Bablu Malakar

पवित्र वेद धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते

অক্ষয় তৃতীয়ার বিষয়টির সম্পূর্ণ তত্ত্ব বিশ্লেষণ

শুধু হিন্দুদের কাছে নয়, অক্ষয় তৃতীয়ার বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে কি অন্য ধর্মে?

হিন্দু ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ তিথি। অক্ষয় তৃতীয়াকে মূলত হিন্দু বা সনাতন ধর্মে বিশ্বাসীদের কাছে পালনীয় এক পবিত্র দিন হিসেবে দেখা হলেও অন্য এক ধর্মে এই দিনটির বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। সেটি জৈন ধর্ম। জৈন বিশ্বাস অনুসারে বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথির গুরুত্ব অপরিসীম। হিন্দু সম্প্রদায় ছাড়া জৈনরাও এই দিনটি পালন করেন।

জৈন মতে, ২৪ জন তীর্থঙ্কর মানুষকে সত্যের পথ দেখিয়েছেন। তাঁদের দেখানো পথেই মানুষ জন্ম ও মৃত্যুর অতীত ‘তীর্থে’ পৌঁছতে সক্ষম। এই ২৪ তীর্থঙ্করের প্রথম হলেন ঋষভদেব এবং শেষ ব্যক্তি মহাবীর। জৈন শাস্ত্র থেকে জানা যায়, ঋষভদেব ছিলেন ইক্ষ্বাকু বংশের প্রতিষ্ঠাতা নৃপতি। তাঁর রাজত্বে কোনও দুঃখ ছিল না। পৃথিবী সেই সময়ে ছিল অগণিত কল্পবৃক্ষে পূর্ণ। এই বৃক্ষের কাছে যা চাওয়া যায়, তা-ই লাভ করা যায়। কিন্তু কালের সঙ্গে সঙ্গে ওই সব কল্পতরুর গুণাবলি হ্রাস পেতে থাকে। মানুষও শারীরিক এবং আধ্যাত্মিক সঙ্কটে পড়তে শুরু করে। সেই অবস্থায় তাঁর প্রজাদের ক্লেশ নিবারণের জন্য ঋষভদেব ছ’টি বৃত্তি অবলম্বনের নির্দেশ দেন। এগুলি অবলম্বন করলে মানুষ জাগতিক ক্লেশ থেকে দূরে থাকবে বলে তিনি বর্ণনা করেন। এগুলি হল— অসি (রণজীবী, যাঁরা দুর্বলকে রক্ষা করবেন), মসী (কলমজীবী, অর্থাৎ কবি, দার্শনিক, চিন্তকরা), কৃষি (যাঁরা খাদ্য উৎপাদন করবেন), বিদ্যা (অন্যকে যাঁরা শিক্ষিত করে তুলবেন), বাণিজ্য এবং শিল্প।

কিন্তু এ সব ছিল জাগতিক ক্লেশ নিবারণের বন্দোবস্ত। পারত্রিক ক্লেশের বিষয়ে কী হবে? ঋষভদেব এক বার দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় এক অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত হন। সেখানে নৃত্যগীত চলাকালে এক অপ্সরা মারা যান। প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর নৃত্যরতা অপ্সরার আকস্মিক মৃত্যু তাঁকে বিহ্বল করে তোলে। তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করেন। এবং ১৩ মাস নির্জলা উপবাসে থেকে সত্যানুসন্ধান করে জন্ম-মৃত্যুর অনিত্যতা এবং আত্মার অবিনশ্বরতা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। ১৩ মাস অতিক্রান্ত হলে তিনি তাঁর প্রপৌত্র রাজা শ্রেয়াংশের হাত থেকে অঞ্জলি ভরে ইক্ষুরস পান করে উপবাস ভঙ্গ করেন। সেই দিনটি ছিল অক্ষয় তৃতীয়া। সেই কারণে এই দিনটি জৈনরা গভীর শ্রর আহার্য দান করেন।

অক্ষয় তৃতীয়া তিথিতেই কি গঙ্গা অবতরণ করেন ধরিত্রীতে?

হিন্দু বিশ্বাসে গঙ্গা ভারতের পবিত্র নদীগুলির মধ্যে প্রধান। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পুরাণ মতে গঙ্গা এই বিশ্বের নদীই নয়। গঙ্গা আসলে ব্রহ্মার মানসকন্যা এবং স্বর্গেই প্রবাহিতা ছিলেন। এক বিশেষ কারণে তাঁকে মর্ত্যে নেমে আসতে হয়। যে দিন তিনি মর্ত্যে অবতরণ করেন, সেই দিনটি ছিল অক্ষয় তৃতীয়া। এমন বিশ্বাস বেশ কিছু পুরাণে লভ্য। পাশাপাশি অন্যত্র এ-ও বলা হয়, গঙ্গাবতরণ ঘটেছিল জ্যৈষ্ঠ মাসে।

এই বিতর্কের মধ্যে ঢুকতে গেলে আগে জানা দরকার গঙ্গার মর্ত্যে অবতরণের কাহিনি।

মহাভারতের বনপর্বে লোমশ মুনি যধিষ্ঠিরকে গঙ্গাবতরণের আখ্যান জানিয়েছিলেন। ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা সগর ছিলেন অপুত্রক। পুত্রকামনায় তিনি তাঁর দুই পত্নীর সঙ্গে কৈলাস পর্বতে গিয়ে কঠোর তপস্যা করে মহাদেবের বরলাভে সমর্থ হন। এর ফলে তাঁর এক স্ত্রী-র গর্ভে ৬০ হাজার ও অন্য জনের গর্ভে একটি পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। বেশ কিছুকাল পরে সগর অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। যজ্ঞের ঘোড়াটি ৬০ হাজার সগরপুত্রের দ্বারা রক্ষিত হতে হতে সমুদ্রের তীরে এসে উধাও হয়ে যায়। সমুদ্রবাসী অসুর, নাগ এবং রাক্ষসরা তাকে অপহরণ করেছে ধরে নিয়ে সগরপুত্ররা সমুদ্র খনন করে নাগ-অসুর-রাক্ষসদের নির্বিচারে হত্যা করে পাতালে পৌঁছন। সেখানে তাঁরা দেখতে পান, এক মহাতেজা ঋষি ধ্যানমগ্ন। ইনিই কপিলমুনি। তাঁর সামনেই ঘোড়াটিও বিচরণ করছিল। কপিলকে অশ্বচোর ভেবে সগরপুত্ররা আক্রমণ করতে উদ্যত হলে কপিল তাঁর দৃষ্টি দ্বারা তাঁদের ভস্ম করেন।

সগরের বংশে বাতি দিতে বেঁচে রইলেন তাঁর দ্বিতীয়া কন্যার গর্ভজাত পুত্র অসমঞ্জা। কিন্তু অসমঞ্জা ছিলেন পাপাচারী। সগর তাঁকে নির্বাসন দেন। অসমঞ্জার পুত্র অংশুমানকে সগর তাঁর ৬০ হাজার পুত্রের করুণ পরিণতি শোনালে অংশুমান পূর্বপুরুষদের উদ্ধারে ব্রতী হন। তিনি পাতালে গিয়ে কপিলমুনির কাছে ক্ষমা চান এবং যজ্ঞাশ্ব ও পূর্বপুরুষদের মুক্তি প্রার্থনা করেন। কপিল তাঁকে অশ্ব ফিরিয়ে দেন এবং জানান, অংশুমানের পৌত্র মহাদেবকে সন্তুষ্ট করে স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে নিয়ে এলেই তাঁর পূর্বপুরুষরা মুক্তি পাবেন। অংশুমানের পুত্র দিলীপ এবং দিলীপের পুত্র ভগীরথ। রাজ্যলাভের পর ভগীরথ তাঁর মন্ত্রীদের উপরে রাজ্যভার অর্পণ করে হিমালয়ে গিয়ে গঙ্গার আরাধনা শুরু করেন। সহস্র বছর ধরে চলে এই তপস্যা। অবশেষে গঙ্গা মূর্তিমতী হয়ে ভগীরথকে দেখা দেন এবং জানান, তিনি মর্ত্যে অবতরণ করতে সম্মত। কিন্তু তাঁর মতো বেগবতীকে মর্ত্যে প্রবাহিত করতে হলে বেগ স্তিমিত করা প্রয়োজন। একমাত্র মহাদেবই সেই কাজে সমর্থ।

এর পর ভগীরথ কৈলাসে গিয়ে কঠোর তপস্যায় মহাদেবকে সন্তুষ্ট করেন। চন্দ্রচূড় তাঁর জটাজালে জাহ্নবীকে ধারণ করতে সম্মত হন। অবশেষে গঙ্গা স্বর্গ থেকে অবতরণ করলেন। মহাদেব তাঁর জটায় গঙ্গাকে ধারণ করে ধরায় প্রবাহিত হওয়ার গতিছন্দ নির্ধারণ করে দিলেন। ভগীরথ তাঁকে পথ দেখিয়ে তাঁর পূর্বপুরুষের ভস্মরাশির কাছে নিয়ে গেলেন। গঙ্গার স্পর্শে ৬০ হাজার সগরসন্তান উদ্ধার লাভ করলেন।

গঙ্গাবতরণের ওই দিনটি কি অক্ষয় তৃতীয়াই ছিল? অনেক কিংবদন্তি আবার জানায়, গঙ্গাবতরণ ঘটেছিল জ্যৈষ্ঠ মাসে। মনে রাখতে হবে, গঙ্গা সরাসরি স্বর্গ থেকে নামেননি। তাঁকে প্রথমে নামতে হয়েছিল মহাদেবের জটায়। তার পর গতি সংবরণ করে তিনি ধরায় আসেন। সে ক্ষেত্রে যুক্তিসম্মত অনুমান, অক্ষয় তৃতীয়ার দিনই মহাদেব তাঁকে জটায় ধারণ করেন এবং জ্যৈষ্ঠে তিনি সেই জটা থেকে নেমে আসেন। এখনও ভারতের বিভিন্ন স্থানে অক্ষয় তৃতীয়ার দিন গঙ্গাস্নানের রীতি বিদ্যমান। হিন্দুদের কাছে অতি পবিত্র চার ধামের মধ্যে গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রী মন্দির শীতের শেষে এই তিথিতেই পুনরায় উন্মুক্ত হয়।

অক্ষয় তৃতীয়া, মহাভারত আর গণেশের ভাঙা দাঁতের যোগসূত্র ঠিক কোথায়?

অক্ষয় তৃতীয়া, মহাভারত আর গণপতির ভাঙা দাঁতের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। অন্ততপক্ষে প্রচলিত কিংবদন্তি সেই কথাই বলে।

ভারতের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য মহাভারতের আদিপর্বে শৌনক মুনির আশ্রমে সৌতি মুনি আতিথ্য গ্রহণ করেন। সৌতি রাজা জন্মেজয়ের সর্পযজ্ঞ থেকে ফিরছিলেন। সেখানে তিনি বৈশম্পায়নের মুখ থেকে মহাভারত-কথা শ্রবণ করেন। শৌনকের অনুরোধে সৌতি সেই কাহিনি শোনাতে শুরু করেন। সৌতিকথন থেকে জানা যায়, প্রজাপিতা ব্রহ্মার নির্দেশে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস মহাভারত লিখনে রাজি হন। ব্যাসদেব আবার কুরুবংশের সাতটি প্রজন্মকে দেখেছেন এবং নিজেও এই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র। ফলে ঘনিয়ে ওঠা মহাকাব্যটির আকার-আয়তন কী দাঁড়াবে, তা তিনি ভালই জানতেন। সে কারণে ব্যাস ব্রহ্মার কাছে একজন লিপিকার চান। ব্রহ্মার মতে গণেশই একমাত্র, যিনি ওই মহাকাব্যকে কলমে ধরে রাখতে পারবেন। গণপতিকে লিপিকার হওয়ার অনুরোধ জানালে তিনি বলেন, লিপিকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে তাঁর আপত্তি নেই। কিন্তু কলম তিনি থামাতে পারবেন না। ও দিকে ব্যাসদেব দেখলেন, মহাভারতের ৮ হাজার ৮ শত কূটশ্লোক তিনি ও তাঁর পুত্র শুক ছাড়া অন্য কেউ সহজে বুঝতে পারবেন না। তিনি জানালেন, গণেশও না বুঝে তাঁর শ্লোকগুলি লিপিবদ্ধ করতে পারবেন না। সেই ব্যবস্থাতেই চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে শুরু হয় মহাভারত রচনা। ওই দিনটিই অক্ষয় তৃতীয়া। তাই যে কোনও কাজের শুভারম্ভের জন্য দিনটি বিশেষ প্রশস্ত।

শুভকাজ তো শুরু হল। ব্যাস বলে যেতে লাগলেন তাঁর কাব্য। গণপতিও লিখে যেতে লাগলেন। কূটশ্লোক হৃদয়ঙ্গমের জন্য মাঝে মাঝে গণেশ খানিক শ্লথ হতেন আর ব্যাসদেবও পরবর্তী শ্লোকগুলি মনে মনে গুছিয়ে নিতেন। কিন্তু বলা আর লেখা থামত না। এক কিংবদন্তি অনুসারে, একদিন অতি দ্রুতবেগে চলছে শ্রুতিলিখন। এমন সময়ে হঠাৎ গণেশের কলম ভেঙে গেল। ও দিকে ব্যাসদেবের মুখ থেকে ক্রমাগত নিঃসৃত হয়ে চলেছে শ্লোকের পরে শ্লোক। গণপতি তাঁর লিখন না থামিয়ে নিজের একটা দাঁতকেই ভেঙে কলম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন। সেই ‘অক্ষয়’ গজদন্তেই নাকি লিখিত হয়েছিল মহাভারতের বাকি অংশ। গণপতিও জড়িয়ে গিয়েছিলেন এই তিথির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে। তাঁর ‘একদন্তা’ রূপটিই সবাই দেখেন। কিন্তু তার পিছনে থাকা অক্ষয় তৃতীয়া আর মহাভারতের কিস্‌সাটাকে তেমন মনে রাখে কি কেউ?

অক্ষয় তৃতীয়া, সূর্যদেবের দান আর দ্রৌপদীর হাঁড়ি: এক অনিঃশেষ ভারতকথা

মহাভারতে বর্ণিত কাহিনি অনুসারে পাশাখেলায় পরাজিত হয়ে পাণ্ডবরা বনগমন করলে অগণিত ব্রাহ্মণ ও মুনি-ঋষি তাঁদের সঙ্গ নেন। এতে যুধিষ্ঠির পড়েন মহা বিপাকে। তাঁরা সব কিছু ত্যাগ করে বনবাসী হয়েছেন। কিন্তু রাজধর্ম অনুসারে ব্রাহ্মণ ও অতিথির সেবা একান্ত কর্তব্য। কী করে তিনি তাঁদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সাক্ষাৎ করতে আসা অতিথিদের সেবা করবেন, এ নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ে পুরোহিত ধৌম্যের শরণাপন্ন হন যুধিষ্ঠির। ধৌম্য তাঁকে সূর্যের আরাধনা করতে বলেন এবং আরাধনার পদ্ধতিও শিখিয়ে দেন।

ধৌম্যের কথা মতো যুধিষ্ঠির সূর্যদেবের পুজা করলেন। সূর্য তুষ্ট হয়ে তাঁকে এক তামার পাত্র দান করলেন এবং বললেন, “বনবাসের দ্বাদশ বৎসর এই তাম্রস্থালীই তোমাদের অন্ন দেবে। সকলের আহার শেষ হলে যতক্ষণ না পর্যন্ত দ্রৌপদী আহার করছেন, ততক্ষণ এই পাত্রের আহার্য ফুরবে না।” সূর্যের কাছ থেকে সেই পাত্র লাভ করে যুধিষ্ঠির নিশ্চিন্ত মনে বনবাসী হয়ে সাধুসঙ্গ ও অতিথি সেবা করতে লাগলেন। সূর্যের দেওয়া পাত্রের কথা কৌরবদেরও কানে পৌঁছল। তাঁরা পাণ্ডবদের পর্যুদস্ত করার নানা উপায় খুঁজছিলেন। এমতাবস্থায় মহাতেজা, মহাক্রোধী তপস্বী দুর্বাসা দুর্যোধনের আতিথ্য স্বীকার করলেন। সঙ্গে ১০ হাজার শিষ্য। দুর্বাসা কখনও কৌরবদের বলতেন যে, তিনি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত। স্নান সেরে আসছেন। কৌরবরা যেন তাঁদের আহার প্রস্তুত রাখেন। কিন্তু অনেক সময়েই স্নান করতে গিয়ে প্রচুর দেরি করতেন। ফিরে এসে বলতেন, খিদে নেই। কখনও মধ্যরাত্রে উঠে অন্নপাক করতে বলতেন। ব্যপারটা বুঝে দুর্যোধন ঠিক করলেন, দুর্বাসাকে সশিষ্য বনবাসী পাণ্ডবদের কাছে পাঠালে তাঁরা জব্দ হবেন। কিন্তু সূর্যপ্রদত্ত তাম্রস্থালির গুণে অনন্ত অতিথি সেবা পাণ্ডবদের কাছে কোনও সমস্যার বিষয়ই নয়। তখন শকুনির পরামর্শে তিনি দুর্বাসাকে বললেন, পাঞ্চালীর ভোজন হয়ে যাওয়ার পর অপরাহ্নে তিনি যেন পাণ্ডবদের আতিথ্য গ্রহণ করে আহার্য চান। দুর্বাসা তাতে রাজি হয়ে বনবাসী পাণ্ডবদের কাছে শিষ্যদের নিয়ে উপস্থিত হন। পাণ্ডব ও দ্রৌপদী— সকলেরই তখন মধ্যাহ্নভোজন হয়ে গিয়েছে। সূর্যপ্রদত্ত তাম্রপাত্র শূন্য। দুর্বাসা বললেন, তিনি স্নান সেরে আসছেন। ফিরে ন আহার্য পান।

পাঞ্চালী পড়লেন মহা বিপদে। উগ্রতেজা মুনিকে তুষ্ট করতে না পারলে পাণ্ডবরা ভস্ম হয়ে যেতে পারেন। উপায়ান্তর না দেখে তিনি তাঁর প্রিয় সখা শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করলেন। কৃষ্ণ তৎক্ষণাৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন, তিনি নিজেই দারুণ ক্ষুধার্ত। কৃষ্ণা যেন তখনই তাঁর আহারের ব্যবস্থা করেন। পাঞ্চালী জানালেন, সব আহার্য নিঃশেষিত। তাম্রপাত্র শূন্য। কৃষ্ণ বললেন পাত্র খুঁটিয়ে দেখতে। কিছু না কিছু তাতে লেগে থাকবেই। দ্রৌপদী পাত্রটি নিয়ে এলে কৃষ্ণ দেখলেন, তার কানায় সামান্য শাকান্ন লেগে রয়েছে। তিনি সেটুকুই খেয়ে বললেন, “বিশ্বাত্মা যজ্ঞভোজী দেব তৃপ্তিলাভ করুন। তুষ্ট হন।” তার পর সহদেবকে বললেন, দুর্বাসাদের ভোজনের জন্য ডেকে আনতে। দুর্বাসাদের আহ্নিক তখনও শেষ হয়নি। কিন্তু তাঁরা টের পেলেন, উদর পরিপূর্ণ। তাঁদের ক্ষুধা নিবৃত্ত হয়েছে। শিষ্যরা দুর্বাসাকে জানালেন, আর আহার করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। দুর্বাসা প্রমাদ গণলেন। তিনি ভাবলেন এখন যদি পাণ্ডবদের কাছে গিয়ে তিনি আহার্য অস্বীকার করেন, তবে তো মহা অকল্যাণ ঘটতে পারে। পাণ্ডবরা হরিচরণে আশ্রিত। তিনি সশিষ্য পলায়ন করলেন। ওদিকে পান্ডবরাও দুর্বসার সশিষ্য পলায়নের বৃত্তান্ত জানতে পেরে নিশ্চিন্ত বোধ করলেন।

সূর্যপ্রদত্ত তাম্রপাত্রকে যে দিন অক্ষয়পাত্রে পরিণত করেছিলেন কৃষ্ণ, পৌরাণিক কাল থেকে মনে করা হয় সেই দিনটিই ছিল অক্ষয় তৃতীয়া।

‘দ্রৌপদীর হাঁড়ি’ সারা ভারতেই অক্ষয় স্বাচ্ছল্যের প্রতীক। এর পিছনে কি কোথাও রয়ে গিয়েছে সূর্যের অনিঃশেষ দানে ভরে ওঠা ধরিত্রীর অক্ষয় শস্যে পূর্ণ হয়ে ওঠার আবর্তনের বৃত্তান্ত? সে ভাবনা ভাববেন সমাজ-নৃতত্ত্বের তাত্ত্বিকরা। এ মহা ভারতের আপামর মানুষ যুগ যুগ ধরে এই কাহিনিতে পেয়েছেন বেঁচে থাকার প্রেরণা। দুর্ভিক্ষের পর দুর্ভিক্ষ পেরিয়েছে এই কাহিনি। মানুষ আশায় বেঁচেছে। প্রকৃতির অক্ষয় পাত্রের প্রতি তার বিশ্বাস তাকে যে কোনও মারি অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে।

অক্ষয় তৃতীয়া লোকবিশ্বাসের সর্বভারতীয় চরিত্রের একটি চমৎ‌কার নিদর্শন

একশো বছরেরও বেশি আগে ব্রিটিশ পর্যবেক্ষকরা লক্ষ করেছিলেন, ‘ভারত জুড়ে বৈশাখের শুক্লপক্ষের তৃতীয় দিনে অক্ষয় তৃতীয়া পালন করা হয়। মানুষের বিশ্বাস, এই দিন স্নান করে ব্রাহ্মণকে পাখা, ছাতা এবং অর্থ দান করলে অক্ষয় পুণ্য অর্জিত হয়। ফলে এই তিথি উদযাপন অত্যন্ত জনপ্রিয়।’ ভারতের বহু প্রদেশে পালিত এই উত্‌সব হিন্দি বলয়ে আখা তীজ নামে অভিহিত। জৈনরাও এই তিথি পালন করেন, তবে আমরা এই লেখায় ‘দান’-এর উপরেই জোর দেব।

পৃথিবীতে অনেক ধর্মেই পবিত্র ক্ষণ বা পুণ্যাহের ধারণা প্রচলিত। কিন্তু হিন্দুরা শুভমুহূর্ত-এর ধারণাকে যতটা গুরুত্ব দেয় এবং সেই ক্ষণ নির্ধারণের জন্য যতটা কাঠখড় পুড়িয়ে থাকে, অন্য কেউ তার ধারে কাছে পৌঁছতে পারবে না। হিন্দুধর্মের কোনও ভ্যাটিকান বা মক্কা নেই, কোনও পোপ কিংবা খলিফা অথবা শাহি ইমাম নেই, এমন একটা অ-সংগঠিত ধর্ম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কী করে বেঁচে আছে, সেটা বোঝার জন্যে এই ধর্মের সাধারণ রীতি ও আচারগুলিকে বোঝা দরকার। পুরোহিততন্ত্র এক অতি জটিল এবং সুবিস্তীর্ণ কাঠামোয় ধর্মবিশ্বাসীদের বেঁধে রেখেছে, এই সব রীতি ও আচার সেই বেঁধে রাখার কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। একটা বিশেষ রীতি হল পঞ্চাঙ্গ বা পঞ্জিকা দেখে চলা। সৌর এবং চান্দ্র গণনার মিশ্রণে জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষ এবং নানা ধর্মীয় বিধানের সমাহারে পঞ্জিকা একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন মতের পঞ্জিকা আছে, তাদের মধ্যে হিসেবের তারতম্য আছে, কিন্তু উত্‌সবের কাল নির্ধারণে এবং শুভ বা অশুভ ক্ষণ গণনায় সব পঞ্জিকার হিসেবই মোটামুটি মিলে যায়।

অক্ষয় তৃতীয়া লোকবিশ্বাসের সর্বভারতীয় চরিত্রের একটি চমত্‌কার নিদর্শন। এবং এই তিথি হল হিন্দুদের সাড়ে তিনটি সর্বাধিক শুভমুহূর্তের অন্যতম। অন্য দুটি হল পয়লা চৈত্র এবং বিজয়া দশমী, আর কার্তিকের শুক্লপক্ষের প্রথম দিনটি হচ্ছে আধখানা তিথি। কথিত আছে, এই তিথিতেই ব্যাসমুনি গণেশকে মহাভারত বলতে শুরু করেছিলেন; এই দিনেই কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে বস্ত্রহরণের অমর্যাদা থেকে রক্ষা করেছিলেন; এই দিনেই সূর্যদেব পাণ্ডবদের ‘অক্ষয়পাত্র’ দান করেছিলেন, যে পাত্রের খাবার কখনও ফুরোবে না। আরও নানা উপকথা এই দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অনেকের মতে এই দিন ত্রেতাযুগ শুরু হয়েছিল, আবার অনেকে বলেন সত্যযুগ। মুশকিল হল, এগুলো একটু পুরনো দিনের ব্যাপার, তর্কের মীমাংসা করতে পারেন এমন কেউ বেঁচে নেই। আবার, এই তিথিতেই নাকি গঙ্গার মর্তে অবতরণ ঘটেছিল। অন্য দিকে, কৃষ্ণ এই দিনেই পরশুরাম রূপে জন্ম নিয়েছিলেন এবং সমুদ্রের বুক থেকে জমি উদ্ধার করেছিলেন, কয়েক শতাব্দী পরে ওলন্দাজারা যেমনটা করবেন। কোঙ্কণ ও মালাবার উপকূলে অক্ষয় তৃতীয়ায় পরশুরাম এখনও পূজিত হন। বাংলায় পরশুরামের কোনও ভক্ত নেই, বোধহয় এই কারণে যে, এখানে সমস্যাটা উল্টো, নদীতে পলি এবং মাটি জমে চর জেগে উঠছে, এখানে বরং পরশুরাম তাঁর কুঠার চালিয়ে পবিত্র ভাগীরথীর বুকে জমা পলি নিকেশ করতে পারতেন।

বছরের এই সময়টাতে গ্রীষ্মের তাপ বাড়তে শুরু করে, মাটি শুকিয়ে ওঠে। ওডিশা থেকে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ ও হরিয়ানা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কৃষকরা এই দিন জমিতে লাঙল দেওয়া শুরু করেন। উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবীণ জাঠ কৃষিজীবীরা চাষের সরঞ্জাম নিয়ে শস্যক্ষেত্রে যান, যাওয়ার পথে পশুপাখি চোখে পড়লে তাকে সুলক্ষণ বলে গণ্য করেন। গুজরাতেও কৃষকরা এই দিন লাঙল তুলে নেন এবং পরশুরামকে স্মরণ করেন। দক্ষিণ ভারতে এই দিন চাষ শুরু করার ঐতিহ্য নেই বটে, কিন্তু সেখানেও পাঁজিতে এটি শুভতিথি হিসেবে চিহ্নিত। সৌভাগ্যের দেবতাদের প্রসন্ন করার উদ্দেশ্যে অনেকেই এ দিন উপবাস করেন।

কৃষিতে হোক অথবা বাণিজ্যে, অক্ষয় তৃতীয়ায় সমৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হয় এবং তা থেকেই বোঝা যায়, হিন্দু জীবনাদর্শে জাগতিক বিষয়কে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই দিন দেবী অন্নপূর্ণার জন্মদিন, ধনসম্পদের দেবতা কুবেরের আরাধনাও এ তিথির সঙ্গে জড়িত। কুবের এক আশ্চর্য দেবতা। তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত বিবিধ উপকথায় সমাজ-ইতিহাসের মূল্যবান রসদ আছে। ব্রাহ্মণ্য কাহিনিগুলি পশ্চিমী উপাখ্যানের মতো সরল নয়, বহুমাত্রিক, সেখানে সমাজের বিবর্তন সম্পর্কে নানা ধারণা খুঁজে নেওয়া যায়। কুবেরকে বর্ণনা করা হয় এক কুদর্শন, খর্বকায় এবং স্ফীতোদর যক্ষ রূপে। প্রথম যুগে ভারতে নবাগত আর্যদের জীবিকা ছিল পশুচারণ, সুতরাং তাঁরা ভ্রাম্যমাণ জীবন যাপন করতেন। অন্য দিকে, পুরনো অধিবাসীদের স্থায়ী বসতি ছিল, তাঁদের আর্থিক অবস্থাও ছিল আর্যদের তুলনায় সমৃদ্ধ। কিন্তু তাঁদের গায়ের রং আর্যদের মতো ফরসা নয়, এবং আর্যরা তাঁদের তুলনায় দীর্ঘাঙ্গী। দেখতে খারাপ বলে আর্যরা তাঁদের নিচু চোখে দেখতেন। বৈদিক, বেদ-উত্তর এবং পৌরাণিক কাহিনিতে অনার্য জনগোষ্ঠীর বিপুল ঐশ্বর্যের বিস্তর উল্লেখ আছে। এই সম্পদের একটা কারণ হল, তাঁরা পশুপালন এবং কৃষি থেকে অর্জিত সম্পদের একটা অংশ স্বর্ণ ও মণিরত্নের আকারে সঞ্চিত রাখতেন। অক্ষয় তৃতীয়ায় সঞ্চয় করা ও সঞ্চিত অর্থ দিয়ে সোনারূপো কেনার ঐতিহ্য এই সূত্রেই এসেছে। এর ছ’মাস পরে ধনতেরাসেও একই রীতি অনুসৃত হয়। অর্থনীতিবিদ ও লগ্নি-বাজারের উপদেষ্টারাও এই উপদেশই দেন।

কুবেরকে বৈদিক সাহিত্যে প্রথমে দেখা যায় ‘ভূতেশ্বর’ রূপে। দেবতা হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি মেলে পুরাণের যুগে, হাজার বছর পরে। তত দিনে মনু-কথিত ‘মিশ্র জনগোষ্ঠী’ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাস করছেন। ক্রমশ কুবেরকে বৌদ্ধরা বৈশ্রবন্ত নামে এবং জৈনরা সর্বন-ভূতি নামে স্বীকৃতি দেন। লক্ষ্মী ঐশ্বর্যের দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া অবধি কুবের হিন্দুদের কাছে সম্পদের দেবতা হিসেবে পূজিত হয়ে চলেন। দেবতাদের সম্পদরক্ষী হিসেবে তাঁর গায়ের রংও ক্রমশ পরিষ্কার হতে থাকে, যদিও তিনি গণ, যক্ষ, কিন্নর, গন্ধর্ব গুহ্যক প্রমুখ ‘পশ্চাত্‌পদ গোষ্ঠী’র প্রতিনিধিই থেকে যান। লোকদেবতা থেকে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের উচ্চতর কোটিতে ওঠার স্পর্ধা দেখিয়েছেন তিনি, তার মূল্য দিতে হয়েছে কুবেরকে, তাঁর একটি চোখ নষ্ট হয়েছে, একেবারে মনসার মতোই। লড়াই না করে কিছু পাওয়া যায় না। অক্ষয় তৃতীয়া এবং ধনতেরাসে অনেক হিন্দু তাঁর আরাধনা করে। হিন্দুধর্ম কোনও দেবতাকেই একেবারে ছেঁটে ফেলে না, দরকার মতো একটা সাম্মানিক আসন দিয়ে এক পাশে সরিয়ে দেয়, অনেকটা রাজনৈতিক দলের কিছু কিছু প্রবীণ নেতার মতোই। প্রসঙ্গত, বৌদ্ধধর্মের আধারে কুবের দিব্যি অন্য একাধিক দেশে পৌঁছে গেছেন। জাপানে তিনি বিশামন নামে পূজিত।

অন্য অনেক প্রদেশের মতোই বাংলাতেও অক্ষয় তৃতীয়া নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ সূচনার প্রশস্ত দিন হিসেবে গণ্য হয়, অনেকে এই দিন হালখাতাও করেন। আবার, কৃষ্ণকে সুদামার চিড়ে উপহার দেওয়ার কাহিনি স্মরণ করে এই দিনটিতে বড় হোক, ছোট হোক, উপহার দেওয়ার চল আছে। ১৮৩৬ সালে রেভারেন্ড কে এস ম্যাকডোনাল্ড লিখেছিলেন, ‘হিন্দুদের কাছে এই দিনটি পবিত্র, কারণ শাস্ত্রমতে এই দিন ভিক্ষা বা উপহার দিলে অক্ষয় পুণ্য অর্জিত হয়, ভবিষ্যতে পাপ করলেও সেই পুণ্যফল নষ্ট হয় না, তাই কৃপণরাও এই দিন হাত উপুড় করে দেন।’ এটাই আসল কথা। শীতের ফসল গোলায় চলে গেছে। এখন পুণ্যার্জনের একটা তাগিদ সৃষ্টি না করলে এবং ভবিষ্যতে পাপ করলেও সেই পুণ্য ধরে রাখার একটা ‘আগাম জামিন’-এর ধর্মীয় বিধান না দিলে ধনীরা ব্রাহ্মণ বা দরিদ্র মানুষকে দান করতে চাইবে কেন?

দিন বদলায়, তবুও অক্ষয় তৃতীয়ার মাহাত্ম্য অক্ষয় হয়েই থেকে যায়

অক্ষয় নেই যার সেটাই অক্ষয়!

তাই যুগ যুগ ধরে বৈশাখের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া দিনটি এতপবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ। অক্ষয় তৃতীয়াকে নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা পৌরাণিক কাহিনি ও বিশ্বাস। এই দিন কারও মৃত্যু হলে তাঁর অক্ষয় স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটে। এদিনই সত্যযুগ শেষ হয়ে ত্রেতাযুগের সূচনা হয়েছিল। এদিনই কুবেরের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাঁকে অতুল ঐশ্বর্য প্রদান করেছিলেন।এ দিনেই কুবেরের লক্ষ্মীলাভ হওয়ায় বৈভব-লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। রাজা ভগীরথ গঙ্গা দেবীকে মর্ত্যে নিয়ে এসেছিলেন এদিনই। তাই এ দিন গঙ্গাস্নান করলে সর্ব পাপ ধুয়েমুছে যায়। রয়েছে এমন কত বিশ্বাস, কাহিনি ও কিংবদন্তি।

কৃষিপ্রধান ভারতে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনটিতে অনেক জায়গায় ধরিত্রীদেবীর পুজো করা হয়। এ ছাড়াও দেশ জুড়ে পালিত হয় নানা উৎসব ও শুভ কাজ।

তবে শুধু মহাকাব্য বা পৌরাণিক কাহিনিতেই নয়, বাংলার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনেও অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে রয়েছে অক্ষয় তৃতীয়া। প্রাচীন বাংলায় পুণ্যাহ উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায়। পুণ্যাহ বাংলার রাজস্ব আদায়ের বার্ষিক বন্দোবস্তের একটি উৎসব। আঞ্চলিকতা ভেদে এই উৎসব কোথাও পয়লা বৈশাখ, কোথাও বা অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে পালিত হত। এর কারণ ১ বৈশাখে প্রতি বছর কোনও নির্দিষ্ট শুভ তিথি না থাকলেও অক্ষয় তৃতীয়া দিনটি সব দিক থেকে শুভ। তাই এই দিনেই বহু অঞ্চলে পুণ্যাহ পালিত হত। যদিও ঔপনিবেশিক কালে এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তা লুপ্ত হয়। তার পরিবর্তে ১ বৈশাখ বাংলা নববর্ষের দিন হালখাতার পুজো প্রাধান্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। আজও বহু দোকানে এবং বনেদি পরিবারে এই দিনটিতে বিশেষ পুজোর মাধ্যমে নতুন হিসেবের খাতার সূচনা করা হয়।

বিভিন্ন পুরাণে অক্ষয় তৃতীয়ার মাহাত্ম্য নিয়ে বেশ কিছু কাহিনি প্রচলিত।তার মধ্যে একটি হল, একবার মহামুনি শতানিক যুধিষ্ঠিরকে জলদানের মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে একটি কাহিনি শুনিয়েছিলেন। বহু যুগ আগে এক ক্রোধী ও নির্দয় ব্রাহ্মণ ছিলেন। এক দিন এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ তাঁর কাছে কিছু খাবার চাওয়ায়তিনি গালমন্দ করে দরজা থেকেই তাঁকে তাড়িয়ে দিলেন। অপমানিত ব্রাহ্মণ চলে যাচ্ছেনএমন সময় ব্রাহ্মণপত্নীতাঁকে যেতে দিলেন না।অতিথির কাছে ক্ষমা চেয়েতাঁকে বললেন, সেখানেইআহার করতে।এর পর ব্রাহ্মণপত্নী অতিথিকেযথাসাধ্য আহার-সহআপ্যায়ন করলেন। যাওয়ার আগে সেই ব্রাহ্মণতুষ্ট হয়ে ব্রাহ্মণপত্নীকে আশীর্বাদ করে বললেন, তাঁর অন্ন-জল দান অক্ষয় হোক।

তারপর কেটেছে গিয়েছে বহু বছর। এক সময় সেই ক্রোধী ও নির্দয় ব্রাহ্মণেরমৃত্যু আসন্ন জেনে তাঁকে নিয়ে যেতে একই সঙ্গে হাজির হল যমদূত ও বিষ্ণুদূতের দল। কিন্তু তাঁকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে এই নিয়ে তুমুল বিবাদ শুরু হল দুই দল দূতের মধ্যে। একদল তাঁকে বিষ্ণুলোকে নিয়ে যেতে চাইল। অন্য দলতাঁকে নরকে নিয়ে যেতে চাইল। এরই মাঝে তৃষ্ণায় কাতর ব্রাহ্মণ একটু জল চাইলেন। যমদূতেরা তখন ব্রাহ্মণকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, অতিথি ব্রাহ্মণকে জল না দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার সেই ঘটনাটি।এর পরে তাঁরা ব্রাহ্মণকে যমরাজের কাছে নিয়ে গেলেন।

যমরাজ ব্রাহ্মণকে দেখেই চমকে উঠলেন। তাঁর দূতদের বললেন, তাঁর মতো পুণ্যবানকে কেন যমলোকে নিয়ে এসেছে তাঁরা? বৈশাখর শুক্লা তৃতীয়ায় ব্রাহ্মণপত্নী তৃষ্ণার্ত অতিথিকে অন্ন-জল দান করেছেন। সেই দান অক্ষয় দান। স্ত্রীর পুণ্যে তিনিও তাই পুণ্যবান হয়েছেন। আর সেই পুণ্যের ফলে ব্রাহ্মণের স্থান নরকে নয়, স্বর্গেই হবে। কাহিনি শেষে শতানিক মুনি যুধিষ্ঠিরকে বলেছিলেন, বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে ব্রাহ্মণকে অন্ন বস্ত্র জল দান করলে সব পাপ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। অর্থাৎ এই দিনে কিছু দান করলে পুন্য সঞ্চয় হয়।

দ্বাপর যুগে শ্রীকৃষ্ণ তখন দ্বারকার রাজা। বাল্যসখা সুদামা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বৃন্দাবন থেকে সুদূর দ্বারকায় এলেন। দরিদ্র সুদামা কৃষ্ণের জন্য কাপড়ের পুটুলিতে বেঁধে এনেছিলেন তিনমুঠো তণ্ডুল। নানা বিষয়ে কথা হলেও সুদামা তাঁর দারিদ্রের কথা সঙ্কোচে কৃষ্ণকে বলতে পারলেন না। কৃষ্ণের কাছে কিছুই অজানা নয়। সুদামা বৃন্দাবনে ফিরে দেখেন তাঁর পর্ণকুটিরের জায়গায়রয়েছে সুন্দর এক বাড়ি। অভাব নেই কোনও কিছুরই। সেই দিনটিও ছিল অক্ষয় তৃতীয়া।

দিন বদলায়, তবু অক্ষয় তৃতীয়ার মাহাত্ম্য অক্ষয় হয়েই থেকে যায়।

                    (আনন্দবাজার পত্রিকা)

Post a Comment

0 Comments