যুক্তি ও শাস্ত্র মতে এই বিষয়গুলোর উত্তর নিচে দেওয়া হয়েছে—
০১. ওঁ শব্দের অর্থ কি?
উত্তরঃ- প্রণব বা ত্র্যক্ষর। (ওঁ-প্রণব (ব্রহ্ম) ব্রহ্মের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ বেদ।
০২. তৎ শব্দের অর্থ কি?
উত্তরঃ- তাহার। (তৎ-জীব) জীবের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ ব্রহ্মজ্ঞ।
০৩. সৎ শব্দের অর্থ কি?
উত্তরঃ- সত্ত্বাযুক্ত। (সৎ-জগৎ) জগতের কর্মময়। কর্মের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ যজ্ঞ।
০৪. ওঁ তৎ সৎ এই শব্দের মানে কি?
উত্তরঃ- ঈশ্বরই একমাত্র সত্য।
০৫. ব্রহ্মজ্ঞ ও যজ্ঞকে কি বুঝা যায়?
উত্তরঃ- ওঁ -প্রণব (ব্রহ্ম), তৎ-জীব, সৎ-জগৎ। ব্রহ্মের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ বেদ। জীবের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ ব্রহ্মজ্ঞ। জগৎ কর্মময়। কর্মের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ যজ্ঞ। সুতরাং, “ওঁ তৎ সৎ” বেদ মন্ত্রে, ব্রহ্মজ্ঞ ও যজ্ঞকে বোঝায়। তাই, আমাদের সকল কাজের শুরুতেই “ওঁ তৎ সৎ” উচ্চারণ করে শুরু করা উচিৎ।
ওঁ তৎ সৎ = এর #মানে কি ?...
স্রষ্টা সৃষ্টির মূল উৎস। সৃষ্টির মাধ্যমেই তাহার পরিচিতি। সৃষ্টির মধ্যেই তাহার পরিপুর্ণতা। জীব ও জগৎ লইয়াই সৃষ্টি। ঈশ্বর, জীব ও জগৎ এই তিন মিলিয়া এক অখণ্ডতা = ব্রহ্মের সমগ্রতা। এই সমগ্রতার প্রকাশক " ওঁ তৎ সৎ" - এই মন্ত্র।
ওঁ = প্রণব , ব্রহ্ম ।
তৎ = জীব ।
সৎ = জগৎ ।
ব্রহ্মের শ্রেষ্ট প্রকাশ বেদ। জীবের শ্রেষ্ট প্রকাশ ব্রহ্মজ্ঞ। জগৎ কর্মময়। কর্মের শ্রেষ্ট প্রকাশ যজ্ঞ। সুতরাং " ওঁ তৎ সৎ " মন্ত্রে বেদ, ব্রহ্মজ্ঞ ও যজ্ঞ বুঝায়।
হিন্দুদের গোত্র রহস্যঃ—
গোত্র শব্দটির অর্থ বংশ বা গোষ্ঠীকে বুঝায়। সনাতন ধর্মে গোত্র মানে একই পিতার ঔরষজাত সন্তান-সন্ততি (সমূহ) দ্বারা সৃষ্ট বংশ পরম্পরা। বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে, একটি বংশের রক্ত প্রবাহিত হয় পুরুষ পরম্পরায়। সূতরাং, বংংশের রক্তের ধারক ও বাহক হলো পুরুষ। সনাতন ধর্মের বংশ রক্ষার ধারায় ছিলেন প্রথম সত্য যুগের শুরুতে ব্রহ্মার মানস সন্তানদের মধ্যে অন্যতম ঋষিগণ। পরবর্তীতে অন্যান্য ঋষির বশ পরম্পরাও পরিলক্ষত হয়।
এই একেকজন ঋষির বংশ পরম্পরা তাঁদের নামে একেকটি গোত্র হিসেবে পরিচিত লাভ করে। সে হিসেবে একই গোত্রের বংশীয়গণ পরস্পর ভাইবোন। এমনকি একই বংশের স্বজনেরা পরবর্তীতে জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে, সাধন-ভজন, পরমেশ্বর ভগবানের বাণী প্রচারের প্রয়োজনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লে পিতার নামের সাথে গোত্র নামের গুরুত্ব প্রকাশ পায়। যেমন- ঋষি কশ্যপ মুনির বংশধরেরা নিজেদের “কাশ্যপ গোত্রস্য” বা কশ্যপ মুনির বংশ পরিচয় দিয়ে থাকেন।
এভাবে পর্যায়ক্রমে আরো অনেক গোত্রের নাম পাওয়া যায়। সনাতন ধর্মে প্রকট আছে/অহরহ যেসব গোত্র দেখা যায় তা হলো কাশ্যপ গোত্র, ভরদ্বাজ গোত্র, বশিষ্ট গোত্র, বৃহস্পতি গোত্র, বিশ্বামিত্র গোত্র, জামদগ্ন্য গোত্র, শিব গোত্র, মৌদগল্য গোত্র, ভার্গব গোত্র, শান্ডিল্য গোত্র, আলিমান গোত্র ইত্যাদি। একই গোত্রের লোকজনকে সমগোত্র বলা হয়। সোজা কথা এরা পরস্পর নিকট-আত্মীয়। আর অন্যান্য গোত্রের লোকজনের সাথে তাঁরা পরস্পর আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ এই কারণে যে, আমরা সবাই প্রপিতামহ ব্রহ্মা থেকে এসেছি যদিও আমাদের আদি পিতা-মাতা যথাক্রমে মনু ও শতরূপা।
সমগোত্র কি এবং কেন?
সমগোত্র মানে একই পিতৃবংশ। যেমন কাশ্যপ গোত্র। মুনি কশ্যপ ঋষির বংশধর। ব্রহ্মার মানস পুত্রগণের থেকে আগত প্রতিটি বংশ এক একটি গোত্র বা রক্তের ধারায় প্রবাহিত। একই গোত্র চারটি বর্ণে থাকতে দেখা যায়। কারণ, একই ঋষির সন্তানরা একেক সময়ে একেক কাজে মনোযোগী হয়ে থাকে। যে শাস্ত্র অধ্যয়ণ বা বুদ্ধিভিত্তিক (আধুনিক সমাজে যাকে বুদ্ধিজীবি বলা হয়) জীবিকা অবলম্বন করে সে ব্রাহ্মণ হিসেবে, রাজধর্ম পালনকারী ক্ষত্রিয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগী হলে সে বৈশ্য আর এসব পেশাগত লোকদের সেবা করেই সন্তুষ্ট অর্জনে আগ্রহীরা শুদ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে থাকে। এ গুণাবলীসমূহ কেউ জন্মে প্রাপ্ত হয় না, অর্জন করতে হয়। তাই বর্নাশ্রম সঠিক কিন্তু বর্ণপ্রথা ভুল ও মিথ্যা যা ক্ষত্রিয় ধর্ম পালনে পুরোপুরি অপারগ রাজা বল্লাল সেন তার রাজ-অপকর্ম ঢাকতে শুরু করেছেন। ধার্মিক ও পন্ডিতদের অত্যাচার করে রাজ্য থেকে বিতারিত করে। আর এটা পুরোপুরি ইমপ্লিমেন্টেশন করেছেন তারই পুত্র রাজা লক্ষ্মণ সেন। অবশ্য বিষ্ণুপূরাণ ও ভবিষ্যপূরাণে উল্লেখিত অপকর্ম করার সাজা হিসেবে যথারীতি পরবর্তীতে শোচনীয় পরাজয় পূর্ভক রাজ্য হারাতে হয়েছ তাকে!
সনাতন ধর্মে নিকটাত্মীয় বা সমগোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ। কারণ হিসেবে বৈদিক শাস্ত্রসমূহ বিশেষ করে মনুসংহিতায় বলা হচ্ছে, একই রক্তের সম্পর্কের কারো সাথে বিবাহ হলে সন্তান বিকলাঙ্গ, শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী, মেধা ও বুদ্ধিহীন হয়। শিশু নানা রোগে জরাজীর্ণ হয়ে থাকে। তবে একান্তই প্রয়োজন হলে/ পাত্র-পাত্রী না পাওয়া গেলে ১৪ জ্ঞাতি-গোষ্ঠি পেরিয়ে গেলে তখন বিবাহ করা যেতে পারে। তবে তা যথাসম্ভব এড়িয়ে চললেই ভালো।
চিকিৎসা বিজ্ঞানও এটি স্বীকার করেছে। তারা বলছেন, নিকটাত্মীয় বা কাজিন যেমন-কাকাতো/চাচাতো, মামাতো, মাসতুতো/খালাতো, পিসতুতো/ফুফাতো ভাই-বোনদের মধ্যে বিয়ের পরিণামে যে সন্তান হয়, তার মধ্যে জন্মগত ত্রুটি দেখা দেয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। ”দ্য ল্যানসেট” সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বিজ্ঞানীরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
ॐ এর মূল ব্রহ্ম, বিষ্ণু, শিব।
🚩মূল পর্ব ঈশ্বর🚩
পরংব্রহ্ম
⏬
⏬
পরমেশ্বর
⏬
⏬
মহেশ্বর/ ঈশ্বর
⏬
⏬
মনুষ্যজাতি
পরংব্রহ্মঃ—
ব্রহ্মাণ্ডের মূল হোতা ও স্রষ্টা, যে নিরাকার এবং যাঁর কোনো প্রকার বা প্রকাশ নেই কিন্তু যখন মহর্ষি বেদব্যাস সনাতন ধর্ম শাস্ত্র গ্রন্থকে পবিত্র (বেদ) কে শ্রুতি থেকে স্মৃতিতে আবদ্ধ করে তখন এই পরংব্রহ্মকে "ওম্" বলে প্রকাশিত করে। যদিও "ওম্" তাঁর হাজার কোটি বছর আগের থেকে বিদ্ধমান ছিল, কিন্তু সেই "ওম্" জ্ঞান শুধুমাত্র ধ্যানী যোগী অর্থাৎ ঋষি সমাজ পর্যন্ত আবদ্ধ ছিলো। অতঃপর সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে সেই পরংব্রহ্মকে প্রকাশ ও প্রচারের রুপ দেয় মহর্ষি বেদব্যাস বেদ গ্রন্থকে শ্রুতি থেকে স্মৃতিতে আবদ্ধ করে। যেমন, এই জ্ঞানকে আমরা এখন পরিপূর্ণ ভাবে জানি এবং নিজের অন্তর আত্মাতে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছি।
এই "ওঁম্" সৃষ্টির সর্বকর্তা হয়ে নিজেকে আমাদের সামনে উপস্থিত করেননি, কেন?
যা একটি বৃহৎ প্রশ্ন আমাদের বর্তমান সমাজের সামনে। এই পোষ্টের শেষে তা আপনাদের কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে। কিন্তু এখন একটি উদাহরণ দিচ্ছিঃ- বর্তমান পৃথিবীতে অনেক অনেক গ্রুপ অব কোম্পানি আছে, মনে করুন তাঁর মধ্যে যেকোনো একটি বা সবগুলোরই এক একজন চেয়ারম্যান থাকে বা আছে। কিন্তু সেই চেয়ারম্যান কি নিজে কাজ করে বা তাঁর পুরো ইন্ডাস্ট্রির সবদিক পরিচালনা করে "না"। তখন সর্বপ্রথম সেই চেয়ারম্যান তাঁর কোম্পানি পরিচালনার জন্য একজন ডিরেক্টর (পরিচালক) নিয়োগ করে। আর সেই পরিচালকের নাম হচ্ছে "পরমেশ্বর"।
পরমেশ্বরঃ—
এই পরমেশ্বরের প্রকাশ উপস্থাপনার আগে আরেকটি সৃষ্টিকার্য সম্পাদনা হয়েছে যায় নাম আদিশক্তি। যেমন সনাতন সকল শাস্ত্র গ্রন্থের মধ্যে সৃষ্টিপর্ব উল্লেখিত আছে কিন্তু একমাত্র শক্তিপুরাণে সৃষ্টিতত্ব নিহিত করা হয়েছে।
আর শক্তিপুরাণ মতে- "ওম্" পরংব্রহ্ম থেকে এক জ্যেতিময় এক লোকের আবির্ভাব হয়, যে লোকের নাম শক্তিলোক। এই শক্তিলোকের পরম সত্তার নাম আদিশক্তি অর্থাৎ পরমেশ্বরী। এই সত্তা নিরাকার তাঁর কোনও সাকার সত্তা ব্রহ্মাণ্ডে নেই। এই আদিশক্তি ধরে নেওয়া যায় মহাপরিচালক (অর্থাৎ ম্যানেজিং ডিরেক্টর)। এই আদিশক্তি থেকে সৃষ্টির ত্রিশক্তির আবির্ভাব হয়, যে শক্তির নাম- ব্রহ্ম, বিষ্ণু, শিব অর্থাৎ এই মহাপরিচালক সত্তা থেকে পরিচালক নামক পরমেশ্বরের সৃষ্টি। আবার এই তিন শক্তি নিজে স্বশরীরে নিজেদের কার্যসিদ্ধি পরিচালনা করেননি।
যেমনঃ–
ব্রহ্মঃ— ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি শুরুতে যখন এই পরমেশ্বরের প্রকাশ হয় তখন এই শক্তি নিজেকে ব্রহ্মাণ্ডের স্থিতি ও জ্ঞানকে ধারণ করে। যার দরুন তিনি সৃষ্টিকার্যের দূরত্বে চলে যান। কিন্তু যেহেতু তিনি ব্রহ্মজ্ঞান পরিচালনা করছেন, তাতে কি সৃষ্টিকর্ম বন্ধকর হয়ে থাকবে "না"। এই সৃষ্টিকর্ম পরিচালনায় এক নতুন আবির্ভাব হবে যা আপনারা একটু পরে পাবেন।
বিষ্ণুঃ— এই বিষ্ণু তিনিই, যাঁকে আমরা মহাবিষ্ণু বলে জানি। এই মহাবিষ্ণুর কোনও সাকার সত্তা ব্রহ্মাণ্ডে নেই। তবে আমরা শাস্ত্র গ্রন্থমতে(উপনিষদ) জানি তিনি চতুর্ভুজধারী যাঁর একহাতে শঙ্খ, আরেক হাতে গদা, আরেক হাতে পদ্ম ও অবশিষ্ট হাত আশীর্বাদক। যেহেতু ব্রহ্ম ব্রহ্মজ্ঞান পরিচালনভার নিয়েছেন তাই সৃষ্টির পালন দায়িত্ব বিষ্ণুর উপর আসে। তখন তিনি নিজের তেজ হইতে আরো দুইটি বিষ্ণুর আবির্ভাব করেন যাদের নাম- ক্ষীরদসায়ী বিষ্ণু ও গর্ভদোকসায়ী বিষ্ণু। আবার এই মহাবিষ্ণুকে বৈষ্ণবীয় ভাষায় বলা হয় অনাদির আদি গোবিন্দ অথবা সত্য নারায়ণ।
শিবঃ— যে কালের অতীত যাঁকে মহাকাল বলা হয়। উপরোক্ত দুই শক্তি যখন নিজেদের দুই দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন এই রুদ্রের কাছে ধ্বংসকার্য অবশেষ থাকে এবং ইনি যথাযথ এই দায়ভার গ্রহণ করেন। এই রুদ্র সৃষ্টির ব্রহ্মাণ্ডে নিজের ধ্বংসকার্য পরিচালনার জন্য নিজের অঙ্গ থেকে আবির্ভাব করে মহাদেবকে অর্থাৎ যাকে আমরা শিব বলে জানি।
এই ছিল তিন শক্তির পরিচয়।
এখন আপনাদের সমীপে এই তিন শক্তির পূর্ণ প্রকাশ উপস্থাপন করছি •••
ব্রহ্ম যেহেতু ব্রহ্মজ্ঞান পরিচালনায় লিপ্ত। তখন সৃষ্টিকার্য পরিচালনার জন্য পালনকর্তা মহাবিষ্ণুর থেকে সৃষ্টি ক্ষীরদসায়ী বিষ্ণু তাঁর নাভি পদ্মমূল থেকে আবির্ভাব করে এক শক্তিকে যাঁর নাম ব্রহ্মা। এই ব্রহ্মা নিজের শক্তিতে চারপুত্রের সৃষ্টি করে, কিন্তু ঐ চারপুত্র সৃষ্টিকার্যে লিপ্ত না হয়ে ঊর্ধ্বরেতা পালন করে। তখন সৃষ্টিকার্য স্থগিত হয়। তখন ব্রহ্মা নিজের দেহকে দুইভাগে ভাগ করে, যার একভাগের নাম মনু ও অপর ভাগের নাম শতরুপা। যেই দুই থেকে আজ ব্রহ্মাণ্ড পরিপূর্ণ। আর অপর দিকে রুদ্রের আবির্ভূত শক্তি মহাদেব ধ্বংসকার্যে অসমর্থ হয় কারণ তিনি শক্তিহীন। তখন পরংব্রহ্মের সৃষ্টি শক্তিলোকের শক্তি আদিশক্তির আবির্ভাবের প্রয়োজনীয়তা হয়ে উঠে। কেননা শক্তি বিনা সৃষ্টি, ভক্তি, ব্রহ্মাণ্ড সঞ্চালন, পালন সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব। তাই আদিশক্তি নিজে পদার্পণ করতে চাইলে ব্রহ্মাণ্ড তাঁর তেজ ধারণ করতে ব্যর্থ হয়। এদিকে মহাদেব উনাকে নিজ বাহুর শক্তি রুপে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি পোষণ করে, পরমসত্তা কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন; যার থেকে আমার জন্ম তাকে শক্তিরুপে গ্রহণ করা অযৌক্তিক ও নিন্দনীয়। কিন্তু পরমসত্তা বলেন, সৃষ্টির সঞ্চালনার জন্য এবং ধ্বংসকার্যের জন্য শক্তিকে গ্রহণ করা একান্তই আবশ্যক। তখন উপায় না পেয়ে মহাদেব বললেন, ঠিক আছে আমি আদিশক্তিকে গ্রহণ করবো তবে; শতবার মানবরুপে জন্মগ্রহণ করার পরে। তখন উনার ও আমার মাতৃত্ব রেশ কেটে যাবে। তখন থেকে আদিশক্তি মানবরুপে জন্মগ্রহণ শুরু করে, যাঁর শেষ দুটি মানবজনম হলো দক্ষকন্যা সতী ও হিমাবনকন্যা পার্বতী। আর এই পার্বতীর মধ্যে তখন আদিশক্তি নিজের শতকোটি মহাবিদ্যা থেকে মাত্র দশমহাবিদ্যা স্থির করে, আর তখন থেকে দেবী পার্বতীর নাম হয় আদ্যাশক্তি; যাঁকে পরম করুণাময়ী পরমেশ্বরী বলা হয়।
এই হলো পরমেশ্বর সত্তার প্রকাশ।
এখন ঈশ্বরের প্রকাশ কিভাবে হলো •••
ঈশ্বরঃ—
পরমেশ্বর (অর্থাৎ পরিচালক) যখন একটি কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন তিনি সেই কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উচ্চ পদস্থ কিছু লোক নিয়োগ করে, যেমন:- জি এম, ডি জি এম, এ জি এম, ফ্যাক্টরি ম্যানেজার, ম্যানেজার ইত্যাদি পদসমূহ লোক নিযুক্ত করে, যাঁদেরকে আমরা দেব-দেবতা বা ঈশ্বর বলে জানি। এখন এই ঈশ্বর বা দেব-দেবতা কিভাবে বিস্তার লাভ করে •••
পুরাণসমূহের পঞ্চলক্ষ্মণের মধ্যে এক লক্ষণ হচ্ছে স্বর্গ। স্বর্গ মানে সৃষ্টি। সব পুরাণেই সৃষ্টি প্রকরণ বর্ণিত হয়েছে। এই বর্ণনা অনুযায়ী ব্ৰহ্মা প্ৰথমে সনৎকুমার, সনন্দ, সনক, সনাতন এই চার ঋষিগণকে সৃষ্টি করেন। কিন্তু তাঁরা ঊর্ধ্বরেতা থাকায় প্ৰজাসৃষ্টি হল না। তখন ব্ৰহ্মা নিজেকে দুইভাগে বিভক্ত করেন। তাঁর এক অংশ পুরুষ ও অপর অংশ স্ত্রী হল। তিনি পুরুষের নাম দিলেন মনু, আর স্ত্রীর নাম দিলেন শতরূপা। তারা পরস্পর উপস্থিত হয়ে ব্ৰহ্মাকে জিজ্ঞাসা করল–
‘পিতা কোন কর্মের দ্বারা আমরা আপনার যথোচিত সেবা করব ?’
ব্ৰহ্মা বললেন–‘তোমরা মৈথন কর্মদ্বারা প্ৰজা উৎপাদন কর। তাতেই আমার তুষ্টি।’ তখন থেকে মৈথন কর্মের প্রবর্তন হল। মনুর উল্লেখ আগেই করেছি ব্ৰহ্মার দেহ থেকে উদ্ভূত বলে এর নাম স্বয়ম্ভুব মনু। শতরূপার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। এদেরই পুত্রকন্যা থেকে মানব জাতির বিস্তার হয়। সত্য, ত্ৰেতা, দ্বাপর ও কলি- এই চার যুগে চতুৰ্দশ মনু জন্মগ্রহণ করেন। এক এক মনুর অধিকার কালকে ‘মন্বন্তর’ বলা হয়৷ এক মন্বন্তর শেষ হলে, দেবতা ও মনুপুত্ররা বিলুপ্ত হন। আবার নূতন দেবতা ও মানুষের সৃষ্টি হয়। দক্ষ রাজার অন্যতম কন্যা অদিতি হতে কশ্যপ ঋষির ঔরসে বিবস্বানের (সূর্য) জন্ম হয়। স্ত্রী সংজ্ঞার গর্ভে বিবস্বানের বৈবস্বত মনু নামে এক পুত্র হয়। এভাবে মাতা অদিতির গর্ভে থেকে আবির্ভাব হয় এঁকে এঁকে সকল দেব-দেবতার এবং ঋষি কশ্যপের অপর স্ত্রী দিতির গর্ভ থেকে জন্মনেয় অসুর দৈত্য-দানবেরা। তখন সৃষ্টির পরিচালনায় বিষ্ণু মহাদেবকে অনুরোধ জ্ঞাপন করে যে, ঋষি কশ্যপের স্ত্রী মাতা অদিতির সন্তানদের সৃষ্টিকার্যে নিয়োগ করার জন্য। অতিশয় মহাদেব প্রত্যেক অদিতি পুত্রদের অগ্নি, বায়ু, কাম, ক্রোধ, বরুণ ইত্যাদি পদে দেবরুপে নিয়োগ করে। তখন পরিপূর্ণ ভাবে সৃষ্টিকার্য শুরু হয়। অতঃপর যার যার গুরুদায়িত্ব পালন হেতু মত্যলোকের কাছে ঈশ্বর প্রাপ্তি হয় এবং পূজার অধিকার অর্জন করে।
মনুষ্য জাতিঃ—
পরংব্রহ্মের সৃষ্টি সত্তার থেকে মানুষ সৃষ্টি হয় এবং এই ঈশ্বর(দেবতা) মানবজাতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণ সরুপ বলতে গেলে, ঐ কোম্পানির লেবার (পণ্য উৎপাদক) এবং ভোক্তা(ক্রেতা) দুইয়েই হচ্ছে মানবজাতি।
মানবজাতির— বিস্তারের কিভাবে প্রকাশ হয়?
দক্ষ রাজার অন্যতম কন্যা অদিতি হতে কশ্যপের ঔরসে বিবস্বানের জন্ম হয়। স্ত্রী সংজ্ঞার গর্ভে বিবস্বানের বৈবস্বত মনু নামে এক পুত্র হয়।
পৃথিবীতে দুই রাজবংশ সৃষ্টি হয়— চন্দ্রবংশ ও সূর্যবংশ। অতঃপর সূর্যপুত্র বৈবস্বত মনু ইক্ষ্বাকুরের পিতা ছিলেন। সেই থেকে পৃথিবীতে #সূর্য বংশের সূচনা হয়।
দেখুনঃ– সূর্য বংশ।
ইক্ষ্বাকু বংশের তালিকা হলঃ–
১। ইক্ষ্বাকু ২। কুক্ষি ৩। বিকুক্ষি ৪। বাণ ৫। অনরণ্য ৬। পৃথু ৭। ত্রিশংকু ৮। ধুন্ধুমার ৯। যুবনাশ্ব ১০। মান্ধাতা ১১। সুসন্ধি ১২। ধ্রুবসন্ধি (এঁর এক ভাই ছিলেন, তার নাম প্রসেনজিৎ) ১৩। ভরত ১৪। অসিত ১৫। সগর ১৬। অসমঞ্জ ১৭। অংশুমান ১৮। দিলীপ ১৯। ভগীরথ ২০। ককুৎস্থ ২১। রঘু ২২। কল্মাষপাদ ১৩। শঙ্খণ ২৪। সুদর্শন ২৫। অগ্নিবৰ্ণ ২৬। শীঘ্ৰগ ২৭। মরু ২৮। প্রশুশ্রুক ২৯। অম্বরীষ ৩০। নহুষ ৩১। যযাতি ৩২। নাভাগ ৩৩। অজ ৩৪। দশরথ ৩৫। রাম এবং লক্ষ্মণ।
চন্দ্রবংশের দুই শাখা– পুরুবংশ ও যদুবংশ।
চন্দ্র বংশের তালিকা হলঃ—
১। দুষ্মন্ত ২। ভরত (এই ভরত থেকে ভারতবর্ষ নামকরন হয়) ৩। বুধ ৪। পুরূরবা ৫। গোপাল ৬। সত্যকাম ৭। নরুন্ধর এভাবে পর্যায়ক্রমে চন্দ্র বংশ সম্রাট অশোক পর্যন্ত আসে, চন্দ্র বংশের এই রাজা বৌদ্ধ ধর্ম অবলম্বন করে এবং বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার করে। পরে এই চন্দ্র বংশ গুপ্তবংশ উপাধি অর্জন করে। ঠিক এভাবে ধীরে ধীরে মানবজাতির বিকাশ হয় এবং মনুষ্য ব্রহ্মাণ্ডকে আলোকিত করে তুলে।
তাহলে উপরোক্ত পৌরানিক তথ্যাদি দেখার পর আমরা কি বুঝতে পারিনা কিভাবে এই পরম্পরাগত ভাবে সৃষ্টি সঞ্চালন হচ্ছে বা হয়ে আসছে?
এখন উপরোক্ত উদাহরণ স্বরুপে এবং বাস্তবিকতাই যদি বলি, একজন লেবার (মনুষ্য) তাঁর কাছে উপরোক্ত উচ্চপদস্থ কর্মচারী(ঈশ্বর) স্যার অর্থাৎ ঈশ্বর পূজনীয়, তৎসঙ্গে উচ্চপদস্থ কর্মচারীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তা (পরমেশ্বর) স্যার অর্থাৎ ঈশ্বরের ঈশ্বর পূজনীয়, তার সাথে যে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (পরমেশ্বর) সে যার অধীন অর্থাৎ চেয়ারম্যান (পরংব্রহ্ম) সে ঈশ্বরের (দেবতা) ঈশ্বর (পরমেশ্বর) তাঁর ঈশ্বর (স্বয়ং পরংব্রহ্ম) এবং ঐ পরংব্রহ্মই সর্বসত্তা, সর্বনিহিতা, সর্বদ্রষ্টা ও ভূ-তথা মহা ব্রহ্মাণ্ডের অধিষ্ঠিত কর্তা। যাঁকে আমরা ॐ"ওম্" বলে জানি, জেনেছি বা ভবিষ্যৎ জানবো। এই "ওম্"কে বেদ পুরাণ উপনিষদ ও সকল গুরুদত্তের কাব্যগ্রেন্থর মধ্যে উপস্থিত হয়েছে এবং "ওম্" নামক ঐ নিরাকার পরংব্রহ্মকে স্বীকার ও স্বীকৃতি দিয়েছেন। এই পৃথিবীতে যতবড়ই জ্ঞানী জন্ম নিয়েছেন এবং সামনের দিনগুলিতে নিবে তাঁরা কেউ সরাসরি, কেউবা কথার ছন্দে, কেউবা শব্দের খেলায় এই পরংব্রহ্মকে স্বীকার করেছেন ও করবে। যে সাকারবাদী সেও এই স্বীকারোক্তির বাইরে নয়। তাঁর দৃষ্টান্ত প্রমাণ স্বরুপ কয়েকজন শ্রেষ্ঠ গুরুদত্তের কাব্য গ্রন্থের নাম দিচ্ছি প্রয়োজন হলে দেখে নিবেন।
১. আচার্য শঙ্করের ‘শারীরিকভাষ্য’
২. আচার্য ভাস্করের ‘ভেদাভেদবাদ’
৩. আচার্য রামানুজের ‘শ্রীভাষ্য’
৪. আচার্য নিম্বার্কের ‘বেদান্তপারিজাতসৌরভ’
৫. আচার্য মধ্বের ‘পূর্ণপ্রজ্ঞাভাষ্য’
৬. আচার্য শ্রীকণ্ঠের ‘শিবাদ্বৈতবাদ’
৭. আচার্য বল্লভের ‘অনুভাষ্য’
৮. আচার্য বলদেবের ‘গোবিন্দভাষ্য’
ভগবান বা অবতার বলছি উনি কে? উনার অস্তিত্ব কি? কেন আমরা ভগবান বলছি?
সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অব্দি অনেক অবতার এসেছেন এবং আসবে কিন্তু এই যে অবতার এসেছেন তারা কি করতে এসেছেন?
উত্তরঃ– ধর্ম স্থাপনা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, অধর্মের বিনাশ করতেই অবতারের অবতরণ। একজন দেবতা সে তার কর্তব্য পালন করছে, হে সে আমাকে প্রতিপালন করছে বিধায় সে আমার পূজনীয় কিন্তু পরমসত্তা নয়। আরেক জন পরমেশ্বর, সৃষ্টির ঈশ্বরেরা যখন নিজেদের কার্যে ব্যর্থ হন অথবা পরিপূর্ণ পারদর্শী হতে অক্ষম হয় তখন সেই পরমেশ্বরকে অবতার হয়ে অবতরণ করতেই হয় সৃষ্টিকার্য পরিচালনার হেতু, এইটা সৃষ্টি এবং মনুষ্যজাতির উপরে পরমেশ্বরের কোনও কৃপা নয় বরং কর্তব্য। এমনকী সেই পরমেশ্বরের অবতারী রুপ বা সত্তা মানুষ জাতির কাছে অবশ্যই পরমেশ্বর, এতে কোনও দিধাধন্ধ থাকার প্রশ্নই আসেনা। এমন কি এজন্যই মানবজাতির কাছে পরমেশ্বর বা পরমেশ্বরের অবতার উভয়েই পূজনীয় হয়। এই ঈশ্বর বা ঈশ্বরের ঈশ্বর পরমেশ্বর উভয়ের কাছে ঐ পরংব্রহ্মই পূজনীয় এবং সর্বকর্তার কর্তা। এই কথা পরমেশ্বরের অবতার শ্রীকৃষ্ণ নিজ মুখেই বলেছেন, মহাভারতের অশ্বমেধিকপর্বে। আমি মহাভারতের অশ্বমেধিকপর্বের সেই শ্লোকটি তুলে ধরছি:-
পরম হি ব্রহ্ম কথিতং যোগযুক্তেন তন্ময়া।
ইতিহাসং তু বক্ষ্যামি তস্মিন্নর্থে পুরাতনম্।।১৩।।
(মহাভারত অশ্বমেধিকপর্ব, অধ্যায় ১৬, শ্লোক ১৩)
অর্থাৎ- হে কৌন্তেয়, যোগযুক্ত অবস্থায় আমি পরংব্রহ্মের কথায় বলেছি, এখন সেই বিষয়ে তোমাকে একটি প্রাচীন তত্ত্ব বলছি শোন। অশ্বঃ পর্ব, অঃ১৬, শ্লোঃ১৩।।
অর্থাৎ, কৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধস্থলে অর্জুনকে যে গীতাজ্ঞান দিয়েছিলেন, যুদ্ধের পরে মহাভারতের অশ্বমেধিক পর্বে বলেছিলেন যে তিনি যোগ অবস্থায় পরংব্রহ্মের বাক্য বলেছেন এবং সেই বাক্যগুলোর সারমর্ম স্বরুপ গীতা মাহাত্ম্যের প্রকাশ করে কিন্তু বর্তমান সমাজের মধ্যে এই গীতা মাহাত্ম্যের ৪৫টি শ্লোকের গ্রহণ যোগ্যতা নেই বললেই চলে। কিন্তু জন্মান্ধরা হয়তো ভুলে গেছে ঐ ৪৫টি শ্লোক ব্যতীত গীতা কোনদিনও পরিপূর্ণ নয় এবং গীতার কোনো অর্থই নেই, এক কথায় অর্থহীন একটি বইমাত্র। আবার বৈষ্ণবীয় মতবাদ নিজেদের অনুপ্রেরণায় ৪৫টি শ্লোকের পরিবর্তে ৮৫টি শ্লোকে রূপান্তরিত করেছে। যার দৃষ্টান্ত ১২০০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশ ধর্মগুরু আদি শংকরাচার্যের প্রাচীন গীতাই। আবার আরেকটি উদাহরণ দেখুন, বিষ্ণুপুরাণ বাদ দিয়ে তৈরী হলো নবনির্মিত বৃহৎ বিষ্ণুপুরাণ যেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করছে Dwarkadheeshvastu.com মায়াপুর ভারত। এইসব কি ধর্মের প্রচার নাকি নিজেকে অথবা নিজের উপাস্যকে শ্রেষ্ঠ রূপে তুলে ধরা এই তাদের কাজ একবার চিন্তা করে দেখুন!!!???
কিন্তু তারপরেও আমাদের সনাতন সমাজে দিধাধন্ধ থাকবেই। যেহেতু আমি একজন বাঙ্গালি তাই একটি বাঙ্গালির জলজ্যান্ত প্রমাণ তুলে ধরছি।
ছোটবেলা থেকে দেখেছি একটি ইসলাম ধর্মের নারী ও পুরুষ লেখাপড়া করার সময় কলা শব্দের উচ্চারণ পড়ছে যে— ক+লা= কেলা। শুনে হাসতাম ওরে জন্মান্ধ পড়ছিস ক+লা, যার উচ্চারণ হবে কলা কিন্তু মুখে বলছিস কেলা। বর্তমান আমাদের সনাতন সমাজে এতবেশি জ্ঞানী বেড়ে গেছে যে, ঠিক ঐ মুসলিমদের মতো অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরাও এখন মুখে বানান করছি ক+লা কিন্তু উত্তরে মুখের ভাষায় উচ্চারণটি বলছি "কেলা"। এই কথাটার একটি শাস্ত্রীয় প্রমাণ দিচ্ছি, যেমন:- বৈদিক মন্ত্রকে আমরা সনাতন প্রত্যেক মতবাদীরা মেনে চলেছি কিন্তু মনে হয় না। এই মন্ত্রগুলোর অর্থ জেনেছি বা জানতে চেষ্টা করেছি আমরা।
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, চট্টগ্রাম)

0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার