ওঁ শব্দটি সংস্কৃত 'অব' ধাতু থেকে উৎপন্ন হয়েছে, ওঁ প্রণব বা ত্র্যক্ষর (ওঁ-প্রণব (ব্রহ্ম) ব্রহ্মের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ বেদ।
ওঁ উচ্চারণ করতে গেলে আমরা তিনটি শব্দ পাই তা হলঃ— অ + উ + ম এই শব্দে পাওয়া যায় তিনটি মহাশক্তিই হলো ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর এই ত্রিমূর্তির হলো পমর শক্তি পরমাত্মা।
সনাতন ধর্মে দু’রকমের প্রতীক আছে,
শব্দ প্রতীক ও সাকার প্রতীক। শব্দের মধ্য দিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করা হয়। মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক উন্নতি হয়।
এখন দেখে নেওয়া যাক শব্দ প্রতীক কী?
ওঁ উচ্চারণ অত্যন্ত পবিত্র ঈশ্বরের তিনটি কর্ম— সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশ। এই তিন কার্য সম্পন্ন করার জন্য তিন দেবতার সৃষ্টি করেছেন। এঁরা হলেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব। অন্যান্য সকল দেবদেবী এঁদের অধীন। তাই ওঁ- অ উ ম, এই তিন অক্ষর তিন দেবতার শক্তির পরিচয়।
ওঁ
অ— সৃষ্টির সূচক, (ব্রহ্মা) সৃষ্টি করেন।
উ— স্থিতির সূচক (বিষ্ণু) সৃষ্টি পালন করেন।
ম- বিনাশের সূচক (শিব) সৃষ্টি বিনাশ করেন।
ইংরেজিতে GOD শব্দের অর্থও হচ্ছে তাই
G- Generator (সৃষ্টি করা)
O- Operator (স্থিতি বা পালন করা)
D- Destructor (লয় বা বিনাশ করা)।
ওঁ উচ্চারণ করলে শারীরিক ও মানসিক শক্তির সৃষ্টি হয়। মনে একাগ্রতা আসে।
(ওঁ)
ওঙ্কার সাধনা শ্রেষ্ঠ সাধনা
সকল বেদ যে পরম পদের বার বার প্রতিপাদন করেছেন এবং সকল তপস্যা যে পদের কথা বলে অর্থ্যাৎ যাঁকে পাবার সাধনার কথা বলে যাঁকে পাবার জন্য সাধকগণ ব্রহ্মচর্যের পালন করেন সেই পদ তোমাকে (আমি) সংক্ষেপে বলছি (সে হচ্ছে এই ওঁ)।
(কঠোপনিষদ, ১/২/১৫)
বেদসমূহ একবাক্যে যে ঈপ্সিত বস্তুর প্রতিপাদন করেন, অখিল তপস্যাদি কর্মরাশি যাঁহার প্রাপ্তির সহায় এবং যাঁহার কামনায় লোকে ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে,আমি তোমায় সেই প্রাপ্যবস্তুর সম্বন্ধেই উপদেশ করিতেছি - ইঁহা ওম্ এবং ওঙ্কার ইঁহার প্রতিক। অতএব এই ওঙ্কার অপরব্রহ্ম এবং পরব্রহ্ম উভয়াত্মক। এই ওঙ্কারকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করিয়া যিনি যাহা ইচ্ছা করেন তাঁহার তাঁহাই (অর্থ্যাৎ অপরব্রহ্ম-প্রাপ্তি বা পরব্রহ্ম-জ্ঞান হইয়া থাকে) ইহাই শ্রেষ্ঠ অবলম্বন, ইহাই পরব্রহ্ম ও অপরব্রহ্ম এই উভয়-বিষয়ক। এই অবলম্বন কে জানিয়া সাধক ব্রহ্মলোকে মহীয়ান হন।
"ওঙ্কাররূপ এই অক্ষরই প্রসিদ্ধ অপরব্রহ্ম, এই অক্ষরই সুনিশ্চিত পরমব্রহ্ম। "(কঠোপনিষদ, ১/২/১৫, ১/২/১৬, ১/২/১৭) বাণীর মধ্যে আমিই একাক্ষর ওঁ ওঙ্কার।
মহর্ষিগণের মধ্যে আমি ভৃগু, শব্দসকলের মধ্যে আমি একাক্ষর ওঁকার, যজ্ঞসকলের মধ্যে আমি জপযজ্ঞ এবং স্থাবর পদার্থের মধ্যে আমি হিমালয়।
(শ্রীমদ্ভগবদগীতা, ১০/২৫)
আমি এই জগতের পিতা, মাতা, বিধাতা, পিতামহ; যাহা কিছু জ্ঞেয় এবং পবিত্র বস্তু তাহা আমিই। আমি ব্রহ্মবাচক ওঙ্কার, আমি ঋক্, সাম ও যজুর্বেদ স্বরূপ।
(শ্রীমদ্ভগবদগীতা, ৯/১৭)
উপনিষদ আমাদের শিক্ষাদেয়
ব্রহ্মের সব থেকে নিকটতম প্রতিশব্দ হল ওঁ তাই কেউ যখন ওম্ উচ্চারণ করেন, তখন তিনি ব্রহ্মেরই উপাসনা করছেন বুঝতে হবে। অর্থাৎ ব্রহ্মের প্রতীক হল এই ওঁ এবং এই ওম্ কে ব্রহ্মের সঙ্গে অভেদ জেনেই আরাধনা করতে হবে। ওঙ্কার (ওঁ) ব্রহ্ম এক ও অভিন্ন। ওঁ কেবল ব্রহ্মের প্রতীক নয়, অউমই ব্রহ্ম। উপনিষদ আমাদের এই শিক্ষা দেয়, যখন সাধক অউম শব্দটি আবৃত্তি করেন তখন তিনি আসলে ব্রহ্মেরই উপাসনা করছেন।
ওঁ খং ব্রহ্ম
(যজুর্বেদ, ৪০/১৭)
যেমন অউম খম্ অবতীত্যোম, আকাশ মিব ব্যাপকত্বাৎ খম্, সর্বেবভ্যো বৃহত্বাদ্ ব্রহ্মা।
ওঁ রক্ষা করেন বলে "অউম" আকাশের ন্যায় ব্যাপক বলে "খম" এবং সবথেকে বড় বলে "ব্রহ্ম" ঈশ্বরের নাম। অর্থাৎ ওঁ এই সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম।
"ওঁ" ঈশ্বরের সর্বোত্তম নাম ওঙ্কারপূর্বক এই নামে ঈশ্বরকে ডাকতে ভুলবেন না। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, "ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ নাম ও সুতরাং ঐ ওঙ্কার জপ কর, তার ধ্যান কর, তার ভিতর যে ঈশ্বরের শক্তি অপূর্ব অর্থসমূহ নিহিত রয়েছে, তা ভাবনা কর। সর্বদা ওঙ্কার জপ-ই হল যথার্থ উপাসনা। ওঙ্কার সাধারন শব্দমাত্র নয়, স্বয়ং ঈশ্বরস্বরূপ!"
এই হেতু ব্রহ্মবাদিগণের যজ্ঞ, দান ও তপস্যাদি শাস্ত্রোক্ত কর্ম সর্বদা 'ওঁ" উচ্চারণ করিয়া অনুষ্ঠিত হয়।
(শ্রীমদ্ভগবদগীতা, ১৭/২৪)
ওঁ (ওঙ্কার) ঈশ্বর শক্তির প্রকাশ। ঈশ্বর তাঁর সৃষ্টি সকল জীবের জন্য কর্ম অনুযায়ী যথাযথ ফলের বিধান করেন তাই তাঁর সকল সৃষ্টিকে আলাদা আলাদা তিনটি গুণকর্মে আবদ্ধ করে দিয়েছেন। শ্রীমদ্ভগবদ গীতা অনুসারে ভগবান ভক্তকে ৩টি গুণগত শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন।
১) সাত্ত্বিক,
২) রাজসিক,
৩) তামসিক।
ওঁ দ্বা সুপর্ণা সযুজা সখায় সমানং বৃক্ষং পরিষস্বজাতে।
তয়োরন্যঃ পিপ্পলং স্বাদ্বত্তি-অনশ্নন্নন্যো অভি চাকশীতি।।
(ঋগ্বেদ ১/১৬৪/২০)
অনুবাদঃ— সুন্দর পক্ষবিশিষ্ট সম সম্বন্ধযুক্ত দুইটি পক্ষী মিত্র রূপে একই বৃক্ষ আশ্রয় করিয়া আছে। তাহাদের মধ্যে একটি বৃক্ষের ফলকে স্বাদের জন্য ভক্ষণ করে এবং অন্যঢী ফলকে ভক্ষণ না করিয়া সব দিক দেখিতে থাকে।
ভাবার্থঃ— বৃক্ষটি শরীর এবং দুইটি পক্ষীর একটি জীব, অন্যটি ব্রহ্ম বা পরমাত্মা। জীব ও ব্রহ্ম উভয়ই অনাদি। উভয়ই সখা স্বরূপ। জীব সংসারে পাপ পুণ্যের ফলভোগ করে এবং ব্রহ্ম ফল ভোগ না করিয়া সাক্ষী রূপে বর্ত্তমান।
তয়োরন্যঃ পিপ্পলং স্বাদ্বত্তি-অনশ্নন্নন্যো অভি চাকশীতি।।
(ঋগ্বেদ ১/১৬৪/২০)
অনুবাদঃ— সুন্দর পক্ষবিশিষ্ট সম সম্বন্ধযুক্ত দুইটি পক্ষী মিত্র রূপে একই বৃক্ষ আশ্রয় করিয়া আছে। তাহাদের মধ্যে একটি বৃক্ষের ফলকে স্বাদের জন্য ভক্ষণ করে এবং অন্যঢী ফলকে ভক্ষণ না করিয়া সব দিক দেখিতে থাকে।
ভাবার্থঃ— বৃক্ষটি শরীর এবং দুইটি পক্ষীর একটি জীব, অন্যটি ব্রহ্ম বা পরমাত্মা। জীব ও ব্রহ্ম উভয়ই অনাদি। উভয়ই সখা স্বরূপ। জীব সংসারে পাপ পুণ্যের ফলভোগ করে এবং ব্রহ্ম ফল ভোগ না করিয়া সাক্ষী রূপে বর্ত্তমান।
ঈশ্বর ও ব্রহ্মঃ
ধর্মদর্শন ও সাধনাঃ
"ওম্।। ন ত্বাবাং অন্যো দিব্যো ন পার্থিবো ন জাতো ন জনিষ্যতে অশ্বায়ন্তো মঘবন্নিন্দ্র বাজিনো গব্যন্তস্তা হবামহে।।" (সাম উত্তরাঃ ৬৮১)
অর্থ অনুবাদঃ— হে পরমেশ্বর! (ত্বাবান) আপনার সমক্ষ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে (অন্যঃ) আর অন্য কেহই (দিব্যঃ ন) দিব্য গুন কর্ম স্বভাব যুক্ত নেই (ন পার্থিবঃ) এবং অন্য কোন পার্থিব শক্তি, (নুজাতঃ) না তো হয়েছে, (ন জনিষ্যতে) আর না তো ভবিষ্যতে হবে। হে (মঘবন) ঐশ্বর্যশালী পরমেশ্বর! (বাজিনঃ) আপনার বল শক্তি পরাক্রম দ্বারা (অশ্বায়ন্তঃ) মনোবলকে তীব্র শক্তিশালী করবার জন্য (গব্যন্তঃ) অভ্যান্তরীন বল বীর্য পরাক্রমকে আত্মা জ্ঞানের সঙ্গে (ত্বা) কেবল মাত্র আপনাকেই (হবামহে) প্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা উপসনাদি করিতেছি।
ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি!
জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব
(শ্রী বাবলু মালাকার)
সনাতন ধর্মের প্রচারক
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার