সনাতন ধর্মের বৈদিক বেদ-বেদাঙ্গ ও বেদান্ত ‘দর্শন করেন এবং তপস্যার গভীরে ঋষিদের কাছে স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মবাণী বেদ স্বয়ং আগমন করেন বলেই এইজন্য তাঁদের ঋষি বলা হয়। কারণ তপস্যার ও সাধনা, ভক্তি ও জ্ঞানের বিকাশ দ্বারা নিরকার ও সাকার ঈশ্বর শক্তিকে অনুভব করেন যারা তাঁরাই ঋষি। সনাতন এর সমস্ত দর্শন এই ঋষিদের জ্ঞান দ্বারা সমৃদ্ধ। প্রতিটি যুগ ধর্মে প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন সর্বপরি ধর্ম শিক্ষা ও প্রচারে তাঁদের ভূমিকা ছিল।
আমাদের সনাতন ধর্মে বৈদিক বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত ‘দর্শন করেন এবং তপস্যার গভীরে ঋষিদের কাছে স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মবাণী বেদ স্বয়ং আগমন করেন ঋষিদের কাছে বেদবাণী ছবির মতো ভেসে ওঠে ধ্যানের গভীরে তাই এই বেদবাণী দর্শনের জন্যই তাঁদের মন্ত্রদ্রষ্টা বলা হয়, মন্ত্রস্রষ্টা নয়।
(পরাশর সংহিতায়, ১/২০) বলা হয়েছে—
‘ন কশ্চিৎ বেদকর্তাস্তি’।
অর্থাৎ— কোন মানুষ বেদের রচয়িতা নয়, স্বয়ং ঈশ্বরই এর রচয়িতা।
দ্রষ্টা ঋষিরা অমৃতময় বেদকে শিষ্য পরম্পরায় শ্রুতির মাধ্যমে শিখিয়ে দিতেন। এভাবেই শ্রুতি পরম্পরায় বেদ ধরা ছিল বহুদিন। একারণেই এর অন্য নাম শ্রুতি।’
বেদের সুবিখ্যাত ব্যাখ্যা যাস্কাচার্যকৃত নিরুক্তে লেখা হয়েছে—
"ঋষয়ো মন্ত্রদ্রষ্টারঃ। ঋষির্দর্শনাৎ স্তোমান্ দদর্শেত্যৌপমন্যয়বঃ।
তদ্ য়দেনাংস্তপস্যমানান্ ব্রহ্ম স্বয়ংভ্বভ্যানর্ষৎ
তদৃষীণাম্ ঋষিত্বমিতি বিজ্ঞায়তে। (নিরুক্ত, ২/১১)
অর্থাৎ— ঋষি বেদমন্ত্রের দ্রষ্টা। ঔপমন্যব আচার্যও একইভাবে বলেন বেদের স্তুতি বা মন্ত্রসমূহের বাস্তবিক অর্থের সাক্ষাৎকারকেই ঋষি বলা হয়। তাঁরাই ঋষি হন যারা স্বয়ম্ভু ঈশ্বরের নিত্য জ্ঞান বেদের অর্থ তপস্যার মাধ্যমে জানতে পারেন। যদি বেদ মন্ত্রের রহস্য সহিত অর্থের দর্শন হয় তবেই ঋষিত্ব লাভ হয়।
ঔপমন্যব আচার্যের উক্ত মতের প্রতিফলন পাওয়া যায় (তৈত্তিরীয় আরণ্যকের, ২/৯/১) এর
“অজাত্ হ বৈ পৃশ্নীংস্তপস্যমানান্ ব্রহ্ম স্বয়ম্ভ্বভ্যানর্ষত্ ত ঋষয়োঅভবন্ তদৃষীণামৃষিত্বম্”
(শতপথ ব্রাহ্মণ, ৬/১/১/১) বলা হয়েছে—
"তে য়ত্ পুরাস্মাত্ সর্বস্মাদিদমিচ্
ছন্তঃ শ্রমেণ তপসারিষংস্তস্মা দৃষয়ঃ।।"
অর্থাৎ— যে তপস্বীর, তপ বা ধ্যানের মাধ্যমে স্বয়ম্ভুর নিত্যবেদের অর্থজ্ঞান হয় তাঁকে ঋষি বলা হয়।
একই কথা ব্যক্ত হয়েছে তৈত্তিরীয় সংহিতা, ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, কাণ্ব সংহিতা, শতপথ ব্রাহ্মণ এবং সর্বানুক্রমণীর মত প্রাচীন গ্রন্থে।
"সাক্ষাত্কৃতধর্মোণ ঋষয়ো বভূবুস্তেহবরেভ্যোহসাক্ষাত্ কৃতধর্মস্য উপদেশেন মন্ত্রানসম্প্রাদু ; (নিরুক্ত ১/১৯)
অর্থাৎ— তপের বল দ্বারা যারা ধর্মের সাক্ষাৎ করেছেন তারাই (ধর্মের সাক্ষাৎ দ্রষ্টা ঋষি)। আর তাহারাই যারা ধর্মের সাক্ষাৎ করে নি তাদের উপদেশ দিয়েছেন।
যাস্কাচার্যকৃত নিরুক্তে— ঋষিদের এরূপ প্রসংশা যে, নানা প্রকার অভিপ্রায় দ্বারা ঋষিদের মন্ত্রদর্শন হয় (ঋষিণাং মন্ত্রদৃষ্টয়ো ভবন্তি ; নিরুক্ত ৭/৩)। ঋষিদের নানা প্রকার দৃষ্টির তাৎপর্য এই যে, তাদের বৃহৎ পুরুষার্থ দ্বারা মন্ত্রের ঠিক ঠিক প্রকার সাক্ষাৎ হয়।
ঋষির সংজ্ঞা
"ঋষি" 'ঋষ্' ধাতু থেকে ঋষি শব্দটি নিষ্পন্ন।
'ঋষ' ধাতুর অর্থ দেখা বা দর্শন করা। ঋষি মানে যিনি দেখেন- জগদ্-ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু দুচোখ ভরে দেখছেন 'দিবীব চক্ষুরাততম'।
অধুনিক কালে দেখা যায় অনেকের নামের আগে ঋষি, মহর্ষি ইত্যাদি লাগাতে। তারা নিজেদের বৈদিক বলেও থাকে। সনাতন ধর্মের শাস্ত্রের মধ্যে ঋষি বলে কাকে স্বীকৃতি দিয়েছে সেটা দেখা যাক—
(নিরুক্ত, ০২/০১/১১/০৬) যাস্কাচার্যকৃত নিরুক্তে বলেছেন—
তদ্যদেনাংস্তপস্যমানান্ ব্রহ্ম স্বয়ম্ভ্বভ্যানর্ষত্ত ঋষয়োহভবংস্তদৃষীণামৃষিত্বমিতি বিজ্ঞায়তে।।
অর্থাৎ— দর্শন করে বলেই তাঁদের ঋষি বলা হয়। তপস্যার গভীরে ঋষিদের কাছে স্বয়ম্ভূ বেদ স্বয়ং আগমন করে এজন্যই তাঁদের ঋষি বলা হয়।
ঋষিদের বলা হয়- সাক্ষাৎকৃতধর্মাণ অর্থাৎ যাঁরা অখিল ধর্মের মূল বেদকে সাক্ষাৎ দর্শন করেছেন, তাই তাঁরাই ঋষি।
"ব্রহ্মর্ষি, দেবর্ষি, মহর্ষি, পরমর্ষি, কান্ডর্ষি, শ্রুতর্ষি, রাজর্ষি” এই শব্দ গুলোর সঠিক অর্থ কি?
ব্রহ্মর্ষি– ব্রহ্ম বা ঈশ্বর সম্পর্কে যাঁদের বিশেষ জ্ঞ্যান আছে তারা ব্রহ্মর্ষি।
দেবর্ষি– যিনি দেবতা হয়েও ঋষি তিনি দেবর্ষি।
মহর্ষি– ঋষিদের মধ্যে যারা প্রধান ও মহান তারা মহর্ষি।
পরমর্ষি– পরম ব্রহ্মকে যিনি দর্শন করেছেন তিনি পরমর্ষি।
কাণ্ডর্ষি – বেদের দুইটি কান্ড- কর্মকাণ্ড ও জ্ঞ্যানকান্ড। কর্মকাণ্ডে আছে যাগ-যজ্ঞের কথা আর জ্ঞ্যানকান্ডে আছে জ্ঞ্যানের কথা, ব্রহ্মের কথা। বেদের কোন কান্ড সম্পর্কে জ্ঞ্যানী ঋষিদের বলা হয় কান্ডর্ষি।
শ্রুতর্ষি– বেদ ঈশ্বরের বাণী। ঋষিরা তপস্যা করে বেদ মন্ত্র লাভ করেছেন। কিন্তু এভাবে সকল ঋষি বেদ মন্ত্র লাভ করেন নি। কেউ কেউ অন্য ঋষির কাছ থেকে শুনেছেন। যারা শুনে শুনে বেদ মন্ত্র লাভ করেছেন তারাই শ্রুতর্ষি।
রাজর্ষি– রাজা হয়েও যিনি ঋষি তিনি রাজর্ষি। তিনি ঋষির মতোই জ্ঞান থাকে যে ঋষির মতোই আচরন করেন।
ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ
জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন ধর্মের প্রচারক)
পবিত্র বেদের বাণী পেতে আমাদের পেইজ গুলো ভিজিট করুন—
☞ www.facebook.com/পবিত্র বেদ
☞ www.facebook.com/বেদ

0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার