ব্রহ্মচর্য্যেণ কন্যা যুবানং বিন্দতে পতিম।
অনডৃবান্ ব্রহ্মচর্য্যেণাশ্বো ঘাসং জিহীর্ষতি।।
(অথর্ববেদ, ১১/৫/১৮)
শব্দার্থঃ— (ব্রহ্মচর্য্যেণ) -ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করিয়া
(কন্যা) - কুমারী
(যুবানাং পতিং বিংদতে) - যুবা পতিকে লাভ করে
(ব্রহ্মচর্য্যেণ) - ব্রহ্মচর্য্য লাভ করিবার পর
(অনডৃবান্ অশ্ব) - বৃষভ ও অশ্ব সংজ্ঞক পুরুষ
(ঘাসং জিগীর্ষতি) - ভোগ্য পদার্থকে ভোগ করিতে পারে।
অনুবাদঃ—ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করার পর কুমারী কন্যা যুবা পতিকে লাভ করিবে। বলবান ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিই ভোগ্য পদার্থকে সম্যক্ ভোগ করিতে পারে।
পবিত্র বেদ মন্ত্রের মধ্যে বলা হয়েছে— (ঘাসং জিগীর্ষতি) ভোগ্য পদার্থকে ভোগ করিতে পারে, একটা পুরুষ যে পদার্থ গুলোর একটা নারীকে দিয়ে থাকেন ইত্যাদি।
হিন্দু মেয়ের বিবাহিত পরে শাঁখা-সিঁদুর ব্যবহার করার কারণঃ—
হিন্দু মেয়েদের শাঁখা সিঁদুর ব্যবহার করার কারণ সম্পর্কে নানা রকম কথা বলছে। এটা বলতে গিয়ে তারা সত্ত্ব, তমঃ, রজঃ প্রভৃতি গুণের সঙ্গে শাঁখা সিঁদুরের সম্পর্ক খুঁজতে গিয়ে এমন একটা জগা খিচুরি পাকিয়ে ফেলছে যে, কী বলছে তার কিছুই উপলব্ধি করা যাচ্ছে না। তারপরও তাদের এই প্রচেষ্টাকে আমি সাধুবাদ জানাই এজন্য যে, তারা বিষয়টি জানার চেষ্টা করেছে এবং যতটুকু জেনেছে ততটুকুই অন্যকে জানানোর একটা মহৎ উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রথমেই বলি, জ্যোতিষ শাস্ত্রে আমার কিছু জ্ঞান রয়েছে এবং জ্যোতিষ বিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে হিন্দু বিবাহিত মহিলাদের শাঁখা-সিঁদুর ব্যবহার করার সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। এখানে আরও বলে রাখি জ্যোতিষ বিদ্যা হচ্ছে বেদ এর একটি অংশ এবং একারণেই প্রথমত হিন্দু বিবাহিত মহিলারা ধর্মীয় কারণে শাঁখা সিঁদুর পরিধান করে থাকে। কিন্তু শুধু বিশ্বাসের কারণেই এই পরিধান নয়; এগুলোর ব্যবহারের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট বাস্তব উপকারিতা, যেগুলো আমি নিচে বর্ণনা করার চেষ্টা করছি—
১) শাঁখা জ্যোতিষ শাস্ত্রে— মুক্তা হচ্ছে চন্দ্রের প্রতীক। মুক্তা ব্যবহার করলে- মাথা ঠাণ্ডা থাকে, রূপ লাবন্য বৃদ্ধি পায়, মানসিক বিষন্নতা দূর হয়, মেয়েলী রোগ প্রতিরোধ করে - সাদা শাঁখাও এই একই কাজ করে। মূলত মেয়েদের মাথা ঠাণ্ডা রেখে সুখে সংসারধর্ম পালন করতে শাঁখা মেয়েদেরকে সাহায্য করে। তাই যেসব আল্ট্রা মডার্ন মহিলারা সাদা শাঁখাকে সোনায় মুড়ে পরিধান করেন, তারা শাঁখার উক্ত উপকারগুলো থেকে যে বঞ্চিত হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই সর্বোচ্চ উপকারিতা পেতে হলে শাঁখাকে তার আসল রূপেই ব্যবহার করতে হবে ।
২) সিঁদুর জ্যোতিষ শাস্ত্রে— মঙ্গল গ্রহ হচ্ছে সকল প্রকার দুর্ঘটনার কারণ। তাই মঙ্গলের দশা চললে জীবনে নানারকম দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে। যারা বিজ্ঞান পড়েছেন, তারা জানেন যে মঙ্গল গ্রহের রং লাল। তাই অশুভ মঙ্গলের প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য জ্যোতিষীগণ লাল রং এর প্রবাল পাথর যা রক্ত প্রবাল নামে পরিচিত তা ব্যবহার করতে বলেন। শুধু লাল রংএর পাথরই নয়, লাল বর্ণের যে কোনো বস্তু বা পোষাক পরিধান করলেও মঙ্গলের এই অশুভ প্রভাব থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যায়। একারণেই প্রাচীন হিন্দু মনীষীগণ হিন্দু বিবাহিত মহিলাদের লাল রং এর চুড়ি যা পলা নামে পরিচিত এবং লাল রং এর সিঁদুর ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা সংসার জীবনে অশুভ মঙ্গলের প্রভাবে নানারকম দুর্ঘটনা থেকে নিজেদের রক্ষা করে সাংসারিক জীবনে শান্তিতে থাকতে পারে। এই একই কারণে ভারত উপমহাদেশে মেয়েদের বিয়ের পোষাকের রং লাল; যাতে বিবাহের মতো একটি শুভ অনুষ্ঠানে মঙ্গলের অশুভ প্রভাব না পড়ে এবং দম্পতি একটি শুভ সময়ের মাধ্যমে তাদের দাম্পত্য জীবন শুরু করতে পারে। এছাড়াও মহাভারত থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর জিনিস হলো সিঁদুর এবং এর মধ্যে এমন কিছু রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা নিয়মিত ব্যবহারের ফলে সেই রাসায়নিক উপাদানগুলো ত্বকের ভেতর প্রবাহিত হয়ে রক্তের সাথে মিশে মেয়েদের ঋতু চক্র কালীন যে ক্ষয় তার কিছুটা পূরণে সাহায্য করে। এছাড়াও রক্তপ্রবাল ব্যবহারে মানুষের ধৈর্য, সাহস, মনোবল বৃদ্ধি পায়। চাকুরি স্থলে যোগ্যপদ লাভ হয়, স্বাস্থ্যহানী ও দুর্ঘটনা থেকে তো রক্ষা করেই। সিঁদুর ও পলার ব্যবহার, এই বিষয়গুলোতেও সাহায্য করে। আজকাল অনেক মহিলা শাঁখা ব্যবহার করলেও পলা ব্যবহার করে না। তারা নিজের অজ্ঞাতেই যে নিজের ক্ষতি করে চলেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
শাঁখা-সিঁদুর মাহাত্ম্যঃ
আমরা যখন কোন আচারের বিষয়ে আলোচনা কিংবা সমালোচনা করব তখন সেটার গভীর তাৎপর্য অনুভব করতে হবে।
ঋগ্বেদের ১০ মন্ডল ৮৫ নং সুক্তে সূর্যদেব রীতিমতো দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তাঁর কন্যা সূর্যার বিয়ের আয়োজন করেছিলেন। সূর্যা রথে চরে পতিগৃহে যায় সেখানে গিয়ে সে কিভাবে সম্রাজ্ঞী হয়ে থাকে সেই বিষয়ে বলা আছে। এই সম্পূর্ণ সুক্তটাই ত রূপক অথচ ইহার গভীর তাৎপর্য নারীসমাজে অনুসরণীয়।
ঋগ্বেদের ১০ম মন্ডল ৮৫ সুক্তের ৬ থেকে ১৬ নং মন্ত্র গুলোতে রূপক অর্থে সূর্য কন্যা সূর্যার (ভোর/কুমারী) বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার বিষয়ে বলা হয়েছে।
'Raibhi verses of the Veda are the bride’s wedding gifts, Narashansi verses, the bride’s ornaments, grace and good fortune, her bridal robes sanctified by exemplary verses relating to the good life."
(Rigveda, 10/85/6)
এই রূপক মন্ত্রগুলোর ভেতর লুকিয়ে আছে গভীর মাহাত্ম্য। একইভাবে নারীর শাঁখা সিঁদুরের গভীর দর্শনও মুগ্ধ করার মতো কেন এই শাঁখা সিঁদুর আমাদের সনাতন ধর্মের বিবাহিত নারীরা পরে আসছে?
নারীর সাথে স্বামীর দীর্ঘায়ুর বিষয়টা পবিত্র বেদের একাধিক মন্ত্রে উল্লেখ আছে—
"তেজস্বী পরমাত্মা পত্নীকে দীর্ঘ আয়ু ও তেজ দান করিয়াছেন৷ ইহার পতি শতবর্ষ জীবিত থাকুক।"
(অথর্ববেদ, ১৪/২/২)
শাখা, সিঁদুর ও ব্যবহারের চারটি কারণ আছে আধ্যাত্মিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক এখানে কারণগুলো দেওয়া হলো—
১) আধ্যাত্মিক কারণ— শাঁখার রং -সত্ত্ব, সিঁদুরের লাল রং - রজ: এবং তমগুনের প্রতিক। সংসারী লোকেরা তিনটি গুনের অধিন হয়ে সংসার ধর্ম পালন করে থাকেন, আবার ভ্রূযুগলের মধ্যস্থলে সিঁদুর নারীকে ধ্যানের সময় তার মনকে সেস্থলে স্থির রাখতে সাহায্যও করে। নারী যখন সিঁথিতে উর্ধদিকে সিঁদুরের রেখা টানেন তখন সেটা স্বামীর দীর্ঘায়ুই কামনা করা হয়।
২) সামাজিক কারণ— এর মাধ্যোমে একটি নারী তার আত্ম পরিচয়কে গোপণ না করে সমাজকে সুসংঘবদ্ধ করে তোলে। পুরুষের মনের সুপ্তভোগের বাসনাকে সংযমে পরিবর্তন করে। স্বামী ভিন্ন জ্ঞানবান পুরুষ ঐ নারীকে মাতৃজ্ঞানে দেখতে পারে। যে জিনিস গুলো পরিধান করলে প্রথম দৃষ্টিতেই জানিয়ে দেয় ঐ রমণীর একজন পুরুষের অভিভাবক আছেন। স্বামীর মঙ্গল চিহ্ন তো অবশ্যই এবং অন্যান্য ধর্মের নারীদের চেয়ে একটা আলাদা স্বাতন্ত্র্যতা প্রধান করে।
৩) মনস্তাত্ত্বিক কারণ— এগুলো পরিধানে স্বামী সংসারের বিশেষ কোন কল্যাণ যদি নাও হয় এতে করে কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন অনেকটাই দৃঢ় হয়৷ এগুলো ধারণ করার সময়ও যদি স্ত্রী তার স্বামীর মঙ্গল কামনা করে তবেও ত স্বামীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা সুদৃঢ় হয়।
৪) বৈজ্ঞানিক কারণ— রক্তের তিনটি উপাদান শাঁখায় ক্যালসিয়াম, সিঁদুরে মার্কারী বা পারদ এবং লোহায় আয়রণ আছে। রক্তের তিনটি উপাদান মা-বোনদের ঋতুমতী (মাসিক রজ:স্রাবের) সাথে বের হয়ে যায়। এই তিনটি জিনিস নিয়মিত পরিধানে রক্তের সে ঘাটতি পূরনে সহায়তা করে এবং এগুলো শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সহযোগিতা করে।
Sindoor is prepared using mercury, turmeric and lime. Mercury acts as a catalyst that helps to ease stress and strain. It also helps in keeping the brain active and alert. Other than this, mercury also helps in controlling blood pressure, activating sexual drive and libidinal energy. This is why, a widow or an unmarried woman is forbidden from applying sindoor.
মোটামুটি এই হলো হিন্দু বিবাহিত মহিলাদের শাঁখা-সিঁদুর ব্যবহারের কারণে এর ফলে সনাতন ধর্মের বিবাহিত মহিলাদের জীবন হয়েছে সুরক্ষিত তাদের জীবনে না আছে কোনো ডিভোর্স না আছে তালাকের ভয় এই কারণে সনাতন ধর্মের বিবাহিত মহিলাদের সাংসারিক জীবনও অন্যান্য ধর্মের মহিলাদের থেকে তুলনায় তুলনামূলক বেশি সুখী এককথায় বলা যায় শাঁখা ও সিঁদুর একজন হিন্দু বিবাহিত মহিলার সংসার জীবনের রক্ষা কবচ বলা যায়।
এবং সর্বোপরী অলংকার হিসেবেও শাঁখা ও সিঁদুরের তাৎপর্য ব্যাপক, একটা সনাতন বিয়ের সবচেয়ে সুন্দরতম ও আকর্ষনীয় অংশ হচ্ছে—
"সিঁদুরদান"
এমন অনেক কুমারী মেয়েকে বলতে শোনা যায় যে এই সিঁদুর পড়ার জন্য হলেও একবার বিয়ে করতে চাই। সনাতন সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ দুর্গা পূজায় দশমীতে সকল সনাতনী নারীরা সিঁদুর খেলায় মেতে উঠে এটাও তো মূলশাস্ত্রে নেই তবে কি এটাও অপসংস্কৃতি মনে হয় তথাকথিত প্রগতিশীল ধর্মবোদ্ধাদের?
জগৎগুরু আদি শঙ্করাচার্য তাঁর "সৌন্দর্যলহরী" গ্রন্থে সিঁদুর কে মা শক্তির স্বরূপ অর্থ্যাৎ মা দুর্গার প্রতীক অর্থ্যাৎ যিনি দুর্গতিহারিণী তার প্রতীক ও মঙ্গলরুপী সূর্য হিসাবে ব্যাখা দিয়েছেন। সিঁথিতে সিঁদুর ও কপালের সিঁন্দুরের টিপ শ্রী চক্রের স্বরূপ।
নারীদেরও শাঁখা সিদুঁরের প্রতি আলাদা স্পৃহা থাকে, কেন না এটি তার জীবনের মিলবন্ধনের প্রতিটা মূহুর্তকে মনে করিয়ে দেয়। স্বামী হিন্দু মেয়েদের কাছে তাদের দেবতাস্বরূপ। তাই স্বামীর দেওয়া এ শাখাঁ সিঁদুরই তার অহংকার এবং একজন পতিব্রতা নারী তা আমৃত্যু ধারণ করতে চায়।
না এতেও অনেকের সন্তোষ্টি হবে না৷ তাদের কথা হলো নারী এগুলো ধারণ করলে পুরুষ কেন করবে না, পুরুষ কি অলংকার পড়ে?
একজন পুরুষের কাছে তার স্ত্রীই তো সবচেয়ে বড় অলংকার। বিয়ের মন্ডপে মন্ত্র উচ্চারণ করে একজন পুরুষ যখন তার স্ত্রীর সকল দায়িত্ব গ্রহণ করে এটা কি মূল্যহীন? তাহলে হে পুরুষ, তুমি পত্নীগৃহে যাও, শ্বশুর-শ্বাশুরীর সেবা করে পত্নীগৃহে সম্রাট হয়ে থাকো যদিও ধর্মীয় মূলশাস্ত্র তোমাকে এই নির্দেশ দেয়নি, যা একটি নারীকে দিয়েছেন—
"হে বধু! কল্যাণময়ী, গৃহের শোভাবর্ধনকারিনী, পতিসেবাপরায়ণা, শ্বশুরের শান্তিদায়িনী, শ্বাশুড়িরর আনন্দদায়িনী! গৃহকার্যে নিপূণা হও।
(অথর্ববেদ, ১৪/২/২৬)
আপনি নারী, আপনি দেবী, আপনি মঙ্গলময়ী লক্ষ্মী আপনার মনে কষ্ট দিলে সংসার শ্রীহীন হবে। আপনি যদি শাঁখা-সিঁদুর ধারণ না করেন তবে আপনার উপর এটা চাপিয়ে দেওয়া অবশ্যই অন্যায়৷ কিন্তু আপনি যখন এগুলোকে কুসংস্কার, অপ্রয়োজনীয় ও অবান্তর বলে কটাক্ষ করবেন তবে এটাও অবশ্যই অন্যায়৷ আপনি বরং নিজের শালীনতার দিকে যত্নশীল হোন। আপনার আচার-আচরণে ও মন্তব্যে শালীনতা বজায় রাখুন।
"অধঃ পশ্যস্ব মোপরি সন্তরাং পাদকৌ হর।
মা তে কশপ্লকৌ দৃশন্ স্ত্রী হি ব্রহ্মা বভূবিথ।।"
(ঋগ্বেদ, ৮/৩৩/১৯)
অর্থাৎ, হে পুরুষ ও নারী তোমাদের দৃষ্টি সবসময় হোক ভদ্র ও অবনত। তোমাদের চলন হোক সংযত,দেহ হোক পোশাকে আবৃত, নগ্নতা হোক পরিত্যজ্য।।
শাঁখা ও সিঁদুর নারীর জন্য শৃঙ্খলের প্রতীক নয়, ইহা স্বামী-স্ত্রীর বন্ধনের প্রতীক, ইহা নারীর অলংকার।।
আমাদের সনাতন ধর্মের বিবাহের প্রতিশ্রুতি এবং শাঁখা সিঁদুর দান ও বিবাহের মূলমন্ত্র—
বিবাহ আমরা সামাজিক প্রানী, প্রাকৃতিক ও পরিবেশের উপর নির্ভর করে আমাদের জীবন অতিবাহিত হয়। আমরা জন্ম নিই, শিশুকাল পেরিয়ে যৌবনে পা রাখি, তখন আমাদের মধ্যে সার্বিক জ্ঞান ও তার পাশাপাশি জৈবিক চাহিদাও এসে যায়। অনেক নিয়ম মেনে সামাজিকতা রক্ষা করতে হয়। আমরা নিজের চিন্তাই কেবল করি না। আমরা আমাদের পরিবার ও তার সম্মানেরও চিন্তা করি, যা পশুরা করে না। অন্তত এই গুণাবলীর দিক থেকে আমরা পশুর চাইতে উন্নত। যদিও এখন মানুষেরা পশুর চাইতে নিম্নস্তরে পৌছে যাচ্ছে।
বিবাহের মধ্য দিয়ে মানুষ সংসার জীবনে প্রবেশ করে। তবে সনাতন ধর্মে অনেক নিয়মের মধ্য দিয়ে বিবাহ হয়ে থাকে। সনাতনধর্ম অনুযায়ী বিবাহ হলো একটি পবিত্র বন্ধন। এখানে বন্ধন হলো সম্পর্ক। সম্পর্কটা হলো প্রতিশ্রুতি, এটা কোন দ্বায়ভার নয়। এটা ইতিবাচক। একজন আরেকজনের হয়ে যাওয়ার নাম বিবাহ। নিজেকে আরেকজনের আর তাকে আমার করে নেওয়ার নাম বিবাহ বন্ধন।এটা একেবারেই শুদ্ধ একটি সংস্কার ও সমাধান মানব জীবনের। এটার মুল ভিত্তি হলো, বিশ্বাস ও ভালোবাসা। বিবাহ-মানে দুটো আত্মার মিলন।দুটি আত্মাকে একত্র করার অপর নাম হলো বিবাহ বন্ধন। সনাতনধর্ম মতে বিবাহ বন্ধনের কিছু সুন্দর নিময় অনুসারে দুটি মনের মিলন করা হয়। যা অন্য ধর্মের লোকেরা পালন করে না।
হিন্দু ধর্মে বিবাহ বন্ধনের অনেক সুন্দর সুন্দর নিয়ম আছে। তার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহামুল্যবান নিয়ম গুলো হলোঃ শুভদৃষ্টি, সাত পাঁকে ঘুরা,মালা বদল, সিঁদুর দান। সমস্ত নিয়মই কিন্ত খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যা অনেক গভীর রহস্য।
"সনাতনী বিবাহের মূলমন্ত্র"
যদ্যেত হৃদয়ং তব, তদস্তু হৃদয়ং মম।
যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব।।
অর্থাৎ, আজ থেকে আমার হৃদয় তোমার হোক; তোমার হৃদয় আমার হোক। আমি আমাকে তোমায় সমর্পণ করলাম, তোমার হৃদয় আমাকে সমর্পণ কর।
মালা বদল এই নিয়মের মাধ্যমে সে তার মালা তাকে দেন এবং তার মালা সে নিয়ে বদল করে প্রমান দেন। যে আমি তোমাকে আমার করে নিলাম। আর আমাকে তোমার করে দিলাম। আমার যা আছে সবকিছু তোমার, আর তোমার যা আছে সব কিছু আমার আজ থেকে। আমি তোমার তুমি আমার। আমার আগের জীবন থেকে আমি আজ নতুন জীবনে নতুন করে তোমায় নিয়ে বাঁচার অঙ্গিকার করলাম।
সিঁদুর এইটা হলো সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। আমি তাকে আমার রক্তে (সিঁদুর প্রতীকে) তার মাথায় দিয়ে রক্তের আবদ্ধে নিজেকে জড়িয়ে নিলাম। আমি প্রতিশ্রুতি দিলাম আমি আমার রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে হলেও তোমায় রক্ষা করে যাবো আজীবন। আমার রক্তের প্রতীকি করে তোমায় আমি আমার জীবনের পুরোটা দিয়ে তোমায় বেধে রাখবো, কখনই ছেড়ে যাবো না। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম।
"সিঁদুর পড়ানোর মন্ত্র"
ওঁ শিরোভূষণ সিন্দুরং ভর্তারায়ু বিবর্ধনং।
সর্বারত্নাকরং দিব্যং সিন্দুরং পতিগৃহ্যতাম্।।
"শাঁখা পড়ানোর মন্ত্র"
ওঁ শঙ্খালঙ্কারং বিবিধং চিত্রং বাহুনাঞ্চ বিভূষণম্।
মহোদধিসম্ভূতাঃ সর্বদেবীপ্রিয়া সদা।
শঙ্খ বলয় কন্যাভূষণানাং সদুত্তমম্।।
সনাতন ধর্মের বিবাহের প্রতিশ্রুতি এবং শাঁখা সিদুর দান ও বিবাহের মূলমন্ত্র ও হিন্দু বিবাহের প্রতিশ্রুতি সমূহ নিম্নরুপঃ—
"শুভদৃষ্টি"
শুভ অর্থাৎ ভালো বা মঙ্গলতম আর দৃষ্টি হলো দেখা বা দর্শন করা।ভালোবাসার বন্ধনের প্রথম তম বন্ধন। যখন তাকে দেখে নিজেকে তার মাঝে হারিয়ে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। তার সবকিছুকে নিজের মধ্যে দেখা। সেই সুন্দর তম রুপের দৃষ্টিতে তাকে আজীবন দেখা।সেই দৃষ্টি খুব প্রবিত্র। সমগ্র সংসারের সমস্ত মানুষকে পরিত্যাগ করে, সেই দৃষ্টির মাধ্যমে তাকে আলাদা করে দেখা অর্থাৎ পৃথিবীর সব নারীকে বাদ দিয়ে তুমি কেবল আমার স্ত্রী বা প্রিয়তমা/পৃথিবীর সকল পুরুষকে বাদ দিয়ে তুমিই কেবল আমার স্বামী বা প্রিয়। এটাই হলো সেই অভাবনীয় সুন্দরতম দৃষ্টি যাকে বলা হয় শুভ দৃষ্টি।
সনাতন ধর্ম মতে বিবাহে আমরা দেখতে পাই,অগ্নি কুণ্ডলীকে মাঝখানে রেখে নববধূ চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করতে হয়। একে বলে সাত পাঁকে বাঁধা পড়া। আর এ পদ্ধতির মাধ্যমে অগ্নিদেবতাকে বিয়েতে সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়। শুধু আগুনের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করা নয়, এসময় বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিও দিতে হয় একে- অপরকে। এখানে প্রত্যেক প্রতিশ্রুতিই থাকে সমান অধিকারের।
১) প্রথম প্রতিশ্রুতি— প্রথমে বর তাঁর বউ এবং সন্তানদের আর সকল কিছুর দ্বায়িত্ব নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বিনিময়ে কনেও প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি তাঁর স্বামী এবং তাঁর পরিবারের যত্ন নেবেন।
২) দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি— এবার বর প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি তাঁর স্ত্রীকে সবরকম বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। বিনিময়ে কনেও প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি স্বামীর সবরকম সমস্যায় পরামর্শ দিয়ে স্বামীর পাশে থাকবেন।
৩) তৃতীয় প্রতিশ্রুতি— এবার বর প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি তাঁর পরিবারের সবার দ্বায়িত্ব গ্রহন করে আয় উর্পাজন করবেন। একই প্রতিশ্রুতি কনেও দিয়ে থাকেন।
৪) চতুর্থ প্রতিশ্রুতি— স্ত্রীর কাছে তাঁর পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব অর্পন করা এবং একইসঙ্গে স্ত্রীর সমস্ত মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পাশাপাশি স্ত্রী তাঁর সমস্ত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার প্রতিশ্রুতি দেন।
৫) পঞ্চম প্রতিশ্রুতি— যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করার মধ্য দিয়ে সমাধান করার প্রতিশ্রুতি দেন বর। স্বামীকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দেন স্ত্রী।
৬) ষষ্ঠ প্রতিশ্রুতি— স্ত্রীর প্রতি সত্য থাকার অঙ্গিকার দেন স্বামী। স্ত্রীও স্বামীর প্রতি সত্য থাকার অঙ্গিকারে দেন।
৭) সপ্তম প্রতিশ্রুতি— শুধু স্বামী হিসেবেই নয়, বন্ধু হিসেবেও সব কিছু শেয়ার এর মধ্য দিয়ে সারাজীবন একসাথে মৃত্যু পর্যন্ত সারাজীবন স্ত্রীর সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন বর।
স্ত্রী ও স্বামীর একসঙ্গে আজীবন একসাথে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
জয় শ্রীরাম,
হর হর মহাদেব।
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন ধর্মের প্রচারক, বাংলাদেশ)
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার