সনাতন ধর্মে আপন ভাইবোন, কাকাতো ভাইবোন, মামাতো ভাইবোন, পিসিতো ভাইবোন, মাসিতো ভাইবোন রক্তের সম্পর্কে বিবাহ নিয়ে শাস্ত্রীয় নিষিদ্ধ...
শরীক, সগোত্র, সপিণ্ডের মধ্যে পার্থক্য কি?
সপিণ্ড সম্পর্কে হিন্দুবিবাহ নিষিদ্ধ কেন?
শরীক কথাটা ব্যবহার হয় স্থায়ী সম্পদের অংশীদার বোঝাতে। অর্থাৎ জমি বাড়ির অংশীদার হলো শরীক।
সগোত্র-একই বংশের পুরুষানুক্রমের লোক। অর্থাৎ একই রক্তবাহী পুরুষ আত্মীয়। যেমন বাবা, জ্যেঠা, কাকা তাদের পুত্রগণ, পৌত্রগণ ইত্যাদি।
সপিণ্ড-মাতা এবং পিতা সম্পর্কিত ব্যক্তিগণ যাদের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করা হয়। একই সাথে রক্তবাহী বলে সগোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ।
সনাতন শাস্ত্র মতে একজন ছেলে বা মেয়ের যাদের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ তারা কি কি সম্পর্ক? কেনইবা বিবাহ করা অনুচিত? এদের মধ্যে কারো সাথে যদি প্রেম ভালোবাসা গড়ে উঠে তখন কি হবে?
সনাতন শাস্ত্র মতে একই গোত্রে ছেলেমেয়ের মধ্যে সনাতন ধর্মে বিবাহ নিষিদ্ধ। রক্তের কারণেই সন্তানাদি মেধা সম্পন্ন, সুন্দর হয় না। এ ছাড়া আত্মীয়ের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ। তবে গোত্র ভিন্ন হলে বিবাহ হতে পারে। ভালোবাসা যদি দৈহিক হয় তবে বিবাহ শুভ হবে না, আত্মীয়ের মধ্যে হলেও না। কারণ মোহই এখানে প্রধান, মোহ ভঙ্গ হলেই সব বিস্বাদ হয়ে যাবে।
জ্যেষ্ঠা পিশতুত বা মামাত বোনের ছেলের ঘরের নাতির সাথে ভাইয়ের ছেলের ঘরের নাতনীর বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা যায় কি?
মানবদেহে পুরুষানুক্রমে সপ্তমপুরুষ (সাতপুরুষ) পর্যন্ত একই রক্ত প্রবাহিত হয় বলে ঐ পুরুষ পর্যন্ত ছেলে মেয়ের বিবাহ নিষিদ্ধ। কিন্ত এক রক্তের কন্যার অন্যত্র বিবাহ হলে পুরুষানুক্রমিক রক্তের ভেদ সৃষ্টি হয়। তাই রক্তের দোষ না থাকলেও আত্মীয় সম্পর্কিত দোষ থাকে। তবে কন্যার বংশের তিনপুরুষ ও পাঁচপুরুষ চলে গেলে বিবাহ চলতে পারে।
পাত্র-পাত্রী নির্বাচন প্রসঙ্গে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে বৈদিক যুগে স্বগোত্রীয় এবং ভিন্ন গোত্রীয় উভয় প্রকার পাত্রীয় গ্রহনীয় ছিল। কাণ্ব শাখায় শতপথব্রাহ্মণ, গৌতম, বোধায়ন, এবং বশিষ্ঠ সগোত্রে অর্থাৎ ঘনিষ্ঠ রক্তসম্পর্কে বিশেষত পিতৃকুলে সাতপুরুষ এবং মাতৃকুলে পাঁচপুরুষের বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ঋগ্বেদেও ১০ম মন্ডলের ১০ সূক্তের সপিণ্ডে ও রক্তের সম্পর্কে মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ করেছে। পাত্র নির্বাচনে অর্থের চেয়ে বিদ্যা ও সদাচারকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে শাস্ত্রে।
মনুসংহিতা মধ্যে রক্তের সম্পর্কে বিবাহ নিয়ে কি বলেছেন দেখা যাক সনাতন শাস্ত্র কি বলেছে এই সম্পর্কে?
সনাতন ধর্ম অনুসারে একজন পুরুষ কিংবা একজন নারী কোন রক্তের সম্পর্কের ব্যাক্তিকে বিবাহ করতে পারবে না?
প্রথম বলে দেওয়া ভালো সনাতন ধর্মের নিজ বংশের মধ্যে বিবাহ সম্পূর্ন নিষিদ্ধ।
যদিও অনেকে বলে সনাতন ধর্মের এইরকম কথা কোথাও বলা হয়নি কাকে বিবাহ করবে আর কাকে করবে না?
দেখা যাক এই সম্পর্কে...
★ মনুসংহিতা ৩/৪
গুরুণামতঃ স্নাত্বা সমাবেত্তো যথাবিধি।
উদ্বহেত দ্বিজো ভার্য্যাং সবর্ণাং লক্ষাণান্বিতাং।।
অনুবাদঃ- “গুরু অনুমতি করিলে পর, সমাবর্ত্তনানস্তর বিধানানুসারে ব্রতাঙ্গ স্নান সমাপন করিয়া সেই ব্রাহ্মণাদি বর্ণত্রয় সুলক্ষণাক্রান্তা সবর্ণা স্ত্রী বিবাহ করিবেন”।
অর্থাৎ গুরু গৃহ থেকে বিদ্যা লাভ করে, গুরুদেবের অনুমতি নিয়ে বিবাহ করার কথা বলা হয়েছে।
★ মনুসংহিতা ৩/৫
অসপিন্ডা চ যা মাতুরসগোত্রা চ যা পিতুঃ।
সা প্রশস্তা দ্বিজাতীনাং দারকর্ম্মাণি মৈথুনো।।
অনুবাদঃ- “যে স্ত্রী মাতার সপিণ্ড না হয়, অর্থ্যাৎ সপ্তপুরুষ পর্য্যন্ত মাতামহাদি বংশজাত না হয় ও মাতামহের চতুর্দ্দশ পুরুষ পর্য্যন্ত সগোত্রা না হয় এবং পিতার সগোত্রা বা সপিণ্ড না হয় অর্থ্যাৎ পিতৃয়স্রাদি সন্ততি সম্ভূতা না হয়, এমন স্ত্রীই দ্বিজাতিদিগের বিবাহের যোগ্যা জানিবে”।
সপিণ্ড মানে হলো নিজ বংশ।
আর এই শ্লোকে এটা স্পস্ট যে নিজ রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বিবাহ করা যাবে না।
★ মনুসংহিতা ৩/৬
মহান্ত্যপি সমৃদ্ধানি গোহজাবিধনধান্যতঃ।
স্ত্রী সম্বন্ধে দশৈতানি কুলানি পরিবর্জয়েৎ।।
অনুবাদঃ- “গো, মেষ, ছাগ ও ধন-ধান্য দ্বারা অতিসমৃদ্ধ মহাবংশ হইলেও বিবাহ বিষয়ে এই বক্ষ্যমাণ দশ কুল পরিত্যাগ করিতে হইবে”।
এই শ্লোকের মূলকথা কোটিপতি কিংবা ধনাঢ্য ব্যক্তি হলেও স্বপিণ্ডেরর মধ্যে বিবাহ করতে পারবেনা। অন্তত দশমপুরুষ পর্যন্ত। যেমন বশিষ্ঠ সগোত্রে অর্থাৎ ঘনিষ্ঠ রক্তসম্পর্কে বিশেষত পিতৃকুলে বংশের সাতপুরুষ এবং মাতৃকুলে বংশের পাঁচপুরুষ চলে গেলে বিবাহ চলতে পারে।
ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি!
জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন ধর্মের প্রচারক)
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার