Bablu Malakar

पवित्र वेद धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते

পুরুষদের পুরুষসূক্তম্ সম্পর্কে দ্বিতীয় তত্ত্ব জেনে নিন

পুরুষসূক্ত (সংস্কৃত: पुरुष सूक्त) হল ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের অন্তর্গত একটি স্তোত্র (৯০ সংখ্যক স্তোত্র)। এটি "পরব্রহ্ম" বা পুরুষের উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত তার মধ্যে থেকে নিম্নে ৩টি সুক্ত দেওয়া হল এই দৃশ্যতে শুধুমাত্র ১,২ ও ৩ এর মধ্যে বলা হয়েছে—

সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ।
স ভূমিং বিশ্বতো বৃত্বা অত্যতিষ্ঠ দশাঙ্গুলম্।। (১)

অনুবাদঃ— সেই সর্ব  ব্যাপক পরমেশ্বরের সহস্র শির, সহস্র নেত্র,  সহস্র পা।  তিনি জগৎকে সর্ব দিক হতে ব্যপ্ত করিয়া  পাঁচ স্থুল ভূত ও পাঁচ সুক্ষভুত জগতকে অতিক্রম করিয়া অবস্থান করিতেছে।

পুরুষ এবেদং সর্ব্বং যদ ভূতং যচ্চ ভাব্যম।
উতামৃত্ত্বস্যেশানো যদন্নেনাতিরোহতি।। (২)

অনুবাদঃ— যাহা উৎপন্ন হয়েছে যাহা উৎপন্ন হবে এই সবকিছুই পুরুষই [পুরুষাধিষ্ঠিত]। এবং অমৃতস্বরূপ মোক্ষের স্বামী যাহা অন্ন দ্বারা বৃদ্ধি পায় [তাহারও স্বামী]।

এতাবানস্য মহিমাতো জ্যায়াংশ্চ পুরুষঃ।
পাদোস্য বিশ্বা ভূতানি ত্রিপাদস্যামৃতং দিবি।। (৩)

অনুবাদঃ— এই জগতের মহান সামর্থ এতই যে,  এবং এই পরমেশ্বর তাহা থেকেও অধিক বড় সমস্ত উৎপন্ন পদার্থ  ইহার এক পাদ [একাংশে স্থিত] ইহার তিন পাদ জ্ঞান প্রকাশস্বরূপ অবিনাশী।

সৃষ্টির রহস্যের অনেক ধরণের ব্যাখ্যা হয়, নাসদীয়সূক্ত তার একটা দিক। নাসদীয়সূক্ত হচ্ছে। পুরােপুরি দার্শনিক তত্ত্বের মাধ্যমে সৃষ্টির ব্যাখ্যা, অন্য দিকে পুরুষসূক্ত হচ্ছে সৃষ্টির রহস্যের ব্যাখ্যার। ব্যাপারে আরেকটি দিক। নাসদীয়সূক্তমের মত পুরুষসূক্তমের দর্শন খুব একটা জটিল নয়। সৃষ্টি নিয়ে। আমাদের যে সচরাচর ধারণা, যেগুলাে আমরা ছােটবেলা থেকে শুনে আসছি সেটাকেই পুরুষসূক্তমে পৌরাণিক আকারে কাব্যিক শৈলীতে ব্যক্ত করা হয়েছে। পুরুষসূক্তমের প্রথম মন্ত্র হচ্ছে—

সহস্রশীরূষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষ  সহস্রপাৎ।
স ভূমিং বিশ্বতো বৃত্বা অত্যতিষ্টদ্দশাঙ্গুলম্ ।।

বেদে পুরুষ শব্দ অনেক অর্থে ব্যবহার করা হয়। বেদে ভগবান বা ঈশ্বর শব্দ আমরা পাইনা, কিন্তু ভগবান বা ঈশ্বর বলতে যা বুঝি বেদে তাঁকেই পুরুষ বলে সম্বােধন করা হয়েছে। আবার অনেক সময় এই পুরুষকে ইঙ্গিত করা হয় যিনি অন্তর্যামী রূপে আমাদের হৃদয়ে বাস করেন।

তাই পুরুষের দুটি অর্থ হয়— একটি হচ্ছে বিরাট আর দ্বিতীয় হচ্ছে স্বরাট। প্রত্যেক প্রাণীর হৃদয়ে যিনি আছেন তিনিই সেই পুরুষ বা স্বরাট আবার পুরাে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে ভগবান রূপে যিনি বিরাজমান তিনিই পুরুষ। এখানে সেই পুরুষের বর্ণনা করা হচ্ছে, তিনি কি রকম? তাঁর সহস্ৰশীরষা, সহস্রাক্ষ, সহস্রপাৎ, সেই পুরুষের হাজারটি মাথা, হাজারটি চোখ, হাজারটি হাত। বেদে হাজার শব্দটা দিয়ে অনন্তকে বােঝায়। আগেকার। দিনের মানুষরা গুনতে জানত না, তাই সাধারণ মানুষদের জন্য বিভিন্ন রকম ভাবে এই সংখ্যাগুলাের ধারণা করিয়ে দেওয়া হত। এখনও গ্রামে গঞ্জে যেসব মানুষরা হিসেব বা গুনতে জানে না তারা সব কিছুতে কুড়ি দিয়ে হিসেব করে – এক কুড়ি, দু-কুড়ি, তিন-কুড়ি এইভাবে। আগে মানুষ আঙ্গুলের সাহায্যে গুনতাে, দুই হাতে পাঁচ যুক্ত পাঁচ দশটি আঙ্গুল আবার পায়ের দশটা আঙ্গুল, সব মিলিয়ে কুড়িটা আঙ্গুল, এই কুড়ির বাইরে কোন সংখ্যা এদের ধারণা ছিল না। কুড়ির বাইরে তারা তাই এক-কুড়ি, দু-কুড়ি এই ভাবে হিসাব করত। যদিও বেদের ঋষিরা সংখ্যার হিসাব জানতেন, কিন্তু কবিতায় কাব্যিক ভাবকে ফোটাবার জন্য ওনারা অনন্তকে বােঝাবার জন্য সহস্র বলে দিলেন।
ঠিক এই ভাবটাই আমরা উপনিষদ ও গীতাতেও পাব, বিশেষ করে গীতাতে খুব প্রচলিত একটি শ্লোক আছে যেখানে বলা হচ্ছে—

সর্বতঃ পাণিপাদং তৎ সর্বতােহক্ষিশিরােমুখম্।
সর্বর্তঃ শ্রুতিমল্লোকে সুবৰ্মাবত তিষ্ঠতি ।।
(গীতা ১৩/১৪)

(১৩/১৪) - ভগবানের সর্বত্র পা, সর্বত্র তাঁর চোখ, সর্বত্র তাঁর মাথা, সর্বত্র তাঁর কান। এর অর্থ হচ্ছে, ভগবান স্বরূপতঃ নিষ্ঠুণ নিরাকার এবং সাপী। তাই তাঁর যে অঙ্গ আছে তা সব জায়গাতেই বিদ্যমান হবে।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে—

জ্ঞেয়ং যত্তৎ প্রবক্ষ্যামি যজ্‌জ্ঞাত্বাহমৃতমশ্নুতে । অনাদিমৎপরং ব্রহ্ম ন সৎ তন্নাসদুচ্যতে ।।

সর্বদিকে তাঁহার হস্তপদ, সর্বদিকে তাঁহার চক্ষু, মস্তক ও মুখ, সর্বদিকে তাহার কর্ণঃ এইরূপে এই লোকে সমস্ত পদার্থ ব্যাপিয়া তিনি অবস্থিত আছেন। (গীতা, ১৩/১৩)

সর্বতঃ পাণিপাদং তৎ সর্বতোহক্ষিশিরোমুখম্ । সর্বতঃ শ্রুতিমল্লোকে সর্বমাবৃত্য তিষ্ঠতি ।।

তিনি চক্ষুরাদি সমুদয় ইন্দ্রিয় বৃত্তিতে প্রকাশমান অথচ সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিত, নিঃসঙ্গ অর্থাৎ সর্বসঙ্গশূন্য অথচ সকলের আধারস্বরূপ, নির্গুণ অথচ সত্ত্বাদি-গুণের ভোক্তা বা পালক। (গীতা ১৩/১৪)

সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্ । অসক্তং সর্বভৃচ্চৈব নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ ।।

সর্বভূতের অন্তরে এবং বাহিরেও তিনি; চল এবং অচলও তিনি; সূক্ষ্মতাবশতঃ তিনি অবিজ্ঞেয়; এবং তিনি দূরে থাকিয়াও নিকটে স্থিত। (গীতা ১৩/১৫)

বহিরন্তশ্চ ভূতানামচরং চরমেব চ । সুক্ষ্মত্বাৎ তদবিজ্ঞেয়ং দূরস্থং চান্তিকে চ তৎ ।। 

তিনি (তত্ত্বতঃ বা স্বরূপতঃ) অপরিচ্ছিন্ন হইলেও সর্বভূতে ভিন্ন-ভিন্ন বলিয়া প্রতীত হন। তাঁহাকে ভূতসকলের পালনকর্তা, সংহর্তা ও সৃষ্টিকর্তা বলিয়া জানিবে। (গীতা, ১৩/১৬)

অবিভক্তঞ্চ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্ । ভূতভর্তৃ চ তজ্‌জ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ ।।

তিনি জ্যোতিসকলেরও (সূর্যাদিরও) জ্যোতিঃ; তিনি তমের অর্থাৎ অবিদ্যারূপ অন্ধকারের অতীত, তিনি বুদ্ধিবৃত্তিতে প্রকাশমান জ্ঞান, তিনি জ্ঞেয় তত্ত্ব, তিনি জ্ঞানের দ্বারা লভ্য, তিনি সর্বভূতের হৃদয়ে অবস্থিত আছেন। (গীতা, ১৩/১৭)

জ্যোতিষামপি তজ্জ্যোতিস্তমসঃ পরমুচ্যতে । জ্ঞানং জ্ঞেয়ং জ্ঞানগম্যং হৃদি সর্বস্য বিষ্ঠিতম্ ।।

এই প্রকারে ক্ষেত্র, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় কাহাকে বলে সংক্ষেপে কথিত হইল। আমার ভক্ত ইহা জানিয়া আমার ভাব বা স্বরূপ বুঝিতে পারেন, বা আমার দিব্য প্রকৃতি প্রাপ্ত হন। (গীতা, ১৩/১৮)

ইতি ক্ষেত্রং তথা জ্ঞানং জ্ঞেয়ঞ্চোক্তং সমাসতঃ । মদ্ভক্ত এতদ্বিজ্ঞায় মদ্ভাবায়োপপদ্যতে ।।

প্রকৃতি ও পুরুষ, উভয়কেই অনাদি বলিয়া জানিও। দেহেন্দ্রিয়াদি বিকারসমূহ এবং সুখ, দুঃখ, মোহাদি গুণসমূহ প্রকৃতি হইতেই উৎপন্ন হইয়াছে জানিবে। (গীতা, ১৩/১৯)

প্রকৃতিং পুরুষঞ্চৈব বিদ্ধ্যনাদী উভাবপি । বিকারাংশ্চ গুণাংশ্চৈব বিদ্ধি প্রকৃতিসম্ভবান্ ।।

শরীর ও ইন্দ্রিয়গণের কর্তৃত্ব বিষয়ে প্রকৃতিই কারণ, এবং সুখ, দুঃখ ভোগ বিষয়ে পুরুষই (ক্ষেত্রজ্ঞ) কারণ বলিয়া উক্ত হন। (গীতা, ১৩/২০)

কার্য্যকারণকর্তৃত্বে হেতুঃ প্রকৃতিরুচ্যতে । পুরুষঃ সুখদুঃখানাং ভোক্তৃত্বে হেতুরুচ্যতে ।।

পুরুষ প্রকৃতিতে অধিষ্ঠিত হইয়া প্রকৃতির গুণসমূহ ভোগ করেন এবং গুণসমূহের সংসর্গই পুরুষের সৎ ও অসৎ যোনিতে জন্মগ্রহণের কারণ হয়। (গীতা, ১৩/২১)

পুরুষঃ প্রকৃতিস্থো হি ভুঙ্‌ক্তে প্রকৃতিজান্ গুণান্ । কারণং গুণসঙ্গোহস্য সদসদ্‌যোনিজন্মসু ।।

এই দেহে যে পরম পুরুষ আছেন, তিনি উপদ্রষ্টা, অনুমন্তা, ভর্তা, ভোক্তা, মহেশ্বর ও পরমাত্মা বলিয়া উক্ত হন। (গীতা, ১৩/২২)

উপদ্রষ্টানুমন্তা চ ভর্তা ভোক্তা মহেশ্বরঃ । পরমাত্মেতি চাপ্যুক্তো দেহেহস্মিন্ পুরুষঃ পরঃ ।।

যিনি এই প্রকার পুরুষতত্ত্ব এবং বিকারাদি গুণ সহিত প্রকৃতিতত্ত্ব অবগত হন, তিনি যে অবস্থায় থাকুন না কেন, পুনরায় জন্মলাভ করেন না অর্থাৎ মুক্ত হন। (গীতা, ১৩/২৩)

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৩/১৪ শ্লোকটি আবার এইভাবেও ব্যাখ্যা করা হয়— এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু আছে সবই তাঁরই চোখ, তাঁরই হাত, তাঁরই মুখ। ভগবানের যে সত্যিকারের হাজারটা হাত, পা, মুখ আছে তা নয়, তিনি অনন্ত। কিন্তু অনন্তকে বর্ণনা করা যাবে না, সংখ্যা দিয়ে তাঁকে মাপা যাবে না, সেইজন্য হাজার শব্দ দিয়ে সেই অনন্তকেই বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

এইবার আরেকটি ব্যাখ্যা হয়— যে ভগবান তিনি সবার সাথেই জুড়ে আছেন, সবার সঙ্গে এক হয়ে আছেন সেইজন্য সব হাতই তাঁর হাত সব চোখই তাঁর চোখ, সব মুখই তাঁর মুখ। মা যেমন সন্তানকে বলে - বাবা, তুমি খেলেই আমার খাওয়া হয়। কেন বলছে মা? কারণ মায়ের সাথে সন্তানের এমন একত্ববােধ হয়ে আছে যে সন্তান খেলেই মায়েরও খাওয়া হয়ে যাচ্ছে। এখানে মা সন্তানের সাথে জুড়ে রয়েছে। প্রথম মন্ত্রের দ্বিতীয় লাইনে বলছেন–

স ভুমিং বিশ্বত বৃত্বা অত্যতিষ্ঠদ্দশাঙ্গুলম্

এখানে ভূমিং বলতে শুধু এই পৃথিবীকেই নয় সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বােঝাচ্ছে। এই পুরুষ পুরাে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে রয়েছেন। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে রয়েছেন কিন্তু তিনি নিজে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে একটু বেশি।

কতটা বেশি?
দশাঙ্গুল, মানে দশ আঙ্গুল বেশি। এখন কে মেপে দেখেছে যে ভগবান এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে দশ আঙ্গুল বেশি? কেউই দেখেনি, এইটাই হচ্ছে ভগবানের মহিমার কাব্যিক ব্যঞ্জনা, এইটাই হচ্ছে কবিত্ব। ফিজিক্সের থিয়ােরি অনুযায়ী ব্রহ্মাণ্ড যতই বিস্তার হতে থাকুক কিন্তু বেদের কবিতায় পুরুষ সব সময়ই ব্রহ্মাণ্ড থেকে দশ আঙ্গুল বেশি থাকবেন, তার মানে ভগবান সব সময় বড়ই থাকবেন। আমরা যে বলছি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে ভগবান, তার মানে এই নয় যে এই ব্রহ্মাণ্ড যেখানে গিয়ে শেষ হয়ে যাবে ভগবানও সেইখানেই শেষ হয়ে যাবেন, ব্রহ্মাণ্ড যতই বাড়তে থাকুক ভগবান সব সময় তার থেকে দশ আঙ্গুল বেশি থাকবেন। ভগবান সব সময়ই বড়ই থাকবেন। ভগবানের এই বৈশিষ্ট্যতাকে যতটা কাব্যিক ভাবে প্রস্ফুটিত করা যায় বিজ্ঞানের দ্বারা বােঝা যাবে না। একজন কবি একটা কবিতা লিখেছিলেন—

A man is born in every second and a man dies in every second.

এখন এক বিজ্ঞানীর হাতে যখন এই কবিতাটা পড়েছে তখন সে ঘাের আপত্তি করে বলছেন – মহাশয়, আপনার কবিতাতে একটা ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে, মৃত্যু ১.৩ সেকেণ্ডে হয়। কিন্তু কবিতার জন্য ১.৫ সেকেণ্ড মেনে নেওয়া যেতে পারে।

কেন বললেন?
কারণ কবিতাকে মেলাতে হবে তাে। যখন কোন কবি কিছুর বর্ণনা করবেন তিনি একটা ভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এক ভাবে বলবেন, আবার কোন যুক্তিবাদী যখন সেই জিনিষটাকেই বর্ণনা করবে তখন সে অন্য ভাবে বলবেন। কিন্তু বিষয় বস্তুর ভাবের মধ্যে কোন তারতম্য থাকবে না। এই দশাঙ্গুলমের যে ব্যাখ্যা এখানে দেওয়া হয়েছে, পরবর্তি কালে অনেক পণ্ডিতরা এইটাকে আবার অন্য ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁরা বলছেন যে নাভীমূল হচ্ছে আমাদের সমগ্র শরীরের কেন্দ্রবিন্দু, এই কেন্দ্রবিন্দুর থেকে ঠিক দশ আঙ্গুল উপরে পুরুষের বাস। এখন আমরা সবাই জানি যে নাভিস্থল থেকে দশ আঙ্গুল মেপে মেপে যে জায়গাটায় আসবে সেটাকে বলা হচ্ছে হৃদয়।

ভগবান কোথায় বাস করেন?

এই প্রশ্ন করলে মােটামুটি সব ভক্তই বলে দেবেন তিনি হৃদয়ে বাস করেন।

এইবার আমি যুক্তি দিয়ে বলছি—
মানুষ কুকুরকে ভয় পায়, সেইজন্য যাদের বাড়িতে কুকুর আছে সেই বাড়ির দরজার উপর নােটিশ লাগান থাকে, ‘কুকুর হইতে সাবধান’। কিন্তু এইটাই আশ্চর্য যে মানুষ ভগবানকে কখনই ভয় করে না।

কোথাও কি লেখা থাকে—
‘ভগবান হইতে সাবধান’?
আমরা কি কেউ ভগবানকে ভয় পাই?

একজন মহিলা নিজের স্বামীকে দাবিয়ে রাখে কিন্তু একটা টিকটিকি আরশােলা দেখলে ভয়ের চোটে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করে দেব। স্বামী বেচারাদের অবস্থা টিকটিকি আরশােলার থেকেও অধম। আমরাও কুকুরকে ভয় পাই কিন্তু ভগবানকে ভয় পাই না, কারণ মিথ্যে কথা বলা, চুরি করা, ছলচাতুরি করা সব করছি।

ভগবান কুকুরের থেকেও অধম তোমাদের কাছে মনে হতে পারে। কিন্তু ঋষিদের কাছে তা ছিল না, তাঁদের কাছে ঈশ্বর হচ্ছে অত্যন্ত উচ্চ, তাই তাঁরা ভগবানকে স্থান দিলেন অত্যষ্টিদ্দশাল, আমাদের শরীরের কেন্দ্রস্থল থেকে ঠিক দশ আঙ্গুল উপরে হৃদয়ে, ভগবানের বাস সবার হৃদয়ে। কিন্তু আমাদের হৃদয়ে ভগবান ছাড়া বাকি সব কিছুই। আছে, কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ, মাৎসর্য এইগুলিতেই আমাদের হৃদয় পূর্ণ হয়ে রয়েছে। আমাদের বেদের ঋষিদের ধারণা ছিল – যদি আমি সেই পুরুষকে অন্তর্যামী রূপে দেখে, স্বরাট রূপে দেখি তখন তিনি আমাদের হৃদয়ে বাস করছেন। আবার যখন বিরাট রূপে দেখি তখন তিনি সবটাতেই আছেন আবার যতটুকু এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তার থেকেও দশ আঙ্গুল বেশি আছেন। আসল ভাব যেটা ঋষিরা বলতে চাইছেন তা হচ্ছে তিনিই আছেন, তিনি ছাড়া আর কিছু নেই, সব চোখ তাঁর চোখ, সব মুখ তাঁর মুখ, সব হাত তাঁর হাত, সব পা তাঁর পা। এইটাই গীতাতে যে শ্লোকটা আমরা একটু আগে আলােচনা করলাম তাতে খুব সুন্দর করে বর্ণনা করা হয়েছে। এই নিয়ে দ্বিতীয় মন্ত্রে বলা হচ্ছে—

পুরুষ এবেদগং সর্বম্ যদ্ভুতং যচ্চ ভব্যম্। উতামৃতাত্বশেসানঃ যদন্নেনাতিরােহতি।।

যদ্ভুতং যা কিছু হয়ে গেছে, যচ্চ ভব্যম, যা কিছু হবে, পুরুষ এবেদগং – এই সবটাই ঈশ্বরই হয়েছিলেন আবার হবেন।

রামকৃষ্ণ বলছেন— ঈশ্বর বস্তু আর সব অবস্তু। এই কথাতে সবাই মনে। করেন ঈশ্বরই বস্তু আর বাকী সব ফালতু জিনিষ। আদপেই তা নয়, বক্তব্য হচ্ছে ঈশ্বরই আছেন, তিনি। ছাড়া আর কিছুই নেই।

এই যে বােতলটা আছে এটাকে আমরা কি বলব?
বস্তু না অবস্তু? ঈশ্বর রূপে এই বােতলটা বস্তু, আর বােতল রূপে দেখলে অবস্তু। কিন্তু এই বােতলও ঈশ্বরের একটা রূপকে প্রকাশিত। করছে। কিন্তু যখনই আমরা এই ঈশ্বরের রূপকে সরিয়ে বস্তু রূপে দেখবে তখনই সেটা অবস্তু হয়ে যাবে।

টাকাকে মানুষ কিভাবে দেখে?
সবই যদি তিনি হন, তাহলে টাকাকেও ঈশ্বর রূপে দেখতে হবে, গয়নাগাটিতেও ঈশ্বর দেখতে হবে। কিন্তু পুরুষদের সমস্যা হয় তারা একমাত্র টাকাতেই ঈশ্বর দেখে আর মেয়েরা গয়নাতেই ঈশ্বরকে দেখে, এর বাইরে আর কোথাও ঈশ্বরকে দেখতে চায়না।

এইবার পুরুষসূক্তমে বলছে– যদ্ভুতং যচ্চ ভব্যম, যা কিছু হয়েছিল যা কিছু হবে সবই ঈশ্বর, ঈশ্বর বই আর কিছুই নেই। টাকাপয়সা, সােনার গয়নাতে যে ঈশ্বর দেখছে এতে কোন ভুল নেই, সেখানে ঈশ্বর দেখুক সব ঠিক আছে, কিন্তু এই টাকা-পয়সা।

গয়নার বাইরে মানুষ কি দেখছে?
স্বামীজীকে এক আমেরিকান বিদূষী মহিলা বলছেন– স্বামীজী আপনি আত্মা, ব্রহ্ম, ঈশ্বর, জীব সব যা বলছেন শুনতে খুবই ভালাে লাগছে, সবই ঠিক বলছেন। কিন্তু আমি আমার আত্মার ছবি আমার গয়না, আমার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স, আমার নাম যশ প্রতিপত্তির মধ্যেই দেখতে পাই।

স্বামীজী বলছেন— ‘ম্যাডাম্‌ আপনি তাই দেখতে থাকুন, কোন আপত্তি নেই, হাজার হাজার জন্ম ধরে এই গুলাের মধ্যে আপনি আপনার আত্মাকে দেখতে থাকুন, আপনার যেখানে দেখে আনন্দ হবে সেখানেই দেখুন, কারণ আনন্দ হচ্ছে ঈশ্বরেরই একটি গুণ, তিনি সচ্চিদানন্দ কিনা। তারপর কোন জন্মে যখন তুমি আঘাত পাবে, কষ্ট পেয়ে চেঁচামেচি করবে, কান্নাকাটি করবে তখন তুমি ঘুরে দাঁড়াবে। যেখানেই নিরানন্দ সেই জায়গাটা যেন মনে হচ্ছে ঈশ্বরের বাইরে। না সেইটাও ঈশ্বরের মধ্যে, কেননা যা কিছু সবই ঈশ্বর। এইটাই আমাদের মূল সমস্যা, আমরা কিছু জিনিষকে দেখে আনন্দ পাই, কিছু জিনিষকে দেখলে মনে নিরানন্দের ভাব এসে যায়। অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিনিষের জন্যই আমাদের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট, কেননা আমরা কিছু পছন্দ মত কর্ম করতে চাই, আমরা আমাদের নিজেদের কিছু পছন্দের লােকের সাথে কথা। বলতে চাই, কিছু পছন্দের লােকের সঙ্গ পেতে চাইছি, তারফলে আমাদের যত রকমের দুঃখ-কষ্ট, কথায়। বলে যার আছে ভালােবাসা তার আছে ঘৃণার মত দুর্বাসা। অথচ ভগবান যে সবার মধ্যে রয়েছে সেটাকে। ভুলে আমরা ভগবানের থেকে দূরে পালাবার চেষ্টা করে চলেছি, কিন্তু পালিয়ে যেখানেই হাজির হচ্ছি। সেখানেও ভগবান আগে থাকতেই আমার জন্য বসে আছেন। যখন আমরা কোন কিছুর থেকে পালাচ্ছি, তার মানে এইটি আমার কাছে ভগবান নয়, তার মানে হচ্ছে আমার মধ্যে গলদ রয়েছে।

কারণ যার মনে কোন রকমের গলদ থাকবে না তার কাছে— যদ্ভুতং যচ্চ ভব্যম, যা কিছু আছে সব ভগবানই। যদিও এটাকে তত্ত্বগত ভাবে মেনেও নেওয়া যায়, মেনে নিয়ে বিশ্বাস করে বলছি আমি জানি তিনিই এই সব কিছু হয়েছেন কিন্তু আমি এখন সব কিছুতে তাঁকে দেখছি না, আমি জানি একদিন আসবে যখন আমি এটা প্রত্যক্ষ করব যে তিনিই সব কিছু, এইটুকুও যদি কেউ ভাবতে পারে তাহলে বুঝে নিতে হবে সে আধ্যাত্মিক পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষতাে মানতেই চাই না, এইসব কথা শােনার বা জানার সুযােগই পায় না। কেউ সুযােগ পেলে শুনতে চায়না, কানে আঙ্গুল চাপা দিয়ে দেয়। দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণের কাছে অনেকে এসে রামকৃষ্ণ কথা শুনছে, তাদের সঙ্গের বন্ধুরা যারা এসেছে কানের কাছে এসে বলছে আর কতক্ষণ চল না এবার। শেষে যখন উঠছে না দেখছে তখন রেগেমেগে বলছে তুই এইখানে থাক আমরা নৌকাতে গিয়ে বসছি। এইসব আধ্যাত্মিক কথাকে এদের মস্তিষ্ক নিতে পারে না। পশু জন্ম থেকে প্রথম মানুষ জন্ম হলে এই রকমই হয়ে থাকে।

শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন ধর্মের প্রচারক, বাংলাদেশ)।

জয় শ্রীরাম,
হর হর মহাদেব।

Post a Comment

0 Comments