বছরের প্রতিটি মাসেই একটি করে দিন মহাশিবরাত্রি হিসেবে পালন করা হয়। তবে মহাশিবরাত্রির একটি আলাদা মাহাত্ম্য রয়েছে। যে কারণে এই দিনটি বিশেষভাবে পালন করেন পুণ্যার্থীরা। বলা হয়, এই দিনেই মা পার্বতীর সঙ্গে বিবাহ হয় দেবাদিদেব মহাদেবের। এছাড়াও এদিন একাধিক অতিপ্রাকৃত ঘটনারও সাক্ষী ছিলেন দুজনে। পুরাণ মতে, এই দিন শিব ও শক্তির দ্বিতীয়বার মিলন ঘটেছিল। তাই এই রাতকে মহাদেবের পুণ্য রাত হিসেবে মনে করা হয়। মা পার্বতী পুরাণে প্রকৃতির প্রতীক। অন্যদিকে মহাদেব চেতনার প্রতীক। শিব ও শক্তি দুইয়ে মিলে জগত সংসারের সৃষ্টিযজ্ঞের আয়োজন করেন। গড়ে ওঠে এই বিশাল পৃথিবী।
অন্য এক পুরাণ মতে, মহাশিবরাত্রির মাঝ রাতে দেবাদিদেব মহাদেব ব্রহ্মার বরে রুদ্র রূপ ধারণ করেছিলেন। মনে করা হয়, এই রাতেরই পুণ্য লগ্নে প্রলয়ঙ্কর তান্ডব নৃত্যে মেতে ওঠেন শিব। জগতের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের তালে তালে ধ্বনিত হয় তাঁর নৃত্যপদধ্বনি। জগতেরই সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের জন্য তাঁর এই তান্ডব নৃত্য। এই ধ্বংসকারী নৃত্যেরও এক বিশেষ কারণ রয়েছে। মা সতীর দেহত্যাগের ঘটনা শুনতেই প্রচন্ড ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েন তিন জগতের নাথ। তার এই প্রলয় নৃত্যের তিথিতেই উদযাপিত হয় মহাশিবরাত্রি।
১) শিবভক্তদের কাছে মহাশিবরাত্রি তিথি এবং ব্রত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ এই দিনে ভক্তরা উপবাস এবং ধ্যান করেন৷ সারা দিন ধরে উপবাস রাখার পর রাতে নির্দিষ্ট সময়ে শিবের মাথায় জল দিয়ে তবেই উপবাস ভাঙা যায়৷
২) এই দিন শিব পার্বতীর বিয়ের তিথি হিসেবেও পালন করা হয়৷ মনে করা হয়, সব রীতিনীতি মেনে এদিন মহাদেবের পুজো করলে সব বাধাবিঘ্ন দূর হয়৷ দেবাদিদেব খুব সামান্য আয়োজনেই সন্তুষ্ট৷
৩) দেখে নেওয়া যাক মহাশিবরাত্রি পুজোয় কী কী উপকরণ প্রয়োজন হয়-শিবলিঙ্গ বা মহাদেবের ছবি, পুজো করার জন্য একটি আসন, প্রদীপ, সলতে, ঘণ্টা, কলস ও তামার পাত্র, পুজোর থালি, শিবলিঙ্গ বসানোর জন্য সাদা কাপড়,দেশলাই বাক্স, ধূপকাঠি, চন্দনবাটা, ঘি, কর্পূর, সিঁদুর, বিল্বপত্র, বিভূতি, আকন্দফুল৷
৪) এই সামগ্রীগুলি রাখতেই হবে পুজো আরাধনায়৷ এ ছাড়াও আরও কিছু উপকরণ আছে, যেগুলিও রাখা যায়৷ সেগুলি হল-ছোট পাত্র, গোলাপজল, জায়ফল, আবির, ভাঙ৷
৫) মহাশিবরাত্রিতে সারা দিন উপবাসের পর পুজো অর্পণ করা হয় রাতে৷ অনেকে চার প্রহরে জল অর্পণ করেন৷ আবার কোনও কোনও ভক্ত এক বার পুজো অর্পণ করেন৷
৬) যদি এক বার পুজো অর্পিত হয়, তাহলে চন্দনবাটা, দই, ঘি, মধু, চিনি, গোলাপজল দিয়ে পুজো করা যেতে পারে৷ যদি চার বার বা চার প্রহরে পুজো করা হয়, তাহলে জলাভিষেক হবে প্রথম প্রহরে৷
৭) দ্বিতীয় প্রহরে দেওয়া হবে দই৷ তৃতীয় প্রহরে ঘি এবং চতুর্থ প্রহরে পুজো অর্চনা হবে মধু দিয়ে৷
कुमारसम्भवम्কুমারসম্ভবের পাঠ্যাংশ অনুসরণে পার্বতীর তপস্যার বর্ণনা—
কুমারসম্ভব মহাকাব্যের নায়িকা পাবর্তী ভগবান্ শিবশঙ্করকে পতিরূপে লাভ করতে সচেষ্ট। তিনি প্রথমে ঐশ্বর্য রূপ মোহে চেষ্টা করেছিলেন দেবগণের সমর্থনরূপ। কামনের পাশরে যোগীরাজ শিবশঙ্করকে বিষয়ও করেছিলেন। কিন্তু পরিণতিতে হরকোপানলে কামদেব ভস্মীভূত হলে পার্বতী রূপের অহঙ্কার পরিত্যাগ পূর্বক তপস্যায় সিদ্ধিলাভ তথা শিবশঙ্করকে পতিরূপে পেতে প্রয়াসী হয়েছেন।
কন্যা পার্বতীর মনোভাব জেনে জননী মেনাদেবী তপঃজীবনের ভ করতা চিন্তা করে পার্বতীকে তপস্যা থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পার্বতী তাঁর সঙ্কল্পে অটল। পার্বতী সহচরীদের মাধ্যমে পিতা গিরিরাজ হিমালয়কেও সঘরের কথা জানান এবং তপস্যা ৬ অরণাবাসের অনুমতি প্রার্থনা করেন। পিতা হিমালয় কন্যা পার্বতীর সঙ্কল্পের দৃঢ়তা অনুভব কার কন্যাকে আর নিষেধ কারন নি। পিতার অনুমতি প্রাপ্ত হয়ে সঙ্গীদের সাথে হিমালয়ের এক শিখরে পাবতী তপস্যার জন্য গমন করেন। পরবর্তীকালে হিমালয়ের সেই শিখর গৌরীর নামানুসারে গৌরীশিখর নামে অভিহিত হয়। শিখরটি হিংস্র শাপদমুক্ত ও ময়ূর পরিবেষ্টিত— জগাম গৌরী শিখরং শিখণ্ডিমৎ।
তপস্যার জন্য পাবতী পূর্বের রাজাভরণ পরিত্যাগ করে অরুণরাগে রঞ্জিত কথায় পরিধান করেন, কেশকলাপের পরিচর্যা পরিহার করে মস্তকে ধারণ করেন জটা। তিনি তোমারে ধারণ করেন। মৌরীমেখলা। সমস্তরকম প্রসাধন বর্জন করে হাতে তুলে নিলেন। অক্ষমালা, রাজকীয় শয্যায় শুয়ে যিনি পুষ্পের আঘাতেও ব্যাথা অনুভব করতেন সেই পার্বতী ব্রহ্মচর্য পালনের জন্য ভূমিতে শয়ন করছেন, বাহুলতাকে পরিণত করেছেন উপাধানে। তিনি নায়িকাসুলভ বিলাস চেষ্টা ও দৃষ্টিচাগুলা পরিত্যাগ করে তপঃসাধনায় মগ্ন হয়েছেন—
লতা ভীষু বিলাসচেষ্টিতং
বিলোল দৃষ্টং হরিণাঙ্গনাসু।
পার্বতী এখন ব্রহ্মচর্যাশ্রমে। সর্বজীবে সমদর্শন ওই আশ্রমের অন্যতম আদর্শ। সেই আদর্শের অনুসরণে আশ্রমের চারাগাছ গুলিতে অপতায়েছে পার্বতী পালন করছেন। আশ্রমের হরিণ প্রভৃতি আরণ্যক প্রাণীদের নীবারধান্যে তিনি পরিপালন করছেন। তপঃজীবনের নিয়ম মেনে পাবর্তী স্নান করে হোমকার্য সম্পাদন করেন। তাঁর এই নিয়মনিষ্ঠা ও শাস্ত্রজ্ঞানের জন্য মাদ্রষ্টা ঋষিগণও ধর্মতত্ত্ব জানার জন্য পার্বতীর নিকটে আসতেন—
'ন ধর্মবৃদ্ধেয় বয়ঃ সমীক্ষ্যতে'।
पञ्चमः सर्गः
পার্বতীর তপস্যার প্রভাবে হিংস্রপ্রাণীগণ হিংসা পরিত্যাগ করে শান্তভাবে বাস করছে, আশ্রমের বৃক্ষ সকল ফুলে ফলে পরিপূর্ণ এবং কুটিরে কুটিরে প্রজ্বলিত হচ্ছে হোমবহিন। সাধারণ নিয়মে তপস্যায় আভীষ্ট সিদ্ধি বিলম্বিত হতে পারে ভেবে পার্বতী কঠোরতর তপস্যায় উদ্যোগী হয়েছেন গ্রীষ্মকালে চতুর্বিধ ভৌম অগ্নির মধ্যবর্তী হয়ে পার্বতী একদৃষ্টে জ্বলন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে পঞ্চতপা সাধনা করছেন। তপস্যাজনিত ক্লেশে পার্বতীর চোখের নীচে কালিমা পড়েছে। বৃক্ষবৃত্তি অবলম্বনে তিনি আহার ত্যাগ করেছেন। বর্ষাকালে বৃষ্টির মধ্যে শিলাখণ্ডের উপর শায়িত থেকে এবং শীতকালে জলের মধ্যে বসে পার্বতী সাধনা করছেন—
মুখেন সা পদ্মসুগন্ধিনা নিশি
প্রবেপমানাধরপত্রশোভিনা ।
তুষারবৃষ্টিক্ষত পদ্মসম্পদাং সরোজ সন্ধানমিবাকরোদপাম্।।২৭।।
তপস্যার চূড়ান্ত পর্যায়ে বৃক্ষপত্র ভক্ষণও পরিত্যাগ করে পার্বতী অপর্ণা নামে খ্যাত হন। কৃচ্ছসাধনায় তিনি পূর্বের সমস্ত সাধকদের অতিক্রম করেছেন। অবশেষে পার্বতী তাঁর কঠোর তপস্যার ফল লাভ করেন। স্বয়ং শিবশঙ্কর ব্রহ্মচারীর ছদ্মবেশে পার্বতীর আশ্রমে উপস্থিত হলেন—
অথাজিনাযাঢ়ধরঃ প্রগলভবাক্
জ্বলন্নিব ব্রহ্মময়েণ তেজসা।
বিবেশ কশ্চিজটিলস্তপোবনং শরীরবন্ধঃ
প্রথমাশ্রমো যথা।।৩০।।
तथा समक्षं दहता मनोभवं
निनिन्द रूपं हृदयेन पार्वती
पिनाकिना भग्नमनोरथा सती।
प्रियेषु सौभाग्यफला हि चारुता ।। १ ।।
বাংলা ব্যাখ্যা— মহাকবি কালিদাস বিরচিত 'কুমারসম্ভবম্’ মহাকাব্যের পঞ্চম সর্গ থেকে আলোচ্য শ্লোকটি সংকলিত হয়েছে। আলোচা শ্লোকটি হিমালয়কন্যা পার্বতীর তপস্যার কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। পার্বতী—হিমালয়কন্যা; তথা—পূর্বোক্তভাবে; সমক্ষম্–সম্মুখে; মনোভবম্—মদন অর্থাৎ কামদেবকে। পিনাকিনা—মহাদেবের দ্বারা; দহতা—দগ্ধীভূত হতে দেখে; ভগ্নমনোরথা সতী—হতাশ হয়ে; হৃদয়েন মনে মনে; রূপম্—নিজের রূপলাবণ্যকে নিনিন্দ—ধিকার দিতে লাগলেন; হি- যেহেতু চারুতা—সৌন্দর্য: প্রিয়েয়ু-প্রিয়জনের: সৌভাগ্যফলা—প্রেমলাতেই সার্থক (হয়)।
একদিন দেবর্ষি নারদ হিমালয়ের বাড়িতে আসেন। সেখানে পার্বতীকে দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—পার্বতী শিবতে পতিরূপে লাভ করবেন। তখন মহাদেব হিমালয়ে তপস্যায় রত ছিলেন, দেবরাজ ইন্দ্রের আদেশানুসারে কামদেব পার্বতীর প্রতি ধ্যানমগ্ন শিবকে আকৃষ্টকরতে চেয়েছিলেন। পার্বতীনিশ্চিত ছিলেন যেনিজ সৌন্দর্যের দ্বারা ও কামদেবের সহায়তায় শিবের মন জয় করতে পারবেন। কিন্তু পার্বতীর আশালতা সমূলে উৎপাটিত হল । চিত্তবৈকল্যের কারণ জেনে মহাদেব তাঁর ললাটস্থিত তৃতীয় নয়ন থেকে নির্গত ক্রোধান্বিতে কামদেবকে ভস্মীভূত করলেন। স্বচক্ষে এই করুণ দৃশ্য দেখে পার্বতী ভগ্নমনোরথা হয়ে নিজ রূপের নিন্দা করলেন। রূপলাবণ্য সর্বদা প্রিয়জনের মনে উৎসুক্য এবং প্রীতি উৎপাদন করে। তাই বলা হয়েছে—
"সজনসন্নিরীক্ষণসগমনানীতি বদন্তি লাবণ্যম্”।
অন্যথা সেই রূপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। যদি কোনো এক উদ্ভিন্নযৌবনা রমণী দেহসৌন্দর্যের দ্বারা প্রিয়জনের প্রেম উৎপাদন করতে না পারেন, তাহলে সেই সৌন্দর্যের কোনো দাম নেই। পার্বতীও চিন্তা করেছিলেন—মহাদেবের সৌভাগ্য লাভ ছাড়া সৌন্দর্য ব্যর্থই। তাই তিনি নিজস্ব রূপলাবণ্যের ধিকার করেছিলেন।
আলোচ্য শ্লোকে বংশস্থবিল ছন্দঃ এবং অর্থান্তরন্যাস অলংকার হয়েছে।
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন ধর্মের প্রচারক)।
কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন,
অধ্যাপক যদুপতি ত্রিপাঠী ও জ্ঞানেশরঞ্জন ভট্টাচার্য: সম্পাদিত 'স্নাতক সংস্কৃত দিশারী' গ্রন্থ থেকে ছাত্রছাত্রীদের উক্ত তথ্য দিতে পেরে আমি মাননীয় সম্পাদকমন্ডলীর প্রতি কৃতজ্ঞ।
ধন্যবাদান্তে,
অমিত গঙ্গোপাধ্যায়,
(সংস্কৃত বিভাগ দীনবন্ধু মহাবিদ্যালয়, বনগাঁ)
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার