বেদে এতে আছে দেবস্তুতি, প্রার্থনা মন্ত্র ইত্যাদি। ঋক্ মন্ত্রের দ্বারা যজ্ঞে দেবতাদের আহ্বান করা হয়, যজুর্মন্ত্রের দ্বারা তাঁদের উদ্দেশে আহুতি প্রদান করা হয় এবং সামমন্ত্রের দ্বারা তাঁদের স্তুতি করা হয়। ব্রাহ্মণ মূলত বেদমন্ত্রের ব্যাখ্যা। এটি গদ্যে রচিত এবং প্রধানত কর্মাশ্রয়ী। আরণ্যক কর্ম-জ্ঞান উভয়াশ্রয়ী এবং উপনিষদ্ বা বেদান্ত সম্পূর্ণরূপে জ্ঞানাশ্রয়ী।বেদের বিষয়বস্তু সাধারণভাবে দুই ভাগে বিভক্ত কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড। কর্মকাণ্ডে আছে বিভিন্ন দেবদেবী ও যাগযজ্ঞের বর্ণনা এবং জ্ঞানকাণ্ডে আছে ব্রহ্মের কথা। কোন দেবতার যজ্ঞ কখন কিভাবে করণীয়, কোন দেবতার কাছে কি কাম্য, কোন যজ্ঞের কি ফল ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের আলোচ্য বিষয়। আর ব্রহ্মের স্বরূপ কি, জগতের সৃষ্টি কিভাবে, ব্রহ্মের সঙ্গে জীবের সম্পর্ক কি এসব আলোচিত হয়েছে জ্ঞানকাণ্ডে। জ্ঞানকাণ্ডই বেদের সারাংশ। এখানে বলা হয়েছে যে, ব্রহ্ম বা ঈশ্বর এক, তিনি সর্বত্র বিরাজমান, তাঁরই বিভিন্ন শক্তির প্রকাশ বিভিন্ন দেবতা। জ্ঞানকাণ্ডের এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে ভারতীয় দর্শনচিন্তার চরম রূপ উপনিষদের বিকাশ ঘটেছে।
এসব ছাড়া বেদে অনেক সামাজিক বিধিবিধান, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প, কৃষি, চিকিৎসা ইত্যাদির কথাও আছে। এমনকি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কথাও আছে। বেদের এই সামাজিক বিধান অনুযায়ী সনাতন হিন্দু সমাজ ও হিন্দুধর্ম রূপ লাভ করেছে। হিন্দুদের বিবাহ, অন্তেষ্টিক্রিয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে এখনও বৈদিক রীতিনীতি যথাসম্ভব অনুসরণ করা হয়।ঋগ্বেদ থেকে তৎকালীন নারীশিক্ষা তথা সমাজের একটি পরিপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। অথর্ববেদ থেকে পাওয়া যায় তৎকালীন চিকিৎসাবিদ্যার একটি বিস্তারিত বিবরণ। এসব কারণে বেদকে শুধু ধর্মগ্রন্থ হিসেবেই নয়, প্রাচীন ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সাহিত্য ও ইতিহাসের একটি দলিল হিসেবেও গণ্য করা হয়।
বেদ – ধর্মজ্ঞান সাধন ।
বেদ = ( √বিদ + অ ) বা (√বেদী + অ )। অথর্ব্ব ।
পবিত্র বেদ চার প্রকার
ঋক্, যজু, সাম, ভগবান কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদকে চার ভাগে বিভক্ত করিয়া ছিলেন বলিয়া তাহাকে বেদব্যাস বলা হয় ।
১) ঋক্ = Vঋ – স্বর্গ।
ঋক্ = √ঋ – গতি।
ঋক্ = [ Vঋচ্ + ক্বিপ ]
– প্ৰশংসা, স্তুতি,স্তব।
২) যজু = যজুঃ [ √যজ্ + উস ]
– দেবগণের পূজা সাধন।
৩) সাম = সাময়তি, সান্ত্বন
সাম = √সো + মন- পাপনাশক।
গীত ঋকের নাম সাম, ব্রহ্মা সূৰ্য্য হইতে এই বেদ চয়ন করেন।
8) অথর্ব্ব = [ অথ + √ঋ গতি + অন্ ]
শকন্ধাদি, ঐহিক মঙ্গলকর মন্ত্র সমূহ স্থূল ও সূক্ষভেদে বেদ দুই প্রকার। ইহা মন, প্রাণ এবং ইন্দ্রিয়ময়, পরা পয্যন্তী মধ্যমা এই তিন বাণী সূক্ষদর্শী মনীষিগণই কেবল লক্ষ্য করিতে পারেন।
শ্লোক উদ্ভবগীতা,
“বেদা ব্রহ্মাত্ম বিষয়াস্ত্রিকান্ড বিষয়া ইমে।
পরোক্ষবাদা ঋষয়ঃ পরোক্ষং মম চ প্রিয়ম ॥ ”
ব্যাখ্যাঃ— কর্মকান্ড, দেবতাকান্ড ও ব্রহ্মকান্ড এই কান্ডত্রয় যুক্ত বেদ সকলে নানা জ্ঞানের কথা বলা থাকিলেও ব্রহ্মাত্মবিদ্যাই মূলত পরোক্ষে বর্ণিত। ঋষিগণ পরোক্ষনীতি দ্বারা বর্ণনা করিয়াছেন, এই প্রকার পরোক্ষভাবে বর্ণনা আমার প্রিয়।
‘শব্দ ব্রহ্মা সুদুর্বোধং প্রাণেন্দ্রিয়মনোময়ম্ ।
অনন্তপারং গম্ভীরং দুর্বিগাহ্যং সমুদ্রবৎ ।।”
ব্যাখ্যাঃ— শব্দ ব্রহ্ম বা বেদ দুর্বিজ্ঞেয়, ইহা প্রাণ ইন্দ্রিয় ও মনোময়, অপার গম্ভীর সমুদ্রবৎ ও কষ্টে অর্থবোধ হয়
“ ময়োপবৃংহিতং ভুম্না ব্রহ্মণাননন্ত শক্তিনা ।
ভূতেষু ঘোষ রূপেণ বিসেষুবিলক্ষ্যতে ।। ”
ব্যাখ্যাঃ— অপরিছিন্ন, অনন্ত শক্তিসম্পন্ন সেই সূক্ষ বেদতত্ত্ব সর্বব্যাপী সর্ববার্ন্তযামী পরব্রহ্ম আমাতে বিদ্যমান। পদ্মের ডাঁটার সূক্ষ সূতার ন্যায় এই তত্ত্বকে মনীষি ব্যক্তিগণ সকল প্রাণীর অন্তরে স্থিত এই বেদতত্ত্বকে অনুভব করেন।
স্থূল ও সূক্ষভেদে বেদ দুই প্রকার, ইহা প্রাণ, মন এবং ইন্দ্রিয়ময়। পরা, পৰ্য্যন্তী, মধ্যমা এই তিন বাণী এই তিন বাণীকে সূক্ষদর্শী মণিষীগণই কেবল লক্ষ্য করিতে পারেন।
‘চত্বারি বাক্ পরিমিতানি পদানি, তানি বিদুর্ব্রাহ্মণা মে মনীষিণঃ ।
গুহাত্রীনি নিহিতানি লেঙ্গুয়তিও তুরীয়ং বাচো মনুষ্যা বদন্তি।।”
বেদ বা শব্দব্রহ্মের চারটি পরিমিত রূপ–
১) পরা, ২) পশ্যন্তি, ৩) মধ্যমা, ৪) বৈখারী, আত্মজ্ঞানী ব্যক্তিই বেদের এই রূপ অবগত হন। ইহাদের মধ্যে প্রথম তিনটি দেহরূপ গুহাতে অবস্থিত, সাধারণ মানুষের অগম্য। মানুষ বৈখারী ভাগ মাত্র উচ্চারণ করে, কিন্তু অর্থ অনুভব করতে পারে না।
প্রাণরূপী ব্রহ্মাই হিরণ্যগর্ভে, ইনিই বেদ ও অমৃতস্বরূপ। তিনি নাদরূপে সর্বব বর্ণসমূহের রূপ প্রদানকারী তিনিই হৃদয়স্থিত প্রণব ধ্বনি। তিনিই ক হইতে ম পর্যন্ত্য পঁচিশ স্পর্শ বর্ণ অ হইতে ঔ পর্যন্ত স্বরবর্ণ, আবার ব্যঞ্জন ও স্বরবর্ণের মধ্যবর্তী য র ল ব এই মধ্যবর্তী বর্ণ মন কে লইয়া নানা বর্ণের বর্ণমালা ও গায়ত্রী আদি নানা ছন্দে বৈখারী বাণী প্রকাশ করিয়া আবার উহা নিজেই নিজেতে লয় করেন। এই বেদাত্মক বাণী, গায়ত্রী, উষ্ণিক অনুষ্টুপ, বৃহতী পঙক্তি ত্রিষ্টুপ, জগতী, অতিছন্দ, অত্যষ্টি, অতিজগতী, অতিবিরাট ইত্যাদির সহিত যুক্ত হইয়া আত্মপ্রকাশ করে। তাই বৈখারী রূপা বাণীর স্বরূপ ও।বোধগম্য হওয়া দূরহ। বেদরূপা বাণী কি বিধান দেন, কি প্রকাশিত করেন, কোন মত প্রকাশ করেন এই প্রকার যথার্থ তাৎপর্য সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা দুঃসাধ্য।
“কিং বিধত্তে কিমাচষ্টে কিমনূদ্য বিকল্পায়ৎ ।
ইত্যাসা হৃদয়ং লোকে নান্যো মদ্বেদ কশ্চন ॥”
বেদ আমাকেই যজ্ঞরূপের অনুষ্ঠানের বিধান দেয়, আমাকেই নানা দেবতারূপে প্রকাশ করে, বিশ্বের পৃথক ভাব নিরাকরণ করে, নানারূপী আমাকে দর্শন করিয়া নানাত্ব অস্বীকার করিয়া পরম রসে রসময় করে। বিষয়াসক্ত, হীনবুদ্ধি, লোভী, স্বর্গ প্রাপ্তিই মোক্ষরূপ বলিয়া ধারণাকারী ব্যক্তিরা এবং অগ্নিসাধ্য যজ্ঞাদি কর্মে মুগ্ধ ব্যক্তিরা মৃত্যুর পর ধুমমার্গ অবলম্বনে পিতৃলোকে গতি হয়, আত্মস্বরূপ উপলব্ধ করিতে পারে না।
শ্রী বাবলু মালাকার
সনাতন ধর্মের প্রচারক, বাংলাদেশ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ,
হর হর মহাদেব।
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার