এখানে একই সত্ত্বার শুধুমাত্র প্রকাশ বিভিন্ন হওয়ার কারণে এ দৃশ্যমান বিভিন্ন স্বরূপ দেখে মায়ার প্রভাবে বিভ্রান্ত হয়ে যাই আমরা প্রতিনিয়ত। উপাস্য রুচির বৈচিত্রের জন্যে একই ব্রহ্মের আলাদা আলাদা রূপের প্রকাশ। আমরা এক পরমেশ্বর ছাড়া দ্বিতীয় কারো উপাসনা করি না। বেদে বিভিন্ন মন্ত্রে অত্যন্ত সুন্দর এবং স্পষ্ট করে বিষয়টা বলা আছে-
ইন্দ্রং মিত্রং বরুণমগ্নি-মাহু রথো
দিব্যঃ স সুপর্ণো গরুত্মান্।
একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি
অগ্নি যমং মাতরিশ্বানমাহুঃ।।
(ঋগ্বেদ, ১/১৬৪/৪৬)
সেই সদ্বস্তু অর্থাৎ পরব্রহ্ম এক ও অদ্বিতীয়। কিন্তু জ্ঞানীগণ তাঁকেই ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, অগ্নি, দিব্য (সূর্য্য), সুপর্ণ, গরুড়, যম, বায়ু ইত্যাদি বিভিন্ন নামে অভিহিত করে থাকেন।
ন দ্বিতীয়ো ন তৃতীয়শ্চতুর্থো নাপুচ্যতে।
ন পঞ্চমো ন ষষ্ঠঃ সপ্তমো নাপুচ্যতে।
নাষ্টমো ন নবমো দশমো নাপুচ্যতে।
য এতং দেবমেক বৃতং বেদ।।
(অথর্ববেদ, ১৩/৪/২)
পরমাত্মা এক, তিনি ছাড়া কেহই দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম বা দশম ঈশ্বর বলে অভিহিত হয় না। যিনি তাঁহাকে শুধু এক বলে জানেন একমাত্র তিনিই তাঁকে প্রাপ্ত হন।
কুত্র বা গচ্ছসে পাপ যত্র নাহং কুতোহত্ৰ তৎ ।
কারণাননমধ্যস্থং মমেদং বক্রগং জগৎ ।।
(দেবীপুরাণ, ৮৬/১৬)
"এমন কোন স্থান আছে, যেখানে আমি বর্তমান নাই, এই ব্রহ্মাণ্ডের মূল কারণ আমি আমার মুখের মধ্যেই এই জগৎ বিদ্যমান রয়েছে।"
সৃষ্টি ও জম্ম তিনি (পৃথিবীর সকলেই আমরা তার সন্তান) মমতাময়ীও তিনি (সকলেই তার দুগ্ধ পান করে বেঁচে আছে), তার কৃপাতেই সুখ ও দুঃখ আমরা অনুভব করি। এবং বিনাশ ও মৃত্যু তিনিই, তিনিই প্রলয়ংকরী, তিনিই প্রকৃতি, ত্রিগুণাত্মিকা, মহামায়া এই বিশ্বজগতে তিনিই একমাত্র ক্রিয়াশীল ও স্থিতিশীল।
সৃষ্টি তিনি, স্থিতি তিনি, বিনাশও তিনি।
জন্ম তিনি, পরিপোষণ তিনি, মৃত্যুও তিনি।
তিনি মমতাময়ী, তিনিই প্রলয়ংকরী।
তিনিই প্রকৃতি, ত্রিগুণাত্মিকা, মহামায়া।
বিশ্বজগতে একমাত্র তিনিই ক্রিয়াশীল।
(ঈশ্বর নিষ্ক্রিয়, নির্লিপ্ত, মায়াতীত, ত্রিগুণাতীত)।
"সৃষ্টিস্থিতিবিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনী।
গুণাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণি নমোস্তুতে।।"
বৈদিক একত্ববাদের মতো শ্রীচণ্ডীতেও অসংখ্য স্থানে দেবীর অদ্বৈতবাদী একত্ব বর্ণিত আছে। উত্তর চরিত্রে দেবী ব্রহ্মাণী, বৈষ্ণবী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, ঐন্দ্রী, নারসিংহী, বারাহী এবং চামুণ্ডা এ অষ্টমাতৃকা শক্তিকে সাথে নিয়ে শুম্ভনিশুম্ভের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধে দেবীর হাতে শুম্ভের প্রাণতুল্য ভাই নিশুম্ভ বধ হয়। শুম্ভ ভাইকে নিহত হতে দেখে এবং সকল সৈন্যবলকে বিনষ্ট হতে দেখে, উত্তেজিত হয়ে দেবীকে বলেন, "হে উদ্ধতা দুর্গা, তুমি গর্ব করিও না তুমি অন্যান্য বিভিন্ন দেবীকে সাথে নিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত করছো, তাই গর্বিত হবার কিছুই নেই।
শুম্ভের ক্রোধভরা উক্তি শুনে দেবী তখন বলেন—
একৈবাহং জগতত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা।
পশ্যৈতা দুষ্ট ময্যেব বিশন্ত্যো মদ্বিভূতয়ঃ।।
(শ্রী চণ্ডী, ১০/০৫)
"আমিই একমাত্র জগতে বিরাজিতা। আমার অতিরিক্ত অন্য দ্বিতীয়া আর কে আছে জগতে?
ওরে দুষ্ট, ব্রহ্মাণী এই সকল দেবী আমারই অভিন্না বিভূতি। এই দেখ ওরা আমাতেই মিলে বিলীনা হয়ে যাচ্ছে।"
অর্থাৎ দেবী এক থেকে বহু হয়েছিলেন, আবার বহু থেকে আবার এক অদ্বৈত হয়ে গেলেন।
"একই শক্তির শুধু বিভিন্নরূপের প্রকাশ চারিদিকে
নিরাকারকে সাকারে বাধার ভক্তচেষ্টা।
সরস্বতী-লক্ষ্মী-কালী এ ত্রিধা মূর্তি পরিব্যাপ্ত,
সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ গুণপ্রতিভূ হয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে।
অণুতে পরমাণুতে সর্বত্রই চলছে সেই
চিন্ময় শক্তির নিয়ত প্রকাশের খেলা।
সৃষ্টির আনন্দ, স্থিতির অভিভাবকত্ব ;
ধ্বংসের মুক্তির প্রশান্তি সর্বত্রই সেই কারণমময়ী।
তিনি অনন্তরূপী,তাঁর কোন প্রাকৃত মূর্তি নেই,
সন্তানের শুদ্ধমানসলোকই তাঁর মূর্ত্তির উৎস।"
সমস্যা বাধে তখনই , যখন আমরা যার যার ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকেই যে যে মতাবলম্বী সবাইকে সেই সেই মতাবলম্বী বানাতে চাই।
আমরা ভুলে যাই বেদান্ত দর্শনের চার নং সূত্র—
তত্তু সমন্বয়াৎ।।
(১/১/৪) এই সূত্রেই স্পষ্ট করে বলা হয়েছে বিভিন্ন মত-পথ নির্বিশেষে সকল মত-পথই ব্রহ্ম লাভ এবং উপলব্ধির এক একটি পন্থা। অনন্ত তাঁর রূপ, অনন্ত তাঁর বৈভব এবং অনন্ত তাঁর প্রকাশ। তিনিই জীবকে অজ্ঞানতার মায়ার ডোরে বদ্ধ করেন, আবার তিনিই সেই বন্ধন থেকে মুক্তি দেন।
ঈশ্বরকে মাতৃরূপে আরাধনা সুপ্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই নয় সারা পৃথিবীব্যাপী ছিলো সৃষ্টিকর্তাকে মাতৃরূপে আরাধনার প্রভাব। প্রত্যেকটি জাতির জীবনেই দেখি ঈশ্বরীরূপা মহাদেবীর অবস্থান। যেমন, সেমিটিকদের মধ্যে ছিলো দেবী ননা, অনৎ; আরবদের ছিলো ঈশ্বরীস্বরূপা সর্বশক্তিমান অল্লৎ; ব্যাবিলন ও আসিরিয়াতে ইশতার; পারস্যে ছিলেন মহাদেবী অর্দ্বি; ফিনিশিয়দের হলেন মিলিত্তা; মিশরের অন্যতম প্রধান দেবী হলেন আইসিস; এথেন্সের হলেন এথিনি; গ্রীকদের হলেন আর্তিমিস; রোমানদের হলেন ডায়না। অর্থাৎ পৃথিবীতে প্রাচীন খুব কম জাতিই আছে যাদের জীবনে একজন শক্তি স্বরূপা মহাদেবী নেই।
ভারতবর্ষেও দেবী উপাসনা প্রাচীন বৈদিককাল থেকেই প্রচলিত। বেদের দেবী সূক্ত সহ অসংখ্য সূক্তে, মন্ত্রে দেবীমাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। শ্রীসূক্ত, ভূসূক্ত, অরণ্য সূক্ত, রাত্রিসূক্ত, দেবীসূক্ত, দুর্গাসূক্ত এ সূক্তগুলি বৈদিক দেবীমাহাত্ম্যের জাজ্বল্যমান উদাহরণ।
ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি!
মায়ের এর নগ্ন ছবি দেখে যারা কুদৃষ্টি বা কামবাসনা জাগ্রত এবং যারা লজ্জিত হন তাদের উদ্দেশ্য বলছি—
আমার মা আমাকে জন্মের সময় নগ্ন হয়েছিলেন, একটি সন্তানকে জন্ম দিতে যদি আমার মাকে নগ্ন হতে হয় তিনিই জগৎজননী, যিনি সর্বদাই সন্তান প্রসব করেন তিনি কিভাবে বস্ত্র ধারণ করবে বলতে পারেন?
এবং জগৎজননী মা সর্বদাই শিশু ও সাধুসন্ন্যাসীদের দুগ্ধ পান করান, বিশ্বাস না হলে আপনারা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে দেখবেন অনেক সাধুসন্ন্যাসীরা দীর্ঘদিন কিছু না খেয়ে দিব্যি ধ্যান করছেন। মুলতঃ তারা না খেয়ে নয় আধ্যাত্মিক ভাবে মায়ের দুগ্ধ পান করেন ধ্যান মাধ্যমে এতয়েব মায়ের বস্ত্রহীন শরীর দেখে প্রশ্ন করার আগে নিজের জন্মধাত্রী মায়ের চিন্তা করবে।
জয় শ্রীকৃষ্ণ, জয় শ্রীরাম
জয় মহাকালী, হর হর মহাদেব।
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন ধর্মের প্রচারক, বাংলাদেশ)।
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার