। অগ্নিও তাদের মধ্যে অন্যতম।
১২) সিঁদুর দান— বিবাহের শেষ রীতি হল বর কন্যার কপালে সিঁদুর প্রদান করেন। বাঙালি হিন্দু নারীরা স্বামীর মঙ্গল কামনায় সিঁথিতে সিঁদুর পরেন।
১৩) বিয়ের পরদিন থাকে বাসি বিবাহ, এইদিন নানা আনুষ্ঠানিকতা চলতে থাকে। বাসিবিবাহের দিন উভয়কে পুরোহিত আবার মন্ত্র পড়ান এবং ঐ দিন প্রথা অনুযায়ী নানা আনুষ্ঠানিকতা চলতে থাকে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ছোট পুকুরের মতো কেটে তাতে জল বা দুধ দিয়ে গোলাপ পাপড়ি ভাসিয়ে আংটি লুকোচুরির খেলা।
১৪) বাসি বিবাহের পরের দিনে স্বামীর গৃহে স্ত্রীর অন্ন গ্রহণ, যা সাধারণত বৌভাত বলে পরিচিত।
"দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর"
রাতে পবিত্র বেদমন্ত্র উচ্চারণের বিধি কি নিষেধ আছে?
রাতে পবিত্র বেদমন্ত্র উচ্চারণ নিষেধ নেই, কিন্তু বেদমন্ত্র পাঠ করিতে হইলে ছন্দের জ্ঞান একান্ত আবশ্থাক রয়েছে।
সন্ধ্যায়ন্তি সন্ধ্যায়তে বা পরব্রহ্ম যস্যাং সা সন্ধ্যা।।
"সন্ধ্যা শব্দের অর্থ"
সন্ধ্যা— দিন ও রাত্রির সন্ধিক্ষণ; রাত্রি আরম্ভ, সাঁঝ, গোধূলিসময়; দিন-রাত্রির সন্ধিক্ষনে উপাসনা বা আপাস্যমন্ত্র, আহ্নিক; যুগের আরম্ভকাল; অবসান কাল জীবন-সন্ধ্যা।
"সন্ধ্যা এর বাংলা অর্থ"
১) দিন ও রাতের মিলনকাল; রাত্রির আরম্ভ; সন্ধ্যাবেলা (বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখি যে সন্ধ্যে হয়েছে। (প্রমথ চৌধুরী; এমন ভরা সাঁঝ-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।
২) যুগসন্ধি; যুগের অবসান (কলির সন্ধ্যা)।
৩) জীবনের শেষ মুহূর্ত (জীবন-সন্ধ্যা)।
৪) উপাসনা করার সময়।
৫) পুরা এক দিন-রাত্রি (তিন সন্ধ্যাব্যাপী শয্যায় আছি)।
সন্ধ্যা— আহ্নিক, সন্ধ্যাহ্নিক (বিশেষ্য) হিন্দু ধর্মমতে সায়ংকালীন ঈশ্বর-বন্দনা; ত্রিসন্ধ্যা উপাসনা করা (এক বৎসর প্রিয়তম পুত্রকে সন্ধ্যা— আহ্নিক শিখাইলেন— বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।
সন্ধ্যা করা (ক্রিয়া) হিন্দুদের সায়ংকালীন উপাসনা করা।
সন্ধ্যাতারা (বিশেষ্য) সাঁঝের বেলা সর্বাগ্রে উদিত তারা।
সন্ধ্যাত্রয়, ত্রিসন্ধ্যা, তিনসন্ধ্যা (বিশেষ্য) প্রাতঃকাল, সধ্যাহ্ন এবং সায়ংকাল।
সন্ধ্যাদীপ (বিশেষ্য) সাঁঝের বাতি; সেঁজুতি; সন্ধ্যাবেলায় জ্বালিত দীপ (ঘরে তার সন্ধ্যাদীপ জ্বালা হয় না)।
সন্ধ্যারাগ (বিশেষ্য) সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর রক্তিম আলোকছটা।
সন্ধ্যালোক (বিশেষ্য) অস্তগামী সূর্যের শেষ ম্লান আলোকচ্ছটা; twilight (সন্ধ্যালোক তখনও সব আবছা আবছা দেখা যাচ্ছিল)।
পরম পুরুষ-সমীপে সবার য়েই উপাসনা বিধান রয়।
দিবস-রজনী-সন্ধি-সময়ে, সুধীগণ তারে সন্ধ্যা কয়॥
অর্থাৎ— যা করার মাধ্যমে পরমেশ্বরের ধ্যান করা হয়, সেটিই মূলত সন্ধ্যা। এজন্য রাত এবং দিনের সংযোগকালে দুই সন্ধ্যাবেলায় (সূর্যোদয়ের পূর্বে-এবং সূর্যাস্তের পর) প্রত্যেক মনুষ্যেরই, পরমেশ্বরের স্তুতি, প্রার্থনা এবং উপাসনা করা উচিত।
পবিত্র বেদ মন্ত্রে বলা হয়েছে—
ওঁ সায়ং সায়ং গৃহপতির্নো অগ্নিঃ প্রাতঃ
প্রাতঃ সৌমনসস্য দাতা।বসোর্বসোর্বসুদান ত্রধিবয়ংত্বেন্ধানাস্তম্বং পুষেম।।
(অথর্ববেদ, ১৯/৫৫/৩)
অনুবাদ— হে আমাদের গৃহের রক্ষক তেজস্বী পরমেশ্বর। সর্বদা আপনিই আমাদেরকে ধন এবং উত্তম সুখ প্রধান করুন। সন্ধ্যা এবং প্রাতঃকালে আপনাকে সেবা তথা প্রকাশিত করে আমরা নিজেদের শরীরকে পুষ্ট করি।
ওঁ ঋতং চ সত্যং চ ভীদ্ধাত্তপসোহধ্যজায়ত।
ততো রাত্র্যজায়ত ততঃ সমুদ্রো অর্ণবঃ
(ঋগ্বেদ, ১০/১৯০/১)
অনুবাদ— পরমাত্মার অনন্ত সামর্থ্য দ্বারা সকল বিদ্যার কোষ "বেদ " এবং ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতি কার্যরূপ হয়ে উৎপন্ন হয়েছে।তাঁর অনন্ত সামর্থ্য দ্বারাই রাত্রি ও মেঘমণ্ডলে বিদ্যমান মহাসমুদ্র উৎপন্ন হয়েছে।
ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি।
শ্রী বাবলু মালাকার
সনাতন ধর্মের প্রচারক, বাংলাদেশ।
জয় শ্রীকৃষ্ণ, জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব।
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার