মনসা পূজায় ছাগল বলি
মনসা পূজা আসলে ছাগল বলি এই বিষয় নিয়ে ইদানিং বিস্তর মারামারি। তাই যথাসাধ্য চেষ্টা করবো শাস্ত্রীয় রেফারেন্স দিয়ে ইহা সমাধান করে দেওয়ার। প্রথমেই ভাগবত পুরাণ দিয়ে শুরু করছি।
রেফারেন্স সহ বাংলা অনুবাদ দেওয়া হয়েছে—
‘‘শাস্ত্রে দেবোদ্দেশে পশুবধের বিধান থাকলেও বৃথা হিংসার বিধান নেই। কিন্তু ভোগাসক্ত মানুষ এই বিশুদ্ধ ধর্ম জানে না। শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ, গর্বিত ও পণ্ডিতম্মন্য সেই পাপাচারী নিঃশঙ্কচিত্তে পশুবধ করে, কিন্তু পরলোকে সেই নিহত পশুরাই তাদের মাংস খেয়ে থাকে। এইভাবে যারা পশুহিংসা দ্বারা পরদেহের প্রতি হিংসা করে, তারা সেই সর্বান্তর্যামী শ্রীহরিকেই দ্বেষ করে।’’
(শ্রীমদ্ভাগবত : একাদশ স্কন্ধ, ৫ম অধ্যায়, ১৩-১৪)।
অর্থাৎ এখানেই স্পষ্টতা পাচ্ছে যে, অযথা জীবহত্যা বা পশু বলি হিংসা। কিন্তু দেবতার উদ্দেশ্যে বলি অহিংসা হিসেবেই বিবেচিত।
খাবার নিয়ে ভাগবতের প্রথম স্কন্ধেই আলোচনা করা আছে। বলা হয়েছে—
‘এই জগতে হস্তবিহীন (হাত নেই) প্রাণীরা মানুষের খাদ্য। চতুষ্পদ পশুদের পক্ষে পদবিহীন এবং তাদের মধ্যেও ক্ষুদ্রদেহী বড় দেহীর খাদ্য। এই ভাবে এক জীব অন্য জীবের আহার।’
(শ্রীমদ্ভাগবত : প্রথম স্কন্ধ, অধ্যায়ঃ ১৩, শ্লোকঃ ৪৭)।
এছাড়াও তন্ত্র অনুসারে হাজারো রেফারেন্স রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে পশু বলিকে অহিংসা বলা হয়েছে এবং পশু বলি দিয়েই পূজার বিধান দেওয়া হয়েছে।
এখন হয়তো অনেকেই বলবেন তন্ত্র আবার কিসের শাস্ত্র! তন্ত্র দিয়ে ভূত প্রেতের পূজা করা হয়। এই রকমেই এক ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে আমাদের সমাজে। তাই এই বিষয়টাও ভাগবত দিয়েই ক্লিয়ার করে দিচ্ছি।
ভাগবতের একাদশ স্কন্ধে বলা হয়েছে,
‘‘বৈদিক, তান্ত্রিক এবং মিশ্র, এই ত্রিবিধ পদ্ধতির মধ্য যেকোন একটি বেছে নিয়ে ভগবানের আরাধনা করা উচিৎ’’
(শ্রীমদ্ভাগবত : একাদশ স্কন্ধ, অধ্যায়ঃ ২৭, শ্লোকঃ ৭)।
এখানে ক্লিয়ার যে তন্ত্রের সাথে বৈদিক পদ্ধতির পার্থক্য থাকবে। যদি পার্থক্য না থাকতো তাহলে আরাধনা ভিন্ন হত না।
কুমারীতন্ত্রে দেবীর উদ্দেশ্যে বলি প্রদানের উল্লেখ আছে। ‘ছাগ, মেষ, মহিষ, শশক, শজারু, শূকর, বলয়, কৃষ্ণসার মৃগ প্রভৃতি পশু মন্ত্রসাধক বলিরূপে প্রদান করিবে। হে পরমেশ্বরি! এই সকল পশুর রক্তও নৈবেদ্যরূপে প্রদান করিবে।’
(কুমারীতন্ত্র ৪/৮-৯)।
মাতৃকাভেদ তন্ত্রতেও (১০/১৩) একই কথা উল্লেখ হয়েছে।
‘পশুবলি না দিয়ে কখনও কালী,তারা প্রভৃতি দেবীর পূজা করা উচিত নয়।’
শুধু তাই নয়, এই তন্ত্রে কলিযুগে বলিদানকে মহাযজ্ঞ বলা হয়েছে—
‘কলিকালে অশ্বমেধাদি মহাযজ্ঞ নিষিদ্ধ, বলিদানই কলিকালের মহাযজ্ঞ।’
(মাতৃকাভেদ তন্ত্রঃ ১০/১৩-১৭)।
এছাড়া গায়ত্রীতন্ত্রে বলা হয়েছে,
বলিদান ব্যতীত শক্তিপূজা করলে শক্তিহত্যার পাপ হয়, ব্রহ্মহত্যার পাপ হয়।
মনুসংহিতাও ভাগবতের মতই পশুবলিকে ঘৃণ্য দৃষ্টিতেই দেখা হয়েছে। কিন্তু দেবিতার উদ্দেশ্য নিয়ে বলিকে অহিংসাই বলা হয়েছে।
‘যে পশুমাংস দান করা হয়, দেবতা ও পিতৃলোকের তৃপ্তি সম্পাদন হয়, সেই অবশিষ্ট মাংস ভোজন করিলে দোষ হয় না।’
(মনুসংহিতাঃ ৫/৩২)।
‘যজ্ঞ সিদ্ধির নিমিত্ত প্রজাপতি স্বয়ংই পশু সমুদর সৃষ্টি করিয়াছেন। অতএব যজ্ঞে যে পশুবধ তাহা বধ নয়; কেননা, তাহাকে বধ করায় পাপ নেই’
(মনুসংহিতাঃ ৫/৩৯)।
‘যে সকল মাংস ভোজনের বিধিনিষেধ নাই, তাহা ভক্ষণে দোষ নাই।’
(মনুসংহিতাঃ ৫/৫৬)।
দেবী ভাগবতেও একই সুরে বলা হয়েছে,
"দেবীর সন্মুখে যে সকল পশু নিহত হয়, তাহারা অক্ষয় স্বর্গ লাভ করে এবং দেবীর প্রীত্যর্থে উৎসর্গপূর্ব্বক নিহত পশুগনের নিশ্চিত স্বর্গগতি হয় বলিয়া প্রকৃতপক্ষে তাহাদিগের পরম উপকার করা হয়; এই জন্যই যজ্ঞীয় হিংসা যে হিংসার মধ্যে গণ্য নহে, ইহা সমুদয় শাস্ত্রেই নির্ণীয় হইয়াছে।।"
(দেবীভাগবতঃ ৩/২৬/৩৩,৩৪)।
শ্রী শ্রী চণ্ডীতে মা নিজেই বলেছেন—
"বলিদান, পূজা, হোম তথা মহোৎসবের শুভ দিনে আমার এই চরিতকথা সম্পূর্ণরূপে পাঠ ও শ্রবণ করা কর্তব্য।"
(শ্রী শ্রী চণ্ডী, ১২/১০)।
"পূজা জেনে বা না জেনেও যদি এই মাহাত্ম্য পাঠপূর্ব্বক বলিদান, পূজা এবং হোমাদি করে তা অতি প্রীতি সহকারে আমি গ্রহন করি।"
(শ্রী শ্রী চণ্ডী, ১২/১১)।
"পশু, পুষ্প, অর্ঘ্য, ধূপ, দীপ, গন্ধাদি উত্তম উপাচারে পূজা করলে, ব্রাহ্মণ ভোজনাদি করালে, যাগযজ্ঞাদি ক্রিয়াকর্ম, প্রতিদিন অভিষেক, নানাপ্রকার অন্যান্য ভোজ্য, অর্পণ এবং দান ইত্যাদি দ্বারা এক বৎসর পূজা করলে আমি সন্তুষ্ট হই।"
(শ্রী শ্রী চণ্ডী, ১২/২০)।
তৈত্তিরীয় সংহিতায় (২/১/১/১) বলা হয়েছে,
"বায়ুদেব উদ্দেশ্যে শ্বেত ছাগ বলি প্রদান করিবে"
ঐতরেয় ব্রাহ্মণে (২/৬/২৮৪) এবং ব্রহ্মসূত্র ৩/১/২৫ উভয় গ্রন্থে বলা হয়েছে,
‘অগ্নি ও চন্দ্র দেবতার নিকট পশু বলি দেবে।’
পুনরায় যদি ভাগবতের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যায় এই সকল বিধিনিষেধ মান্য করেই পশু বধের প্রামাণ্যচিত্র রয়েছে।
‘শ্রেষ্ঠ যদু বীরবর্গ পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি যজ্ঞে নিবেদনের উদ্দেশ্যে পশুবধ করেছিলেন’
শ্রীমদ্ভাগবত (দশম স্কন্ধ, অধ্যায়ঃ ৬৯, শ্লোকঃ ৩৫)।
একই ভাবে প্রামাণ্য আছে মনুসংহিতায়,
‘ব্রহ্মনেরা যজ্ঞকর্ম্মের জন্য শাস্ত্রবিহিত প্রশস্ত মৃগ ও পক্ষী বধ করিতে পারেন। কেন না, অগস্ত্য মুনি এ প্রকার আচরণ করেছিলেন।’
‘ঋষিরা ব্রহ্মসূত্র প্রভৃতি যে সমুদয় যজ্ঞকর্ম্ম করিয়াছেন, তাহাতে তাহারা ভক্ষ্যমৃগ-মাংস ও পক্ষী মাংস প্রস্তুত করিয়া হোম করিয়াছেন। অতএব আধুনিক লোকেরাও একই ভাবে বধ করিতে পারেন’
(মনুসংহিতাঃ ৫/২২,২৩)
ছাগল বলি করে এমন ব্যক্তিদের প্রায়ই একে অপরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে দোষ দিয়ে চর্চা করে চলি। প্রশ্ন করে থাকি যে, নিতান্ত প্রয়োজনে বা অজ্ঞাতসারে যা কিছু হত্যা করা হোক না কিন্তু পূজা বা আচার বিশ্বাসের নামে কেন নিরীহ প্রাণীকে চরম অত্যাচারপূর্বক বলি বা জবাই করা হয়। এসব প্রশ্নের উত্তর বহুভাবে বলা গেলেও মানুষের নিষ্ঠুর চাহিদা, ভক্তি বিশ্বাসের অন্ধতা ও ইচ্ছার স্বাধীনতাকেই প্রাধান্য দিতে হয়। এখানে শুধু বলি শব্দের কয়েকটি শাব্দিক অর্থই আলোকপাত করছি। বলি শব্দের অর্থ নিবেদন, আহুতি, যজ্ঞ, সমর্পন ইত্যাদি। অথচ পৃথিবীর কিছু কিছু স্থানে বলি বলতে কেবল কতিপয় পূজার নামে কোন দেবালয়ে বা ঘরে কোন দেবদেবীর নামে কোন প্রাণী হত্যা বা কিছু নৈবেদ্যকে নির্দেশ করা হয়।
এই ভাবে লিখতে গেলে হাজারো রেফারেন্স দেওয়া যাবে। এখানের থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় দেবতার উদ্দেশ্যে বলি অহিংসা কিন্তু অযথা বলি হিংসা। এখন অনেকেই হয়তো প্রমান দিবেন পশু বধ শাস্ত্রে নিষেধ করা হয়েছে এবং ইহা মহাপাপ সেটাও প্রমান দিবেন। এইখানে আমি আবারো বলি, অযথা পশু বলি বা জীব হত্যা অবশ্যই মহাপাপ। কিন্তু দেবতার উদ্দেশ্যে বলি অহিংসা বা পাপ নয়, ইহাই শাস্ত্রের কথা মানে শাস্ত্রীয় বিধান আছে।
জয় মা বিষহরি
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ,
হর হর মহাদেব।
শ্রী বাবলু মালাকার
সনাতন ধর্মের প্রচারক।
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার