Bablu Malakar

पवित्र वेद धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते

আপনার নামে পাশে পদবীর জন্মের ইতিহাস জেনে নিন


             নামে পাশে পদবীর জন্ম কিভাবে
আমাদের হিন্দু সমাজে পদবী নিয়ে বৈষম্য একটা অভিশাপ স্বরুপ। এই পদবী প্রচলন হওয়ার পর থেকেই হিন্দু সমাজে ক্রমশ ভেদাভেদ সৃষ্টি হতে শুরু করে।

সবার প্রশ্ন আসতে পারে যে,
“হিন্দু সমাজে কি সেই সত্যযুগ থেকে এ পদবী প্রচলন ছিল?

”একটু লক্ষ্য করলেই আমরা স্পষ্ট দেখতে পাবো যে, “রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম, যুধিষ্ঠির, অর্জুন, বিশ্বামিত্র, দুর্যোধন, দশরথ, শঙ্করাচার্য, শ্রীচৈতন্য প্রমুখ মহামানবের নামের পেছনে কোন পদবী বা টাইটেল ছিল না।”

অতএব, আমাদের হিন্দু সমাজে নামের পিছনে পদবীর ব্যবহার প্রচলন কিভাবে শুরু হলো তার সঠিক ইতিহাস আমাদের সকলের জেনে রাখা দরকার।

পদবী নিয়ে আমাদের অনেকেরই শ্লাঘার শেষ নেই, আবার বিশেষ কিছু পদবীর প্রতি শ্লেষও কম নেই। কেউ কেউ মনে করেন যে পদবীর ইতিহাস সেই মান্ধাতার আমল থেকে আমাদের সঙ্গে জুড়ে আছে বুঝি। ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায় যে, পদবী আদৌ তত প্রাচীন নয় যতটা আমরা কল্পনা করি। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বঙ্গীয় শব্দকোষে পদবীর বিভিন্ন অর্থের মধ্যে উল্লেখ করেছেন – উপাধি (title), বংশসূচক শব্দ (Surname), গুণ-বিদ্যাজন্য উপনাম ইত্যাদি। সাধারণভাবে, আমাদের সমাজে কোনও ব্যক্তির নামের দুটি অংশ – নাম ও উপনাম। এই উপনাম শব্দটিকেই পদবী (Surname) বলা হয়।

সত্যযুগে নাহি ছিল জাতিভেদ
ছিল এক বর্ণ, ছিল এক ধর্ম্ম
পদবি কাহারো ছিল না কখনো
করিত সবে সবার কর্ম্ম পদবি
কাহারো নাহি রবে তাই কেবলমাত্র
থাকিবে নাম তবেই বিভেদ ঘুচিবে
সমূলে সবে সুখে রবে অবিরাম।।
              (অনিলচন্দ্র মজুমদার নবসত্যযুগ)

পদবীর ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে দেখা যায় পদবীর উদ্ভব ঠিক কবে ও কীভাবে তা নির্দিষ্টভাবে বলা মুশকিল। মনে করা হয় যে গুণকর্ম অনুযায়ী আর্য সমাজে পদবীর প্রথম ধর্মীয় নিদেশের হদিস পাওয়া যায় মনুসংহিতা ও বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণে।

সামাজিক বিন্যাসের সঙ্গে পদবীর বিষয়টি অপেক্ষাকৃত আধুনিক হলেও তার সুচনাপর্ণ মনুসংহিতার সমকালীনে মনু উল্লেখ করেন—

“শৰ্ম্মবদ্ ব্রাহ্মণস্য স্যাদ্ রাজ্ঞো রক্ষা সমন্বিতম্।
বৈশ্যস্য পুষ্টি সংযুক্তং শূদ্রস্য প্রেষ্য সংযুতম্।।
                   (মনু সংহিতা)

অর্থাৎ শ্রাহ্মণের শর্মা, ক্ষত্রিয়ের বর্মা, বৈশ্যের ভূতি এবং শুদ্রের দাস ইত্যাদি ৬পপদ সংযুক্ত হবে। কিন্তু বেদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, জাতকের কোন চরিত্রের নামের শেষে উপপদ সংযুক্ত হয় নি। মহাভারতে দুর্যোধন, দুঃশাসন বা যুধিষ্ঠির, অর্জুন, কৃষ্ণ, রামায়ণে রাম, লক্ষণ, ভরত কারো কোন পদবীর উল্লেখ নেই। গোত্র ও প্রবর কারক বহুসংখ্যক খষির নাম শাস্জে উল্লিখিত আছে, তাদের নামের শেষে ব্রাহ্মণ কি ক্ষত্রিয়জ্ঞাপক শর্মা বা বর্মা কোন উপপদের উল্লেখ নেই। পদ্মপুরাণে উল্লিখিত হেমকুণ্ডন, বিকুগুণ বা ববাহ পুরাণে গোকর্ণ প্রভৃতি বৈশ্যেব উপাখ্যান আছে কিন্তু তাদের নামের শেষে বৈশাত্বজ্ঞাপক ভূতি শব্দ সংযোজিত হয়নি। পদবীর উৎপন্তিতেটে, দেশজশব, নামের শেষাংশ, ধর্ম, স্থান, বাজ সরকার প্রদত্ত উপাধিসুচক পদবী, বৃত্তি বা সুত্রে পদবী প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হতে পারে!

ব্রাহ্মণে দেবশর্ম্মানৌ রায়বর্ম্মা চ ক্ষত্রিয়ে।
ধনোবৈশ্যে তথা শূদ্রে দাস শব্দঃ প্রযুজ্যতে।।
                (বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণ)

এই দুটি শ্লোক থেকে আর্য সমাজের চার বর্ণ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের পদবী কী হতে পারে তার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণের – শৰ্ম্মা ও - দেবশর্ম্মা; ক্ষত্রিয়ের - বর্ম্মা ও রায়বৰ্ম্মা (রক্ষাকর্মবাচক উপাধি); বৈশ্যের – ভূতি (বা - অনুরূপ পুষ্টিক্রিয়াবোধক উপাধি) এবং শূদ্রের - দাস (সেবাকর্মে নিয়োজিত বোধক উপাধি)। মনুসংহিতা বা বৃহদ্ধর্মপুরাণে এইধরণের পদবী ব্যবহারের রীতির কথা উল্লেখ থাকলেও রামায়ণ, মহাভারত বা বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্রে আমরা কোনও পদবীর ব্যবহার দেখতে পাই না। এমনকি সেই সময়ের প্রভাবশালী মুনি-ঋষিদের নামের শেষেও কোনও বর্ণজ্ঞাপক পদবীর চিহ্ন নেই। বরং সে যুগে বিভিন্ন রাজবংশের পরিচিতি ছিল ব্যক্তির নাম অনুসারে, পদবী অনুযায়ী নয়। যেমন - কুরুবংশ, রঘুবংশ ইত্যাদি। তাই মনে করা হয় যে, একমাত্র শাস্ত্রীয় ক্রিয়াকলাপ (পুজো, বিয়ে, উপনয়ন, শ্রাদ্ধ ইত্যাদি) ছাড়া শৰ্ম্মা, বৰ্ম্মা, ভূতি, দাস ইত্যাদি ব্যবহৃত হতো না। সম্ভবত তথাকথিত পৌরাণিক যুগের বেশ কয়েক শতাব্দী পরে হিন্দুসমাজে নামের সাথে পদবী জুড়ে দেওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়।

যেমন – ভবভূতি, দেবদাস, দেবদত্ত, বিষ্ণুশর্মা, ধর্মগুপ্ত, অগ্নিমিত্র ইত্যাদি। কিন্তু তখনও পদবীর দ্বারা বংশ পরিচয়ের রীতি ছিল না। আরও পরে দেবদত্তের জায়গায় দেবরূপ দত্ত, বিজয়সেনের বদলে বিজয়কুমার সেন, বিষ্ণুশর্মার পরিবর্তে বিষ্ণুসেবক শর্মা ইত্যাদির প্রচলন শুরু হয় এবং পদবী ক্রমশ বংশানুক্রমিক হয়ে ওঠায় ধীরে ধীরে বংশ পরিচয়ে পদবীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পদবীর ক্রমবিকাশের আলোচনায় জাতিতত্ত্ব (Ethnology) একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই তত্ত্বের মূল বিষয় হল সমগ্র মানবসমাজকে বিভিন্ন জাতিতে (race) ভাগ করা। মনে করা হয় যে, একসময় সকলে একই পরিবারভুক্ত ছিল, পরে তারা বিভিন্ন কারণে ভিন্ন ভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। অবিভক্ত বাংলায় জাতিতত্ত্ব নিয়ে সম্ভবত প্রথম আলোচনা করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। 'বঙ্গে ব্রাহ্মণাধিকার' শিরোনামে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় তিনি একটি প্রবন্ধ লেখেন ১২৮০ বঙ্গাব্দে। এরপরে 'বাঙ্গালীর উৎপত্তি' বিষয়ক আরও গোটা সাতেক প্রবন্ধ লেখেন তিনি। বঙ্কিমচন্দ্র ভাষার বিভাজনকেই জাতিতত্ত্বের মূল উৎস বলে মনে করেছিলেন, যদিও সেই মতবাদ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে।

বাংলায় জাতি বিভাজনের ইতিহাসে বল্লাল সেনের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। পাল যুগের শেষে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কমে আসে, মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ব্রাহ্মণ্যধর্ম। সেন বংশের রাজত্বকালে বিশেষত বল্লালসেনের সময় জাতিভেদ প্রথা একধরণের মান্যতা পেতে শুরু করে। বল্লালসেন কর্মভেদ বা পেশা অনুযায়ী হিন্দুজাতিকে ৩৬টি জাত বা শ্রেণীতে ভাগ করেন। মনে করা হয়. এইসময় থেকেই হিন্দুসমাজে শ্রেণী, গোষ্ঠী, স্পৃশ্য, অস্পৃশ্য এইরকম বিভাজন ধীরে ধীরে গেঁড়ে বসে। বিশেষত যেসব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ হিন্দু ধর্মে এলেন না, তাঁদের ওপর শুরু হয় নানারকম সামাজিক অত্যাচার। সমাজে তাঁরা পরিচিত হতে থাকেন অস্পৃশ্য, পতিত, ভ্রষ্ট ইত্যাদি পরিচয়ে।

অষ্টাদশ শতকে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সময় আবার এক অন্যরকম পরিবর্তন দেখা যায়। বাঙালি হিন্দুসমাজে দুটি বর্ণ প্রধান হয়ে দাঁড়ায় – বাহ্মণ ও শূদ্র। এমনকি বৈদ্য ও কায়স্থরা যাদের এতদিন সামাজিক সম্মান অনেকটাই বাহ্মণদের কাছাকাছি ছিল, তারাও চলে যায় শূদ্রের তালিকায়। ফলে শূদ্রের সংখ্যা গেল বেড়ে। তখন শূদ্রদের ভাগ করা হল তিনভাগেঃ—

(১) উত্তম সংকর বা জলচল শূদ্র—
(বৈদ্য, কায়স্থ, নবশাক ইত্যাদি) - ব্রাহ্মণরা এঁদের থেকে জল গ্রহণ করতে পারে, তাই জলচল শূদ্র।

(২) মধ্যম সংকর বা জল-অচল শূদ্র—
(কৈবর্ত, মাহিষ্য, আগুরি, সুবর্ণবণিক, গন্ধবণিক, সাহা- শুঁড়ি, বারুই, ময়রা বা মোদক, তেলি, কলু, জেলে, ধোপা ইত্যাদি) – ব্রাহ্মণরা এঁদের থেকে জল গ্রহণ করতেন না।

(৩) অধম সংকর বা অস্পৃশ্য—
(চণ্ডাল, যুগী, নমঃশূদ্র, পোদ, চামার, মুচি, ডোম, হাড়ি, বাউরি, বাগদি ইত্যাদি) – এঁরা ছিলেন একেবারেই ব্রাত্য। এমনকি নগরের বাইরে এঁদের স্থান দেওয়া হয়।

কৌলিন্যের বিচারে ব্রাহ্মণদেরও কয়েকরকম ভাগ দেখা যায় আঠারো শতকে। সেগুলি হলঃ—

(১) রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ —
রাঢ় অঞ্চল অর্থাৎ পশ্চিম ও পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়।

(২) বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ —
প্রাচীন গৌড় বা অধুনা উত্তরবঙ্গে (অর্থাৎ বরেন্দ্রভূমি অঞ্চলে) বসবাসকারী ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়।

(৩) বৈদিক ব্রাহ্মণ —
বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ, বেদচর্চাই ছিল যাঁদের প্রধান কাজ।

(৪) সপ্তশতী ব্রাহ্মণ —
সাত শতকের সমাহার থেকে সপ্তশতী কথাটি এসেছে। জনশ্রুতি, সাতশো শ্লোক বিশিষ্ট দেবীমাহাত্ম্যসূচক গ্রন্থ পাঠ করতেন এই শ্রেণীর ব্রাহ্মণেরা।

(৫) কনৌজ ব্রাহ্মণ —
জনশ্রুতি আছে যে রাজা আদিশূর কন্যকুব্জ থেকে পাঁচজন ব্রাহ্মণকে / পাঁচ শাখার ব্রাহ্মণকে বঙ্গদেশে নিয়ে আসেন পুত্রেষ্টি যজ্ঞের জন্য। এঁরাই হলেন কনৌজ ব্রাহ্মণ।

এ ছাড়াও আরও অজস্র বিভাজন আছে ব্ৰাহ্মণ সমাজে। এরকমই কৌলিন্যের ভাগ দেখা যায় কায়স্থ সমাজে (যেমন – ঘোষ, বসু, গুহ, মিত্র) ও বৈদ্যদের মধ্যে (যেমন - পঞ্চকোটি, রাঢ়, বারেন্দ্র, বঙ্গ ও পূর্বকুল)।

এখনও সমাজে পদবীর কৌলিন্যের প্রতি একধরণের পক্ষপাতিত্ব দেখা যায়। কথায় কথায় অস্পৃশ্য, অন্ত্যজ, হরিজন, নমঃশূদ্র, অ-জলচল, তপশিলি শব্দগুলোকে প্রায় একই অর্থে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু আদৌ তারা এক নয়। সরকারী ভাবে সংরক্ষিত জাতির তালিকা প্রস্তুতির কাজ শুরু হয় ১৯১১ সালে। প্রত্যেক রাজ্যে এই তালিকা আলাদা। অর্থাৎ, এক রাজ্যে যাঁরা অন্ত্যজ বলে বিবেচিত অন্য রাজ্যে হয়তো তাঁদের সামাজিক অবস্থান উঁচুতে। এর মূল কারণ আর্থিক সঙ্গতির পার্থক্য। ১৯২১ সালে সংরক্ষিত জাতি, উপজাতিকে তপশিলের অন্তর্ভুক্ত করার কাজ শুরু হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল আর্থিকভাবে অনগ্রসর মানুষদের উন্নতির জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দেওয়া।

পদবী দিয়ে জাত নির্ধারণ করার প্রবণতা অনেকের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়, যা সঠিক নয়। এরকম অনেক পদবী আছে যা একাধিক জাতির মধ্যে পাওয়া যায়। যেমন – কর্মকার, কুম্ভকার, তাঁতি, বারুই, সাহা, মালাকার ইত্যাদি পদবীগুলো অগ্রসর ও অনগ্রসর উভয় জাতির মধ্যেই পাওয়া যায়'।

আজ আমরা যে এতোরকমের পদবী দেখি তার উৎপত্তি কীভাবে তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। তবে, পদবীর উৎসের কয়েকটি সাধারণ সূত্র পাওয়া যায়ঃ—

(১) গোত্র ও প্রবর অনুসারে পদবীঃ—
মনে করা হয় পদবীর বিভিন্ন উৎসের মধ্যে গোত্র ও প্রবরভিত্তিক পদবীই সবচেয়ে প্রাচীন। গোত্রভিত্তিক পদবী আজও হিন্দুসমাজে বিয়ে ও অন্যান্য শাস্ত্ৰীয় কাজে গুরুত্বপূর্ণ। মোট ৩৭টি গোত্র ও ৬৯টি প্রবরের নাম পাওয়া যায়, যদিও আজকাল এত গোত্রনাম শোনা যায় না। গোত্র-প্রবর্তক ও সেই বংশের ঋষিদের প্রবর বলা হয়। যেমন, কাশ্যপ গোত্রের প্রবর – কশ্যপ, অপ্সার, নৈধ্রুব। গোত্রভিত্তিক যেসব পদবী এখনও প্রচলিত সেগুলি হল – ভার্গব, ভরদ্বাজ, কপিল, গর্গ, বিষ্ণু, গৌতম, কাশ্যপ ইত্যাদি। সব গোত্রই একসময় পদবী হিসেবে ব্যবহৃত হতো, এখনও কিছু রয়ে গেছে উত্তরাঞ্চলে ও মহারাষ্ট্রে।

(২) পেশা অনুসারে পদবীঃ—
পদবীর অন্যতম বড় উৎস ব্যক্তির পেশা বা কাজ। জীবিকার তাগিদে মানুষ যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন পেশায়। সেই পেশা জুড়ে গেছে নামের পদবী হিসেবে, এবং বংশপরম্পরায় বয়ে নিয়ে চলেছে সেই পেশার স্মৃতি। এরকমই কিছু পদবী হলো আচাৰ্য্য, কানুনগো, কীৰ্ত্তনীয়া, খাসনবিশ, গায়েন, ঘটক, চৌধুরী, জোয়ারদার, তালুকদার, তরফদার, থাণ্ডার, বক্সী, মহাপাত্র, মজুমদার, মালাকার, লস্কর, হাজরা, হালদার ইত্যাদি।

(৩) উপাধিভিত্তিক পদবীঃ—
রাষ্ট্রশক্তি বা রাজশক্তি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে উপাধি প্রাপ্তির চল বহু পুরোনো। যদিও উপাধি ব্যক্তিবিশেষকেই দেওয়া হতো, কিন্তু দেখা যায় অনেক উপাধিই পদবী হিসেবে ব্যবহার করে চলছেন তাঁর উত্তরপুরুষরাও। এরকম কিছু উপাধিভিত্তিক পদবী হলো – খাঁ, চক্রবর্তী, চূড়ামণি, বিদ্যাসাগর, রায়বাহাদুর ইত্যাদি।

(৪) স্থানভিত্তিক পদবীঃ—
জায়গার নাম থেকে অনেক পদবীর উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়, বিশেষত ব্রাহ্মণদের গাঞি পদবীগুলো। যেমন, গঙ্গ (গাঞি নাম) + উপাধ্যায় – গঙ্গোপাধ্যায়; বন্দ্যো (গাঞি নাম) + উপাধ্যায় – বন্দ্যোপাধ্যায় ইত্যাদি।

এছাড়াও, দেব-দেবী, প্রাণী, দ্রব্যের নাম থেকেও বিভিন্ন পদবী এসেছে। কিছু কিছু পদবীর উৎস আজও অজ্ঞাত।

পদবীর ইতিহাস আলোচনায় প্রাসঙ্গিকভাবেই আসে পদবী পরিবর্তনের কথা। ব্রিটিশ ভারতে ১৮৭৫ সালের পরে নাম ও পদবী পরিবর্তন আইনি শিলমোহর পায়। সাধারণত, তিনটি কারণে আইনানুগ পদ্ধতিতে পদবী পরিবর্তনের রীতি প্রচলিত। প্রথম – মেয়েরা বিয়ের পরে পৈতৃক পদবী ছেড়ে স্বামীর পদবী গ্রহণ করতে পারে; দ্বিতীয় – অন্য ধর্ম গ্রহণ করলে নাম ও পদবী দুইই পরিবর্তিত হতে পারে; তৃতীয় – কোনও ব্যক্তি নিজের ইচ্ছানুসারে নাম ও পদবী পরিবর্তন করতে পারে।

বাঙালি পদবীর ইতিহাস সত্যিই বিচিত্র, যার কোনও সরলরৈখিক সমীকরণ হয় না। কোনও পদবীই সাংস্কৃতিক ভাবে কুলীন বা অন্ত্যজ নয়। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক উত্থান-পতনই আসলে এই সামাজিক বৈষম্যের কারণ। শ্রীখগেন্দ্রনাথ ভৌমিক যথার্থই বলেছেন, ‘মানুষের পদবীহীন নাম-পরিচয় হবে শ্রেণীহীন (জাতবর্ণহীন) সমাজ গঠনের পথে একটি সার্থক পদক্ষেপ'।

‘জীবনের সব জেদ,
জাতপাত-ভেদাভেদ,
দ্বেষ-রেশ শেষ হোক’
         (অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়)।

নামের পাশে পদবীর জন্ম কিভাবে নিচের বিষয়টা ভালো করে পড়লে বুঝতে পারবেন—

১৫১০ সালে আনন্দ ভট্ট রচিত ও ১৯০৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া কর্তৃক প্রকাশিত “বল্লাল চরিত” নামক বইয়ে হিন্দু সমাজে পদবী প্রচলন সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। 

(তথ্যসূত্রঃ সমাজদর্পণ ১৫ বর্ষ, সংখ্যা ১২; জুন ১৯৯৯)। 

উক্ত গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, গৌড়ের বৈদ্য বংশীয় রাজা বল্লাল সেন (১১৫৮-১১৭৯ সাল) নিজ সহধর্মিণী থাকা অবস্থায় অধিক বয়সে পদ্মিনী নামে এক সুন্দরী ডোম নর্তকীকে বিয়ে করেন। এতে দেশজুড়ে রাজার সুনাম বিনষ্ট হয় এবং এ কুকীর্তি নিয়ে প্রজারা সমালোচনা শুরু করে দেন। রাজা এই কলঙ্ক থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য সকল সম্প্রদায়ের প্রজাদের এক সম্মিলিত ভোজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। কিন্তু, সকল সম্প্রদায়ের লোকেরা উপস্থিত থাকলেও নমশূদ্র বিপ্রগণ এই ভোজ অনুষ্ঠানে যোগদানে বিরত থাকেন, অর্থাৎ রাজার এই কুকীর্তিকে সমর্থন করে তারা ভোজ সভায় অংশ নেয় নি। রাজা তাদের ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হন এবং নমশূদ্র লোকদের চাকরীচূত করেন। শুধু তাই নয়, রাজা তাদের চণ্ডাল বলে গালাগাল করে নগর বন্দর থেকে উৎখাত করে দেন। অন্যদিকে ভোজ সভায় অংশগ্রহণকারী সম্প্রদায়ভুক্তরা রাজার সকল কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিয়ে রাজার অনুগ্রহ লাভ করতে যত্নবান হন। রাজাও এসব সম্প্রদায়কে সাহায্য করেন এবং অনেক সম্প্রদায়কে কৌলীন্য বা টাইটেল দান করেন।

এভাবেই, বল্লালসেন পদবী বৈষম্য সৃষ্টি করে হিন্দু সমাজে বিষাক্তবীজ বপন করেছিলো, যা বর্তমানে আত্মঘাতী রুপ ধারণ করেছে । বল্লালসেনের পরবর্তী বংশ ধর লক্ষণ সেনের ভূমিকাও ছিল লজ্জাকর। এই পদবীর বৈষম্য আজও আমাদেরকে দুর্বল করে রেখেছে। সেন রাজারা বাঙালি ছিল না। তবুও, পদবী বৈষম্য সৃষ্টি করে বাঙ্গালীদের শাসন করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।

পরবর্তীতে মানুষের সৃষ্ট এ জাতের নামে বজ্জাতি ও পদবী বৈষম্য একজন হিন্দুর সাথে অন্য অন্য হিন্দুর দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। এতে হিন্দু সমাজের হয়েছে অপূরণীয় ক্ষতি।ধর্মান্তরিত হয়েছে অসংখ্য নিম্নশ্রেণী ও বর্ণের হিন্দুরা।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় ১৮ অধ্যায়ের ৪১ নং শ্লোকে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে— “মানুষের গুণ অনুসারে ব্রাহ্মন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের কর্ম সমূহ বিভক্ত করা হয়েছে।” অথ্যাৎ, গুণ অনুসারে কর্ম সমূহ বিভক্ত করা হয়েছে, জন্ম অনুসারে মানুষকে বিভক্ত করা হয়নি। 

রাস্তায় যেমন সকল যানবাহন একই গতিতে চলতে পারে না, তেমনি সমাজের সকল মানুষও সম আর্থিক সচ্ছলতায় চলতে পারে না। তাই সমাজের কেউ ডাক্তার, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ দারোয়ান, কেউ বা সুইপার। নিজের যোগ্যতার উৎকর্ষ সাধন করতে পারলে একজন কর্মকর্তা যেমন পদন্নোতি পান, তেমনি আমরা নিজ নিজ বর্ণ পরিবর্তন না করেও স্ব স্ব বর্ণে দক্ষতা অর্জন করে উচ্চাসনে বসতে পারি। কোন বর্ণ উঁচু আর কোন বর্ণ নিচু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় তা কোথায় উল্লেখ করেনি।

বর্ণবাদের কোনোকিছু নিয়ে শাস্ত্রের মধ্যে নেই যা শাস্ত্রে নেই তা সমাজে কেন থাকবে, মানুষের তৈরি করা এই বর্ণবাদ নির্মূল হোক।

"সুতরাং, একজন মানুষ জন্মসূত্রে নয়; বরং, তার কর্মগুণে স্বীকৃতি লাভ করুক এটাই আজ সকলের প্রত্যাশা।"

শ্রী বাবলু মালাকার
সনাতন ধর্মের প্রচারক, বাংলাদেশ।

                     আমরা এই জাত-পাত ভুলে,
                    একটি হিন্দু একতা গড়ি তুলি।

জয় শ্রীকৃষ্ণ, জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব।

তথ্যসূত্রঃ—
১) বঙ্গীয় শব্দকোষ - হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
২) আমাদের পদবীর ইতিহাস - লোকেশ্বর বসু।
৩) পদবীর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস - শ্রীখগেন্দ্রনাথ ভৌমিক। 
৪) বাংলার পদবি কথা - দেবাশিস ভৌমিক।

   

Post a Comment

0 Comments