পবিত্র বেদের সর্বশ্রেষ্ঠ মহা গায়ত্রী মন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আলোচনা—
গায়ত্রী মন্ত্র হল বৈদিক হিন্দুধর্মের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, বেদের অন্যান্য মন্ত্রের মতো গায়ত্রী মন্ত্রও "অপৌরষেয়" (অর্থাৎ, কোনো মানুষের দ্বারা রচিত নয়) এবং এক ব্রহ্মর্ষির কাছে (গায়ত্রী মন্ত্রের ক্ষেত্রে ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র) প্রকাশিত। এই মন্ত্রটি বৈদিক সংস্কৃত ভাষায় রচিত। এটি ঋগ্বেদের (মণ্ডল ৩।৬২।১০) একটি সূক্ত। গায়ত্রী মন্ত্র গায়ত্রী ছন্দে রচিত।
[১] হিন্দুধর্মে গায়ত্রী মন্ত্র ও এই মন্ত্রে উল্লিখিত— দেবতাকে অভিন্ন জ্ঞান করা হয়। তাই এই মন্ত্রের দেবীর নামও গায়ত্রী। গায়ত্রী মন্ত্র দিয়ে শুধু পূজাই হয় না, গায়ত্রী মন্ত্রকেও পূজা করা হয়। গায়ত্রী মন্ত্র দিয়ে হিন্দু দেবতা সবিতৃকে আবাহন করা হয়। তাই গায়ত্রী মন্ত্রের অন্য নাম "সাবিত্রী মন্ত্র"।
[২] সাবিত্রীর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা অনুসারে এই মন্ত্র সূর্যপূজা, যোগ, তন্ত্র বা শাক্তধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। মন্ত্রটির শুরুতে ওঁ-কার এবং "মহাব্যাহৃতি" নামে পরিচিত "ভূর্ভুবঃ স্বঃ" শব্দবন্ধটি পাওয়া যায়। এই শব্দবন্ধটি তিনটি শব্দের সমষ্টি - ভূঃ, ভূবঃ ও স্বঃ। এই তিনটি শব্দ দ্বারা তিন জগতকে বোঝায়। ভূঃ বলতে বোঝায় মর্ত্যলোক, ভূবঃ বলতে বোঝায় স্বর্গলোক এবং স্বঃ হল স্বর্গ ও মর্ত্যের সংযোগ রক্ষা কারী এক লোক। বেদে যে সপ্তভূমি বা সাত জগতের উল্লেখ আছে, এগুলি তার মধ্যে তিনটি জগতের নাম। ধ্যান অনুশীলনের ক্ষেত্রে ভূঃ, ভূবঃ ও স্বঃ - এই তিন লোক চেতন, অর্ধচেতন ও অচেতন - এই তিন স্তরের প্রতীক। বৈদিক সাহিত্যে বহুবার গায়ত্রী মন্ত্র উল্লিখিত হয়েছে।
(১) মনুস্মৃতি, (২) হরিবংশ, ও ভগবদ্গীতায়
[৩] গায়ত্রী মন্ত্রের প্রশংসা করা হয়েছে। হিন্দুধর্মে উপনয়ন সংস্কারের সময় গায়ত্রী দীক্ষা একটি প্রধান অনুষ্ঠান এবং হিন্দু দ্বিজ সম্প্রদায়ভুক্তেরা এই মন্ত্র নিত্য জপ করেন। আধুনিক হিন্দু ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের ফলে গায়ত্রী মন্ত্র নারী ও সকল বর্ণের মধ্যে প্রচলিত হয়েছে।
দেবনাগরী হরফে গায়ত্রী মন্ত্র—
ॐ भूर्भुवः स्वः ।
तत्स॑वितुर्वरे॑ण्यं ।
भर्गो॑ देवस्य॑ धीमहि। ।
धियो यो नः॑ प्रचोदया॑त्॥ ।
বাংলা প্রতিলিপিকরণ গায়ত্রী মন্ত্র—
ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ
তৎ সবিতুর্বরেণ্যং
ভর্গো দেবস্য ধীমহি
ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।।
গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণের আগে ওঁ-কার উচ্চারণ করা হয়। তারপর "মহাব্যাহৃতি" নামে পরিচিত "ভূর্ভূবঃ স্বঃ" শব্দবন্ধটি উচ্চারণ করা হয়। তৈত্তিরীয় আরণ্যক (২.১১/১-৮) অনুযায়ী, ধর্মগ্রন্থ পাঠের আগে ওঁ-কার, মহাব্যাহৃতি ও গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয়। মহাব্যাহৃতির পরে ঋগ্বেদের তৃতীয় মণ্ডলে উক্ত (৬২.১০) মূল মন্ত্রটি পাঠ করা হয়।
গায়ত্রী ছন্দে আটটি শব্দাংশ-যুক্ত মোট তিনটি পাদ থাকে। কিন্তু ঋগ্বেদ সংহিতায় উল্লিখিত গায়ত্রী মন্ত্রে একটি শব্দাংশ কম। এই মন্ত্রের প্রথম পাদে সাতটি শব্দাংশ। তাই তিন-শব্দাংশযুক্ত "বরেণ্যং" শব্দের পরিবর্তে "বরেণীয়ং" শব্দটির দ্বারা শব্দাংশের সংখ্যায় সমতা আনা হয়। যেমন গায়ত্রী ছন্দের তিন পাদ এবং তিনটি পাদই স্বতন্ত্রভাবে অর্থ প্রকাশ করে। তিন পাদে বিভক্ত করিলে মন্ত্রটি এরূপ হবে—
(১) তৎসবিতুর্বরেণ্যম।
(২) ভর্গো দেবস্য ধীমহি।
(৩) ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।
প্রত্যেক পাদে আটটি করে অক্ষর থাকবে কিন্তু প্রথম পাদে সাতটি অক্ষর আছে। মন্ত্রে মোট ২৪টি অক্ষরের স্থানে ২৩টি অক্ষর আছে। ইহাকে নিচৃৎ গায়ত্রী বলে। এক অক্ষর বেশী হইলে 'ভুরিক' গায়ত্রী বলা হত। তাই তিন-শব্দাংশযুক্ত "বরেণ্যং" কে "বরেণীয়ং" উচ্চারণ করতে হবে।
সবিতা গায়ত্রী মন্ত্রের দেবতা—
ঋগ্বেদের ২য় মন্ডলের ৩৮ সূক্তের ৭ থেকে ১১ নং মন্ত্রে সূর্য বা সবিতাকে সকল শক্তির উত্স বলে তার স্তুতি করা হয়েছে। এই মন্ত্রে বলা হয়েছে, হে সবিতা, তুমি অন্তরীক্ষ, জল, স্থল সকল কিছু সৃষ্টি করেছ। তুমি সকল ভূত, পশুপাখী, স্থাবর জঙ্গম ইত্যাদিকে স্ব স্ব স্থানে রেখেছ।
ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, অর্য্যমা বা রুদ্র সবাই তোমার শক্তিতে বলীয়ান। কেউ তোমাকে হিংসা করে না। হে পরমেশ্বর, তোমার দুতিমান জ্যোতিকে (অথ্যাৎ, সকল প্রকাশ যুক্তশক্তি এবং অপ্রকাশিত অতিন্দ্রিয় শক্তিকে) আমরা নমষ্কার করি। তুমি সকলের কল্যাণ কর। আমাদের জন্যে যেন সকল কিছু শুভ হয়। এটাই এই গায়ত্রী মন্ত্রের দেবতা সবিতার তাত্পর্য। বেদভাষ্যকার সায়নাচার্য গায়ত্রী মন্ত্রে সূর্য ও সবিতার দুই রকম অর্থ করেছেন। তাঁর মতে এই মন্ত্রে সবিতা হল, সকল কারণের কারণ সেই সচ্চিদানন্দ নিরাকার পরম ব্রহ্ম বা জগত স্রষ্টা। "সু" ধাতু থেকে সবিতৃ নিষ্পন্ন হয়েছে, যায় জন্যে সবিতার অর্থ এক্ষেত্রে প্রসবিতা বলে উল্লিখিত হয়েছে। নিরুক্তিকার যস্ক এর অর্থ করেছেন "সর্ব্বস্য প্রসবিতা।
অনুবাদ গায়ত্রী মন্ত্রটির সরলার্থ, সর্বলোকের প্রকাশক সর্বব্যাপী সবিতা মণ্ডল জগৎ প্রসবকারী সেই পরম দেবতার বরেণ্য জ্ঞান ও শক্তি ধ্যান করি; যিনি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি প্রদান করেছেন।
গায়ত্রী মন্ত্রের রেফারেন্স—
সর্বশ্রেষ্ঠ একমাত্র মহামন্ত্র গায়ত্রী এই মন্ত্রই হল একমাত্র গুরুমন্ত্র, 'গুরু' অর্থ শ্রেষ্ঠ।
ওঙ্কারপূর্বিকাস্তিস্রো মহাব্যাহৃতয়েহিব্যায়াঃ
ত্রিপদা চৈব সাবিত্রী বিজ্ঞেয়ং ব্রহ্মণো মুখম।।
(মনুসংহিতা, ২/৮১)
অর্থাৎ— পূর্বে ওঙ্কার এবং অবিনাশী মহাব্যাহৃতি (ভূঃ,ভুবঃ,স্বঃ) উচ্চারণপূর্বক ত্রিপদী গায়ত্রী হল ব্রহ্ম প্রাপ্তির একমাত্র উপায় বলে জানবে।
সাবিত্র্যাস্ত পরং নাস্তি।
(মনুসংহিতা, ২/৮৩)
অর্থাৎ— গায়ত্রীর চেয়ে উৎকৃষ্ট মহামন্ত্র আর কিছুই নেই।
পবিত্র বেদের চারটি ভাগেই পরমাত্মা গায়ত্রী জ্ঞান প্রদান করেছেন এমনই মহিমা সকল হিন্দুধর্মালম্বীদের জন্যেই এই সর্বশ্রেষ্ঠ মহামন্ত্রের দ্বারাই উপনয়ন-দীক্ষা নেয়া নিয়ম বলে ঘোষণা করেছে বৈদিক সকল শাস্ত্র।
তৎসবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি।
ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।।
তৈত্তিরীয় আরণ্যক (২। ১১। ১-৮) অনুযায়ী, গায়ত্রী পাঠের আগে ওঁ-কার, মহাব্যাহৃতি(ভূঃ,ভুবঃ,স্বঃ) উচ্চারণ করতে হয়।
তাই সর্বশ্রেষ্ঠ মহাগায়ত্রী মন্ত্রকে পড়া হয়—
ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি। ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।।
(ঋগবেদ ৩।৬২।১০), (যজুর্বেদ ৩।৩৫, ২২।৯), (৩০।২, ৩৬।৩), সামবেদ উত্তরার্চিক, (প্রপাঠক ৩), (অর্দ্ধপ্রপাঠক ৩), (মন্ত্র ১০।গ)।
শাস্ত্র বরং বলা হয়েছে গায়ত্রী মহামন্ত্রের মাধ্যমে দ্বিজত্ব লাভ হয়।
(অর্থববেদ ১৯/৭১/১)
অনুবাদঃ— যে কেউই গায়ত্রী মহামন্ত্র জপ করার মাধ্যমেই দ্বিজ হয়।
তাৎপর্যঃ— "হে অনন্ত প্রেরণাদাত্রী বরদা বেদমাতা, তোমার অনন্ত জ্ঞানের পবিত্র স্পর্শে আমরা দ্বিতীয় জন্ম লাভ করে পবিত্র হয়ে উঠি;একমাত্র তোমার সম্যক জ্ঞানের মাধ্যমেই আমরা শতায়ু, জীবনীশক্তি, সন্তান ধারা, পশু সম্পত্তি, অনন্ত কীর্তি সহ ব্রহ্মবাণীর ব্রহ্মতেজ লাভ করতে পারি ; এমনকি আমরা ব্রহ্মকেও লাভ করতে পারি।তাই হে বেদমাতা তোমার তেজদীপ্ত ব্রহ্মজ্ঞান থেকে আমরা যেন বঞ্চিত না হই।"
(অর্থববেদ ১৯/৭১/১)
"সাবিত্রীজর্প্যানরতঃ স্বর্গমাপ্নোতি মানবঃ।
সাবিত্রীজর্প্যনিরতো মোক্ষোপাযঞ্চ বিন্দতি।।"
(শঙ্খসংহিতা ১১/১৮)
ভাবার্থঃ— সাবিত্রীজপশীল মনুষ্য স্বর্গলাভ করে এবং সাবিত্রীজপশীল ব্যক্তিই কেবল মোক্ষপ্রাপ্তির উপায় জানিতে পারে।
তাৎপর্যঃ— মূল শ্লোকেই মানব শব্দটা আছে যার মানে হলো নির্দিষ্ট কোন বর্ণের জন্য গায়ত্রী মহামন্ত্র নয় বরং সকল মানুষের জন্যই গায়ত্রী মহামন্ত্র৷
"দেবো দানাদ্বা দীপনাদ্বা দ্যোতনাদ্বা দ্যঃস্থানে
ভবোতীতি বাঃ" (নিরুক্তকার যাস্ক, ৭।৪।১৫.)
অনুবাদঃ— যাহা দাতা প্রদীপক দ্যোতক বা দুঃস্থানীয়
পদার্থ তাহাই দেব।
তাৎপর্যঃ— পরমাত্মা দাতা, জ্ঞানের উদ্দীপক ও দ্যোতক এই অর্থে তিনি দেব।
গায়ত্রীচ্ছন্দসাং মাতেতি
(নারায়ণোপনিষদ, ৩৪)।
অনুবাদঃ— গায়ত্রী সকল বেদের মাতা।
সর্ববেদ সারভূতা গায়ত্র্যাস্তু সমর্চ্চনা
ব্রহ্মাদয়েপি সন্ধ্যায়াং তাং ধ্যায়ন্তি জপন্তি চ।
(দেবী ভাগবত, ১১/১৬/১৫)।
অনুবাদঃ— গায়ত্রীর উপাসনা সমস্ত বেদের সারভূত। ব্রহ্মাদি দেবতাও সন্ধ্যাকালে গায়ত্রীর ধ্যান আর জপ করেন।
(দেবী ভাগবত, ১২/৮/৮৯) তে বলা হয়েছে গায়ত্রীর উপাসনা বেদে নিত্য করণীয়।
ততশ্চ লব্ধসংস্কারৌ দ্বিজত্বং প্রাপ্ত সুব্রতৌ।
গর্গাদ যদুকুলাচার্যাদ্ গায়ত্রং ব্রতমাস্থিতৌ।।
(ভাগবত ১০।৪৫।২৯)
অনুবাদঃ— এইপ্রকার শ্রীকৃষ্ণ এবং বলরাম যদুকুলাচার্য গর্গের নিকট উপনয়ন সংস্কার প্রাপ্ত হয়ে দ্বিজত্বে উপনিত হলেন এবং গায়ত্রী ধারণ ধারণপূর্বক ব্রহ্মচর্য ব্রতে স্থিত হলেন।
(গীতা ১৬/২৩-২৪) এই বলা হয়েছে ধর্ম-অধর্ম নির্ধারণে বৈদিক শাস্ত্রই প্রমাণ।
গায়ত্রী মন্ত্রের বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য—
পদচ্ছেদ: ওঁ-পরমাত্মা, ভূঃ-প্রাণস্বরুপ, ভূবঃ-দুঃখনাশক, স্বঃ-সুখস্বরুপ, তত্-সেই, সবিতু-সমগ্র জগতের সৃষ্টিকর্তা, বরেণ্যম-বরণযোগ্য সর্বোত্তম, ভর্গো-পাপ নাশক, দেবস্য-সমগ্র ঐশ্বর্য দাতা, ধীমহি-ধারণ করি, ধিয়ঃ-প্রজ্ঞাসমূহকে, য়ঃ-যিনি, নঃ-আমাদের, প্রচোদয়াত্-সত্য জ্ঞান প্রদান করুক।
অনুবাদ— পরমাত্মা প্রাণস্বরুপ, দুঃখনাশক ও সুখস্বরুপ। সেই জগতসৃষ্টিকারী ও ঐশ্বর্যপ্রদাতা পরমাত্মার বরণযোগ্য পাপ-বিনাশক তেজকে আমরা ধারণ করি। তিনি আমাদের বুদ্ধিকে শুভ গুণ, কর্ম ও স্বভাবের দিকে চালনা করুক। গায়ত্রী মন্ত্রের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণঃ (ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ ) ভূঃ -পৃথিবী, ভুবঃ-সূর্য, স্বঃ-ছায়াপথ বা আকাশগঙ্গা এই টার্মগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। যখন একটি ফ্যান ৯০০ আরপিএম গতিতে ঘুরে, এটি বাতাসের মধ্য দিয়ে একটি শব্দ উৎপন্ন করে। একইভাবে যখন অসীম গ্রহমণ্ডলী, সৌর সিস্টেম, ছায়াপথ প্রতি সেকেন্ডে ২০,০০০ বার গতিতে ঘুরে,তারা একটি শব্দ উৎপন্ন করে। ঋষি বিশ্বামিত্র ধ্যানের মাধ্যমে এই শব্দ শুনতে চেষ্টা করেন এবং ঘোষণা করেন যে, এই শব্দ ঐশ্বরিক ওম্। ঐ প্রজন্মের ঋষিরা সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই ওম এই সৃষ্টিতে সবসময় উৎপাদিত হয় এবং বিদ্যমান থাকে এবং নাকি ঈশ্বরের একটি উপায় তার সৃষ্টির সাথে যোগাযোগ করার। এমনকি গীতায়, শ্রীকৃষ্ণ ঘোষণা করেন যে, ঈশ্বরকে ওম ইতি একক্ষরম ব্রহ্ম হিসেবে, এটি দ্বারা বুঝায় যে ওম ছাড়া ঈশ্বরকে পূজা করার মত আর কোন আকৃতি নেই। যোগী এই শব্দকে “উদগীত নাদ” হিসেবে বলেন যা ধ্যানের সময় সমাধিতে পৌঁছানোর জন্য জপ করা হয়। এটা অন্য সব বৈদিক মন্ত্রের শুরুতে সংযোজন করা হয়।
(তৎ সবিতুর্বরেণ্যং) তৎ-স্রষ্টা, সবিতুর-সূর্য নামক একটি গ্রহ যা সংস্কৃত অর্থ মতে সূর্যের সমার্থক, বরেণ্যম-তার সামনে নত হওয়া। এর মানে হল যে, আমরা স্রষ্টার সামনে নত হচ্ছি যার শব্দ ওম এবং যাকে অসীম গ্রহমণ্ডলী থেকে আগত আলোর মত দেখায়। (ভর্গো দেবস্য ধীমহি) ভর্গো-আলো, দেবস্য-দেবতা, ধীমহি-তাকে উপাসনা করা। যা অর্থ আমাদের আলো রুপে ঈশ্বরের উপাসনা করার প্রয়োজন। (ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ) ধিয়ো-জ্ঞান, য়ো-কেবা, নঃ-আমাদেরকে, প্রচোদয়াৎ- যথাযথ মাধ্যম/পথে। যার মানে যিনি আমাদের জ্ঞান দান করে থাকেন বা আমাদের জ্ঞান লাভ করতে সঠিক দেখান, সেই ঈশ্বর। এভাবে ঘুরন্ত অসীম ছায়াপথ থেকে নির্গত শক্তি এই সৃষ্টির সবদিকে ছড়িয়ে আছে বলে তাঁকে প্রনব বলা হয়। এই অনুরূপ K.E. = 1/2 mv2. বেদের অনেক মন্ত্রের আগে তাই এই শক্তিশালী ওম্ যুক্ত করা হয়েছে এবং বিশ্বের এমনকি অনেক রিলিজিওনেও এই শব্দ সামান্য পরিবর্তন করে যোগ করেছেন এবং তাদের প্রার্থনায়ও যুক্ত করেছেন। প্রস্তুত করেছেন শ্রী প্রসেনজিত।
গায়ত্রীকে বিভূতি বলেছেন কারণ বেদে যত ছন্দোবদ্ধ ঋক্ রয়েছে তাতে গায়ত্রীরই প্রাধান্য। মহাকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গায়ত্রী মন্ত্রের নিম্নলিখিত অনুবাদ করেছেন—
"যাঁ হতে বাহিরে ছড়ায়ে পড়িছে পৃথিবী আকাশ তারা,
যাঁ হতে আমার অন্তরে আসে বুদ্ধি চেতনা ধারা—তাঁরি পূজনীয় অসীম শক্তি ধ্যান করি আমি লইয়া ভক্তি"।
ছান্দেগ্য উপনিষদ্ —
গায়ত্রী বা ইদং সর্বং ভুতং যদিদং কিঞ্চ বাগ্বৈ গায়ত্রী।
বাগবা ইদং সর্ব ভুতং গায়তি চ ত্রায়তে চ।।
(ছান্দোগ্য উপনিষদ ৩/১২/১)
অনুবাদঃ— এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যাহাই কিছু দেখা যায়, তাহার মধ্যে বাণীরাজ রাজেশ্বরী গায়ত্রীগুরু বাণীই সর্বশ্রেষ্ঠ। সমস্ত সংসারের সকলেরই একই মান্যতা। কেবল গায়ত্রী মন্ত্রই সকলেরই একমাত্র মুক্তির পথ।
"ভারতবর্ষকে জাগানোর জন্য বেদের গায়ত্রী মন্ত্র এত সরল যা এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করা যায় এবং গায়ত্রী মন্ত্র দ্বারাই সকলের অধ্যাত্মিক ও ভৌতিক উভয়বি কল্যাণ লাভ করা যায়।" (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এই মন্ত্রে পদ্যে যে বঙ্গানুবাদ করেছেন—
তিমির-রূপিনী নিশা–সবিতা-সুন্দর! সে তিমিরে তোমার সৃজন, বিমল উজল আলো’ সৌন্দর্য-আধার! ফুল্ল-ঊষা–অপূর্ব-মিলন। কুসুমিতা বসুন্ধরা-দ্যু-লোক আলোক-ভরা-জনয়িতা-সবিতা-সবার! বরণীয়-রমণীয় নিত্য জ্ঞানাধার!
নাস্তি গঙ্গা সমং তীর্থং ন দেব কেশবাৎ পরঃ।
গায়ত্র্যাস্তু নরং জপ ভূতং ন ভবিষ্যতি।।
(বৃহৎযোগী যাজ্ঞবল্ক্য, ১০/১০)
অনুবাদঃ— গঙ্গার সমান তীর্থ নেই, গায়ত্রীর চেয়ে বড় জপনীয় মন্ত্র নেই।
"গায়ত্রী মন্ত্রের মত সর্বশ্রেষ্ঠ মন্ত্র কখনোই নেই, আর এই রকম মন্ত্র কোনোদিন হবেও না, এবং উপনিষদ্ যেমন বেদের সার তেমনি গায়ত্রী মন্ত্র ও সকল বেদের সার।" (মহাঋষি যাজ্ঞবল্ক্য)
গীতায় গায়ত্রী মন্ত্র নিয়ে—
बृहत्साम तथा साम्नां गायत्री छन्दसामहम् ।
मासानां मार्गशीर्षोऽहमृतूनां कुसुमाकर: ।।
(Gita 10/35)
বৃহৎসাম তথা সাম্নাং গায়ত্রী ছন্দসামহম্ ।
মাসানাং মার্গশীর্ষোঽহমৃতূনাং কুসুমাকরঃ ॥
(গীতা ১০-৩৫)
অনুবাদঃ— এইরূপ আমি গানযোগ্য শ্রুতিসমূহের মধ্যে বৃহৎসাম ছন্দগুলির মধ্যে গায়ত্রী মাসগুলির মধ্যে অগ্রহায়ণ মাস ঋতুগুলির মধ্যে বসন্ত ঋতু আমিই হই।
বৃহত্সাম = the BrAhat-sama
তথা = also
সাম্নং = of the Sama Veda songs
গায়ত্রী = the Gayatri hymns
ছন্দসাং = of all poetry
অহং = I am
মাসানাং = of months
মার্গশীর্ষঃ = the month of November-December
অহং = I am
ঋতূনাং = of all seasons
কুসুমাকরঃ = spring.
Translation
"The barahat-sama also of the sama veda songs. the gayatri hymns of all poetry. I am of months. the month of November-December. I am of all seasons spring."
"Amongst the hymns in the Sāma Veda know me to be the Brihatsama; amongst poetic meters I am the Gayatri. Of the twelve months of the Hindu calendar I am Margsheersh, and of seasons I am spring, which brings forth flowers."
সকল বৈদিক শাস্ত্র তথা গীতা গায়ত্রী মন্ত্রকে একবাক্য মহামন্ত্র স্বীকৃতি দিয়েছেন। গীতার ১০/৩৫ বলা হয়েছে, ছন্দ (মন্ত্র) সমূহে মাঝে আমি (পরমাত্মা) গায়ত্রী। অর্থাৎ, পৃথিবীতে যত মন্ত্র আছে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে গায়ত্রীকে স্থান দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও গীতার ৮/১৩ শ্লোকে ওঁ-কার জপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র বেদের সর্বশ্রেষ্ঠ মন্ত্র বলা হয়েছে এই গায়ত্রী মন্ত্রকে। এই মন্ত্রের দেবতা সবিতা দ্রষ্টা ঋষি বিশ্বমিত্র।
(সবিতা) গায়ত্রী মন্ত্রের মূর্তিকল্প—
দেবী গায়ত্রীর তিন রূপ। সকালে তিনি ব্রাহ্মী; রক্তবর্ণা ও অক্ষমালা-কমণ্ডলুধারিনী। মধ্যাহ্নে বৈষ্ণবী; শঙ্খ, চক্র, গদা ধারণকারিনী। সন্ধ্যায় শিবানী; বৃষারূঢ়া, শূল, পাশ ও নরকপাল ধারিনী এবং গলিত যৌবনা। শব্দ-কল্পদ্রুম অনুসারে, যজ্ঞকালে একবার ব্রহ্মার স্ত্রী সাবিত্রী একা যজ্ঞস্থলে আসতে অস্বীকৃত হলে, ব্রহ্মা ক্রুদ্ধ হয়ে অন্য নারীকে বিবাহ করে যজ্ঞ সমাপ্ত করার পরিকল্পনা করেন। তাঁর ইচ্ছানুসারে পাত্রী খুঁজতে বের হয়ে এক আভীরকন্যাকে (গোয়ালিনী) পাত্রী মনোনীত করেন ইন্দ্র। বিষ্ণুর অনুরোধে তাঁকে গন্ধর্ব মতে বিবাহ করেন ব্রহ্মা এই কন্যাই গায়ত্রী।
গায়ত্রীর ধ্যানে আছে, তিনি সূর্যমণ্ডলের মধ্যস্থানে অবস্থানকারিনী, বিষ্ণু বা শিবরূপা, হংসস্থিতা বা গরুড়াসনা বা বৃষবাহনা। তিনি একাধারে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব। হিন্দু বিধান অনুসারে, সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় গায়ত্রী ধ্যান করতে হয় এবং এই মন্ত্র ধ্যান বা পাঠে মুক্তি প্রাপ্ত হয় বলে এর নাম ‘গায়ত্রী’। বেদজ্ঞ আচার্যের কাছে এই মন্ত্রে দীক্ষিত হলে তাঁর পূণর্জন্ম হয় ও তিনি দ্বিজ নামে আখ্যাত হন। সেই কারণে দ্বিজ অর্থাৎ ব্রাহ্মণগণের উপাস্য। বৈদিক গায়ত্রী মন্ত্রে আদলেই অন্যান্য দেবতার গায়ত্রী রচিত হয়েছে, দ্রষ্টব্য গণেশ, কালী, গুহ্যকালী, নারায়ণ, রাধা নামে হলো প্রভৃতি।
ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি
জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব
লেখকঃ— শ্রী বাবলু মালাকার
সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, চট্টগ্রাম।

0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার