ঈশ্বর কে?
ঈশ্বর সত্য, সুন্দর, চিরন্তন ঈশ্বর শব্দের মূল "ঈশ্" এর আভিধানিক অর্থ হল "সেরা, চমৎকার, সুন্দর বা শাসক"। অতএব, যুগপৎভাবে ঈশ্বর শব্দের অর্থ হল; সেরা বা সুন্দরের স্রষ্টা।
প্রথমত, পবিত্র বেদ হচ্ছে জীবনাচারণের গ্রন্থ
জীবনাচারণের গ্রন্থ মানেই দর্শনশাস্ত্র। সেক্ষেত্রে অলৌকিকত্ব প্রকাশ করা বেদের কাজ নয়। দ্বিতীয়ত পবিত্র বেদে দেবী-দেবীর মাহাত্ম্য নির্ভর নয়। তাই পৌরাণিক মতও পবিত্র বেদ এর মাধ্যমে প্রচার হওয়ার নয়। আমরা জানি, নশ্বর বলতে যার ক্ষয় আছে তাই বোঝায়। আর ঈশ্বর কিংবা অবিনশ্বর বলতে তার বিপরীত বোঝায়। মানে যার ক্ষয় নেই, ধ্বংস নেই।
তার মানে কি ঈশ্বর বলতে ইয়া বড় কিছু?
সর্বশক্তিমান?
অবিশ্বাস্য বা বিদঘুটে কিছু?
ব্যাখ্যা অনুসারে সেই ধরণের তো উত্তর আসছে না?
পৃথিবীতে তিনটি জিনিস অক্ষয়ঃ—
সত্য, সুন্দর, চিরন্তন
সত্য
প্রমাণিত সত্যের দ্বিতীয় কোনো ব্যাখ্যা থাকতে পারে না। সত্য তা যেকোনো পরিস্থিতিতে সত্যই পরিস্থিতি বিচারে তার ক্ষয় বা রূপ পরিবর্তন হতে পারে না। তার মানে সত্য এক ও অদ্বিতীয়। এর কোনো আকার নেই, এর অন্য কোনো শরীকও নেই।
সুন্দর
এইবার সুন্দর কি কথাটা বলা যাক, সুন্দর মাত্রই সকলের ক্ষেত্রে সুন্দর। আপনার কাছে পাহাড়, নদী, সাগর, বৃক্ষরাজি ইত্যাদি কিংবা কোনো মহৎ বা সৃষ্টিশীল কর্ম কুৎসিত মনে হয় তা আপনার বিকৃতরুচির পরিচায়ক। সুন্দর সকল ক্ষেত্রেই সুন্দর। সুন্দরের দর্শনে আপনার বিরক্তি আসবে না। আপনার হৃদয়তৃপ্তি ঘটবে। সুন্দর এর দর্শনে কারণে সুন্দর অনুভূতিই প্রকাশ পায়। তাই সুন্দর এক ও অদ্বিতীয়। এর কোনো আকার নেই। এর অন্য কোনো শরীকও নেই।
চিরন্তন
এরপর 'চিরন্তন' কথাটিতে আসা যাক, চিরন্তন ক্ষণস্থায়ী নয় বা ক্ষয়শীলও নয়, সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে তা চিরন্তন কর্ম। চাইলেই কি আমরা সূর্যকে পশ্চিমে তুলতে পারবো?
সৃষ্টির আদিতে যেমন পূর্ব দিকে উঠেছে, অন্ততঃ একই কর্ম করবে তাই চিরন্তন এক ও অদ্বিতীয়। এর কোনো আকার নেই, অন্য কোনো শরীক ও নেই।
সকল কাজেই ঈশ্বর বলতে ইয়া বড় মাপের সর্বশক্তিমান কিছুর কল্পনাশ্রীত হওয়া আপনার ব্যাপার কিন্তু আমার কাছে উপরের তিনটি শব্দের সমন্বয় হলো ঈশ্বর।
পূর্ণরূপ চিত্র
ওঁ উচ্চারণ করতে গেলে আমরা তিনটি শব্দ পাই অ + উ + ম এই শব্দে পাওয়া তিনটিই মহাশক্তি— ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর।
ওঁ
ব্রহ্ম শক্তি অভেদ এককে মানলে, আর একটিকেও মানতে হয়। যেমন অগ্নি আর তার দাহিকা শক্তি অগ্নি মানলেই দাহিকা শক্তি মানতে হয়, দাহিকা শক্তি ছাড়া অগ্নি ভাবা যায় না। সূর্যেকে বাদ দিয়ে সূর্যের রশ্মি ভাবা যায় না।
ওঁ শব্দটি সংস্কৃত 'অব' ধাতু থেকে উৎপন্ন হয়েছে, ওঁ প্রণব বা ত্র্যক্ষর (ওঁ-প্রণব (ব্রহ্ম) ব্রহ্মের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ বেদ।
ওঁ উচ্চারণ করতে গেলে আমরা তিনটি শব্দ পাই তা হলঃ— অ + উ + ম এই শব্দে পাওয়া যায় তিনটি মহাশক্তিই হলো ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর এই ত্রিমূর্তির হলো পমর শক্তি পরমাত্মা।
পরমাত্মা
ব্রহ্ম + শক্তি চন্দ্র ও চন্দ্রের কিরণ দুধ ও দুধের ধবলতার ন্যায় এক ও অভেদ।
ঈশ্বর
➢ ঈশ্বর হলেন তিনি যিনি বিশ্বজগতের স্রষ্টা।
(ঋগ্বেদ ৩/৬৩/১০)
➢ ঈশ্বর হলেন তিনি যাহাতে সর্ব জগত আশ্রয় করে আছে।
(ঋগ্বেদ ৩২/৮)
➢ ঈশ্বর হলেন তিনি যিনি সকলের মোক্ষ দাতা।
(ঋগ্বেদ ১/৭২/১)
➢ ঈশ্বর হলেন তিনি যিনি এক এবং অদ্বিতীয়।
(অথর্ব ১৩/৪/২)
➢ ঈশ্বর হলেন তিনিই যাহার নিয়মে বিশ্বসংসার চলে।
(ঋগ্বেদ ১/২২/১৯)
➢ ঈশ্বর তিনিই যিনি পবিত্র বেদের উৎপাদক।
(যজু ৩৩/৩১)
➢ ইন্দ্রং মিত্রং বরুণ মগ্নি মাহু, রথো দিব্যঃ স সুপর্ণো গরুত্মান। একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্ত্যগ্নিং যমং মাতরিশ্বানমাহুঃ।।
(ঋগ্বেদ ১/১৬৪/৪৬)
❏ অনুবাদঃ- এক সত্তা পরব্রহ্মকে জ্ঞানীরা ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, অগ্নি, দিব্য, সুপর্ণ, গরুৎমান, যম, মাতরিশ্বা আদি বহু নামে অভিহিত করেন।
➢ ''ন দ্বিতীয়া ন তৃতীয় শ্চতুর্থ না পু্চ্যতে। ন পঞ্চমো ন ষষ্ঠ ন সপ্তমো না পুচ্যতে। নাষ্টমো ন নবমো দশমো না পুচ্যতে। য এতং দেবমেক বৃতং দেব।
(অর্থববেদ ১৩/৪/২)
❏ অনুবাদঃ- পরমাত্মা এক, তিনি ছাড়া কেহই দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ পঞ্চম ষষ্ট সপ্তম অষ্টম নবম বা দশম ঈশ্বর বলিয়া অবিহিত নহে।
➢ "য এক তমু ষ্টুহি কৃষ্ঠীনাং বিচর্যণি। পতি যজ্ঞে বিষক্রতু।
(ঋগবেদ ৬/৪৫/১৬)
❏ অনুবাদঃ- যিনি এক অদ্বিতীয়া, যিনি মনুষ্যদের সর্ব্বদ্রষ্টা, যিনি সর্বশক্তিমান ও পালক একমাত্র তাহার উপাসনা কর।
➢ ওঁ খং ব্রহ্ম (যজুর্বেদ ৪০/১৭)
ওঁ এই একমাত্র ঈশ্বর ওঙ্কার সাধনা শ্রেষ্ঠ সাধনা
সকল বেদ যে পরম পদের বার বার প্রতিপাদন করেছেন এবং সকল তপস্যা যে পদের কথা বলে অর্থ্যাৎ যাঁকে পাবার সাধনার কথা বলে যাঁকে পাবার জন্য সাধকগণ ব্রহ্মচর্যের পালন করেন সেই পদ তোমাকে (আমি) সংক্ষেপে বলছি (সে হচ্ছে এই ওঁ)।
(কঠোপনিষদ, ১/২/১৫)
বেদসমূহ একবাক্যে যে ঈপ্সিত বস্তুর প্রতিপাদন করেন, অখিল তপস্যাদি কর্মরাশি যাঁহার প্রাপ্তির সহায় এবং যাঁহার কামনায় লোকে ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে,আমি তোমায় সেই প্রাপ্যবস্তুর সম্বন্ধেই উপদেশ করিতেছি - ইঁহা ওম্ এবং ওঙ্কার ইঁহার প্রতিক। অতএব এই ওঙ্কার অপরব্রহ্ম এবং পরব্রহ্ম উভয়াত্মক। এই ওঙ্কারকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করিয়া যিনি যাহা ইচ্ছা করেন তাঁহার তাঁহাই (অর্থ্যাৎ অপরব্রহ্ম-প্রাপ্তি বা পরব্রহ্ম-জ্ঞান হইয়া থাকে) ইহাই শ্রেষ্ঠ অবলম্বন, ইহাই পরব্রহ্ম ও অপরব্রহ্ম এই উভয়-বিষয়ক। এই অবলম্বন কে জানিয়া সাধক ব্রহ্মলোকে মহীয়ান হন।
ওঁ উচ্চারণ অত্যন্ত পবিত্র, ঈশ্বরের তিনটিই কর্ম— সত্য, সুন্দর, চিরন্তন পৃথিবীতে এই তিনটি জিনিস অক্ষয় রয়েছে।
ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি!
জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব
(শ্রী বাবলু মালাকার)
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার