শ্রী শ্রী চণ্ডীতে বলা হয়েছে, শরৎকালেই মা দুর্গার মহাপূজা—
শরৎকালে মহাপূজা ক্রিয়তে চ বার্ষিকী।
তস্যাং মমৈতন্মাহাত্ম্যং শ্রুত্বা ভক্তিসমন্বিতঃ।।
(শ্রীশ্রীচণ্ডী, ১২/১২)
অর্থাৎ শরৎকালে যে বার্ষিক মহাপূজা অনুষ্ঠিত হয়, সেই সময় আমার এই মাহাত্ম্য যে ভক্তিসহকারে শ্রবণ করে, সেই মানুষ আমার কৃপায় সকল বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত হয় এবং ধন, ধান্য ও পুত্রাদি লাভ করে—এতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই।
তামগ্নিবর্ণাং তপসা জ্বলন্তীং বৈরোচনীং কর্ম্ফলেষু জুষ্টাম্।
দুর্গাং দেবীং শরণমহং প্রপদ্যে সুতরসি তরসে নমঃ।।
(কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যকের দশম প্রপাঠক)
অর্থাৎ আমি সেই বৈরোচনী, জ্যোতির্ময়ী অগ্নিবর্ণা, স্বীয় তাপে শত্রুদহনকারিণী, জীবের কর্মফলদাত্রী দুর্গাদেবীর শরণ নিলাম। হে সংসার-ত্রাণকারিণি দেবী তুমি আমার পরিত্রান করো, তোমায় প্রণাম।
দেবীদুর্গা ধ্যানমন্ত্রের বর্ণনানুসারে মায়ের প্রতিমা জগজ্জননীরূপে ও মাতৃরূপী পরমব্রহ্মেরই উপসনা করি এবং শুদ্ধ হৃদয়ে মাতৃ আরাধনা করি।
বিজয়া দশমী কি?
দেবীদুর্গাকে আমরা মাতৃরূপে তিনদিন পূজা করলেও দেবীদুর্গাকে কন্যারূপে আমরা বিদায় জানাই। দশমীতে দেবীদুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শারদীয়া দুর্গোৎসব। দেবী দুর্গাকে বেদনাবিধূর বিদায়লগ্নে তেল, সিঁদুর ও পান দিয়ে মিষ্টিমুখ করানো হয়। এরপর শোভাযাত্রা। সর্বশেষ প্রতিমা বিসর্জন। দুর্গাপুজোর ইতি ঘটে এই দশমীতে৷ এই দিনটিকে বিজয়া দশমী বলার নানা কারণ রয়েছে৷ সনাতন হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী দশমীর দিনে মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে ফিরে যাবেন মা দুর্গা এই দিনটিকে বিজয়া দশমী বলা হয়। এই বিষয়ে নানা কারণ রয়েছে বেশ কিছু পৌরাণিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।
এই দশমীকে বিজয়া বলার কারণ হল—
নয় দিন নয় রাত্রি ধরে মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করে দশম দিনে দেবী জয়লাভ করেন৷ শ্রী চণ্ডী কাহিনী অনুসারে দেবী আবির্ভাব আর্শ্বিন মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশীতে এবং শুক্লা দশমীতে মহিষাসুরকে বধ করেন৷ বিজয়া দশমী সেই বিজয়কেই চিহ্নিত করে৷ তবে উত্তর ও মধ্য ভারতে এই দশমীর দিনে দশেরা উৎসব পালন করে৷ দশেরা শব্দের উৎপত্তি দশহর শব্দটি থেকে যা দশমাথা রাবণের মৃত্যুকে সূচিত করে৷ কৃত্তিবাস রামায়ণ অনুসারে শ্রীরামচন্দ্র এই দশমীর দিনে রাবণকে বধ করে বিজয় লাভ করে ছিলেন। সেই প্রথা মেনেই দেশের বিভিন্ন স্থানে রাবণের মূর্তি অথবা কুশপুতুলে আগুণ ধরিয়ে দেওয়া হয়৷ কোথায়ও বা ওই রাবণের মূর্তির ভিতরে রাখা নানা রকম শব্দ ও আলোর বাজির খেলা চলতে থাকে৷
এদিকে মহাভারতে কথিত আছে পাণ্ডবদের ১২ বছরের অজ্ঞাতবাস শেষ হয়েছিল আশ্বিনের শুল্কা দশমীতে৷ ওইদিন তারা শমীবৃক্ষে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র বের করে আনেন এবং তাঁরা তাদের ছদ্মবেশ ছেড়ে নিজেদের প্রকৃত পরিচয় ঘোষণা করে৷ এটাও বিজয়া দশমী হওয়ার অন্যতম ত্যৎপর্য বলে উল্লেখ করা হয়৷
আধুনিক যুগেও বিজয়া দশমী নিয়ে রয়েছে, শ্রীরামকৃষ্ণের এক ব্যাখ্যা আছে, এই যে বিসর্জন ঘিরে একটি কাহিনি প্রচলিত আছে, রাণী রাসমণির জামাতা মথুরবাবু একবার আবেগের বসে দশমীতে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেবেন না বলে ঠিক করেন৷ তাঁর একটি যুক্তি ছিল- বাড়ির মা দুর্গাকে কী ভাবে জলে ভাসাবেন তখন শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁকে বোঝালেন যে— বিজয়ার অর্থ মা দুর্গা এবং তাঁর সন্তানদের সঙ্গে বিচ্ছেদ নয়৷ শ্রীরামকৃষ্ণ ব্যাখ্যা হল,-এই কয়েকদিন বাড়ির পুজোর দালানে বসে মা পুজো নিয়েছেন, এবার থেকে মা হৃদয় মন্দিরে বসে পুজো নেবেন৷ শাস্ত্রমতে যিনি সাকার তিনিই আবার নিরাকার৷ সাকার রূপে মর্তে পুজো নিয়ে নিরাকার রূপে কৈলাসে গমন করেছেন৷ এর অর্থ সন্তানের সঙ্গে কোনও রকম বিচ্ছেদ নয়৷ এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হলেন মথুরবাবু এবং জেদাজেদি ছেড়ে ভাসানের অনুমতি দিলেন৷
বিজয়ার দিনে সিঁদুর খেলা মেয়েদের একটি বিশেষ অনুষ্ঠান। এই আচারটি আজ দুর্গাপুজোর একটি অঙ্গ হিসেবে পরিচিত।
সনাতন ধর্মের বিবাহ রীতিতে সিঁদুরদান লৌকিক আচার মাত্র হলেও সুপ্রাচীন কাল থেকে বিবাহিত নারীরা স্বামীর মঙ্গলকামনায় সিঁথিতে সিঁদুর পরতেন। দেবী দুর্গাও বিবাহিত নারী হিসেবে সিঁদুর ব্যবহার করেন। দুর্গা পুজোয় যে যে উপচার দেবীকে দান করতে হয়, তার মধ্যে সিঁদুর রয়েছে। ‘‘সর্বলোকের রঞ্জন পরমসৌন্দর্যযুক্ত সিন্দুর তিলক তোমার কপালকে মণ্ডিত করুক’’— এই বলে দেবীর কাছে প্রার্থনা জানানো হয়।
হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী সিঁদুরকে শক্তির প্রতীক মানা হয়। এটা প্রাচীনকাল থেকে বলা হয় যে, লাল রং সৃষ্টির প্রতীক। লাল রং কে প্রকৃতির সৃষ্টিকর্তা শক্তি মানা হয়। তাই ভারতীয় নারীরা একান্ত প্রসাধন হিসেবে সিঁদুরকে প্রাচীনকাল থেকে ধারণ করে আসছেন।
হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়, শরীরের বিভিন্ন স্থানে দেবতা বিরাজমান থাকেন। স্বয়ং ব্রহ্মা কপালে অধিষ্ঠান করেন। ব্রহ্মাকে সম্মান জানাতে ও তুষ্ট রাখতে বিবাহিত মহিলাদের কপালে সিঁদুর পরা শাস্ত্র মতে উচিত।
শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন মঠের পুরোহিত শ্রী অমল মহারাজ বলেন, “মানুষের মনের আসুরিক প্রবৃত্তি যেমন কাম, ক্রোধ, হিংসা, লালসা বিসর্জন দেওয়াই মুলত বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এ প্রবৃত্তিগুলোকে বিসর্জন দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য।"
ভবিষ্য পুরাণে বলা হয়েছে,
সিঁদুর হচ্ছে স্বয়ং ব্রহ্মের প্রতীক। বিবাহিত নারী সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে পরম ব্রহ্মকে আহ্বান করেন।
বলা হয়েছে, ব্রহ্ম সমস্ত দুঃখ-কষ্ট দূর করে সুখ প্রদান করেন। তাই দশমীর দিনে সিঁদুর দান ও সিঁদুর খেলাকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়। স্বামীর মঙ্গল ও দীর্ঘায়ু কামনায়। পরম ব্রহ্ম শুধু স্বামীকে নয়, দম্পতিকেই সুখ উপহার দেন।
কপালে যেহেতু স্বয়ং ব্রহ্মার অধিষ্ঠান, সে কারণে ব্রহ্মাকে তুষ্ট করতেই লাল সিঁদুর পড়ে থাকেন মহিলারা। সাধক পুরুষও কপালে রক্তবর্ন সিঁদুর ধারণ করেন। প্রাচীন শাস্ত্রে বলা হয়েছে, নারীরা হলেন শক্তি। আর সেই শক্তিকে সম্মান প্রদর্শনের জন্যই ব্যবহার হয় সিঁদুরের। তবে সিঁদুর খেলাতে এখন শুধু বিবাহিত মহিলারাই অংশগ্রহণ করেন না, অবিবাহিত মহিলারাও সিঁদুর খেলায় অংশগ্রহণ করে থাকেন।
মহালয়া থেকে শুরু হয়ে যায় উৎসবের পালা, চলে বিসর্জনের দিন পর্যন্ত৷ দশমীর দিন ঘরে ফিরে যায় উমা৷ উমার ঘরে ফেরার বিশাদে বিষন্নতা কাটাতে আনন্দে মেতে ওঠে বাঙালী৷ মাকে বরণ করে সিঁদুর খেলে হাসি মুখে বিদায় জানায় ঘরের মেয়েকে৷ কিন্তু জানেন কি কেন বিদায়ের আগে মায়ের সঙ্গে সিঁদুর খেলা হয়?
পুরাণ মতে, মহালয়া থেকে শুরু দেবীপক্ষ৷ বছরে একবার মাত্র দশ দিনের জন্য মা দুর্গা তার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বাপেরবাড়ি আসে৷ এক বছর পর ঘরে ফিরে আসে উমা৷ মেয়ের ঘরে ফেরার আনন্দে জোরকদমে শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি৷ সেজে ওঠে উমার ঘর৷ মেয়েকে তার পচ্ছন্দের খাবার রেঁধে খাওয়ানো হয়৷
দশমী আসতেই উমাকে তার শ্বশুড়বাড়ি পাঠানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়৷ রীতি নীতি মেনে মেয়েকে শ্বশুড়বাড়ি পাঠানো হয়৷ সিঁদুর খেলা হল অন্যতম রীতি৷ বিদায়ের আগে সিঁদুর খেলা হয় কারণ, মা দুর্গাকে বাঙালীরা বিবাহিতা নারী হিসাবে মনে করে৷ হিন্দু রীতি অনুযায়ী সিঁথির সিঁদুর আসলে বিবাহিতা নারীর চিহ্ন৷ অনেকের বিশ্বাস, যথাযথ রীতি মনে সিঁদুর খেলা হলে অকালে কোন মহিলা বিধবা হবেন না৷
বিজয়া দশমীর দিন আগে মাকে বরণ করা হয়৷ পান পাতা, সন্দেশ ও সিঁদুর দিয়ে উমাকে বরণ করা হয়৷ মুখে পান পাতা ছুঁইয়ে, সন্দেশ খাইয়ে এবং সিঁদুর পড়িয়ে করা হয় বরণ৷ একপরই বিবাহিতা বাঙালী মহিলারা মেতে ওঠে সিঁদুর খেলায়৷ আগে শুধু বিবাহিতা মহিলাদেরই সিঁদুর খেলতে দেখা যেত৷ এখন অবশ্য অবিবাহিতারাও মেতে ওঠে সিঁদুর খেলায়৷
দেবীদুর্গাসহ যেকোনো প্রতিমাকে বিসর্জন অর্থাৎ জলে ডুবিয়ে দেওয়ার সময় সেই প্রতিমাকে সাত পাক ঘোরানো হয়; এছাড়াও হিন্দুদের বিয়ের সময়ও বরের চারপাশে কনেকে সাত পাক ঘোরানো হয়। এর কারণ ম্যাক্সিমাম হিন্দুই জানে না বা বলা যায় ৯৯% হিন্দুই জানে না; কিন্তু এর পেছনে রয়েছে গণিতের এক অসাধারণ তত্ত্ব, তত্ত্বটি জানলে আপনি যে অবাক হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; সেই সাথে আরও অবাক হবেন, এই তত্ত্বের আবিষ্কারক ও প্রচলক আমাদের মুনি ঋষিদের জ্ঞানের পরিধি ও এ সম্পর্কে তাদের দূরদর্শিতাকে উপলব্ধি করলে।
যায় হোক, এইবার রহস্য না বাড়িয়ে ভেঙ্গেই দিই তত্ত্বটি আমরা কোনো বিন্দুকে কেন্দ্র করে যখন তার চারপাশে একবার বা একপাক ঘোরা হয়, তখন ৩৬০ ডিগ্রী অতিক্রম করা হয়। এই ৩৬০ কে ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ এবং ৯ দ্বারা নিঃশেষে ভাগ করা যায়, অর্থাৎ ৩৬০ কে ৭ ছাড়া ১ থেকে ৯ এর মধ্যে যেকোনো সংখ্যা দ্বারা ভাগ করলে কোনো অবশিষ্ট থাকে না; কিন্তু ৭ দ্বারা ভাগ করলে ভাগফল ৫১ এর পরে ৩ অবশিষ্ট থাকে এবং ৫১ এর পর দশমিক নিলেও এই ভাগ অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে অর্থাৎ ৭ দ্বারা ৩৬০কে ভাগ করলে ভাগফল কখনোই শেষ হয় না, এককথায় ৭ দ্বারা ৩৬০কে ভাগ করা যায় না অর্থাৎ ৭ দ্বারা ৩৬০ অবিভাজ্য।
প্রতিমাকে বিসর্জনের সময় ৭ পাক ঘোরানো হয়, মানে সেই প্রতিমা এবং তার ভক্তদের মাঝে একটি অবিভাজ্য সম্পর্ক তৈরি করা হয়, যে সম্পর্ক কখনো ভাগ বা বিভক্ত হয় না বা হবে না; এভাবে দেব-দেবীদের সাথে হিন্দুদের একটি চিরকালীন সম্পর্কের কল্পনা করা হয়েছে। এই একই ভাবনা বা থিম কাজ করে হিন্দুদের বিয়ের সময়, যাতে বরের চারপাশে কনেকে সাত পাক ঘুরিয়ে, বরের সাথে কনের অর্থাৎ স্বামীর সাথে স্ত্রীর একটি অবিভাজ্য সম্পর্কের বন্ধন তৈরি করা হয়, যে সম্পর্ক কখনো বিভাজ্য বা ভাগ হয় না অর্থাৎ শেষ হয় না। এই কারণেই হিন্দু বিবাহে কোনো তালাক বা ডিভোর্স নেই এবং একারণেই হিন্দু মেয়েদের সাংসারিক জীবন নিশ্চিন্ত, তার নেই তালাক বা স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে বাপের বাড়ি বা রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ানোর ভয় নেই, আর এখানেই হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব। আশা করছি আমার পাঠক বন্ধুদেরকে সাত পাকের রহস্য বোঝাতে পেরেছি।
জয় শ্রীকৃষ্ণ, জয় শ্রীরাম,
হর হর মহাদেব 🙏
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন ধর্মের প্রচারক, বাংলাদেশ)।
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার