শুভ মহালয়া, শুভ মহালয়া অনেক শুনেছেন কিন্তু কেন এই মহালয়া সবাই নিশ্চিত মহালয়া মানে দুর্গাপূজার দিন গোনা, মহালয়ার ৬ দিন পর মহাসপ্তমি, তাই দেবীকে আমত্রন করা ইত্যাদি। মহালয়ার তার চেয়ে বড় গুরুত্ব আছে, সেটা কেউ কেউ জানেন, আবার কেউ কেউ জানেন না।
হিন্দু ধর্মবিশ্বাস মতে, অশুভ শক্তির বিনাশ আর ধর্ম রক্ষায় যুগে যুগে মর্ত্যলোকে দেবতাদের আবির্ভাব হয়েছে। যার ধারাবাহিকতাতেই অসুরকূলের হাত থেকে দেবগণকে রক্ষায় দেবী দুর্গার আগমন ঘটেছিল। পৃথিবীতে যখনই ব্রহ্মার বরপ্রাপ্তের মতো শক্তিশালী মহিষাসুরেরা ফিরে আসে বারবার, ধর্মের গ্লানি হয় এবং পাপ বৃদ্ধি পায়, তখন তাদের ত্রাস-সংহারে দেবীদুর্গা ফিরে আসেন বারবার আর দেবীর এ শুভাগমন ঘটে তাই শুভ মহালয়া বলে।
ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অকালে দেবীকে আরাধনা করেছিলেন লঙ্কা জয় করে সীতাকে উদ্ধারের জন্য দুর্গা পূজা করে, সেটাকে বাসন্তি পূজা বলা হয়। শ্রীরামচন্দ্র অকালে-অসময়ে পূজা করেছিলেন বলেই বাসন্তী পূজাকে দেবীর অকাল-বোধন বলা হয়।
শরৎকাল কে কেন মহাপূজা বলা হয়?
শরৎকালে মহাপূজা ক্রিয়তে চ বার্ষিকী।
তস্যাং মমৈতন্মাহাত্ম্যং শ্রুত্বা ভক্তিসমন্বিতঃ।।
(শ্রীশ্রীচণ্ডী, ১২/১২)
অর্থাৎ শরৎকালে যে বার্ষিক মহাপূজা অনুষ্ঠিত হয়, সেই সময় আমার এই মাহাত্ম্য যে ভক্তিসহকারে শ্রবণ করে, সেই মানুষ আমার কৃপায় সকল বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত হয় এবং ধন, ধান্য ও পুত্রাদি লাভ করে— এতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই।
তামগ্নিবর্ণাং তপসা জ্বলন্তীং বৈরোচনীং কর্ম্ফলেষু জুষ্টাম্।
দুর্গাং দেবীং শরণমহং প্রপদ্যে সুতরসি তরসে নমঃ।।
(কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যকের দশম প্রপাঠক)
অর্থাৎ আমি সেই বৈরোচনী, জ্যোতির্ময়ী অগ্নিবর্ণা, স্বীয় তাপে শত্রুদহনকারিণী, জীবের কর্মফলদাত্রী দুর্গাদেবীর শরণ নিলাম। হে সংসার-ত্রাণকারিণি দেবী তুমি আমার পরিত্রান করো, তোমায় প্রণাম।
আগের দিনে দুর্গাপূজা ধ্যানমন্ত্রের বর্ণনানুসারে মায়ের প্রতিমা জগজ্জননীরূপে ও মাতৃরূপী পরমব্রহ্মেরই উপসনা এবং শুদ্ধ হৃদয়ে মাতৃ আরাধনা বলে।
মহালয়া শব্দের অর্থ কি?
‘মহালয়া’ শব্দের সন্ধি বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় মহান+আলয় = মহালয়৷ সঙ্গে স্ত্রীকারাত্মক ‘আ’ যুক্ত হয়ে ‘মহালয়া’৷ ‘মহ’ শব্দের দু’টো অর্থ। ‘মহ’ বলতে বোঝায় পূজা, ‘মহ’ বলতে বোঝায় উৎসব।
মহ + আলয় = মহালয় হচ্ছে পূজা বা উৎসবের আলয় বা আশ্রয়। আলয় শব্দের অর্থ আশ্রয়, মূলত মহালয়া শব্দের আক্ষরিক সমার্থ হলো 'আনন্দ নিকেতন’। দেবী মায়ের আগমনী সুরে আনন্দের বার্তা আসে প্রকৃতি জুড়ে। দেবীপক্ষের সূচনাকালেই ধরাধামে আবির্ভূত হন দুর্গা। মহালয়ার দিনটি হচ্ছে পিতৃপক্ষের শেষদিন এবং দেবীপক্ষের সূচনা। সনাতন ধর্মমতে, পিতৃপক্ষ পূর্বপুরুষের তর্পণাদির জন্য প্রশস্ত এক বিশেষ পক্ষ এই পক্ষ পিতৃপক্ষ, ষোলা শ্রাদ্ধ, কানাগাত, মহালয়া পক্ষ ও অমরপক্ষ নামেও পরিচিত। মহালয়া মূলত পূর্বপুরুষের পূজার বিশেষ তিথি। হিন্দু সংস্কৃতিতে ধর্মীয় কার্যাদি সাধারণত দিন হিসেবে হয় না, বরঞ্চ তিথির হিসেবে হয়ে থাকে। সনাতন ধর্ম অনুসারে বছরে একবার পিতা-মাতার উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করতে হয়, সেই তিথিতে করতে হয়, যে তিথিতে তারা প্রয়াত হয়েছেন।
প্রথানুসারে মহালয়া তিথিতে যারা পিতৃ-মাতৃহীন, তারা তাদের পূর্বপূরুষকে স্মরণ করে, পূর্বপূরুষের আত্মার শান্তি কামনা করে অঞ্জলি প্রদান করেন। সনাতন ধর্মে কোন শুভ কাজ করতে গেলে, বিবাহ করতে গেলে প্রয়াত পূর্বরা, যাদের পিতা-মাতা তাদের পিতা-মাতার জন্য, সাথে সমগ্র জীব-জগতের জন্য তর্পণ করতে হয়, কার্যাদি-অঞ্জলি প্রদান করতে হয়। তর্পণ মানে খুশি করা ভগবান শ্রীরাম লঙ্কা বিজয়ের আগে এদিনে এমনই করেছিলেন।
সেই অনুসারে এই মহালয়া তিথিতে যারা পিতৃ-মাতৃহীন তারা তাদের পূর্বপূরূষের স্মরন করে, পূর্বপূরুষের আত্মার শান্তি কামনা করে অঞ্জলি প্রদান করেন। সনাতন ধর্ম অনুসারে এই দিনে প্রয়াত আত্মাদের মত্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়, প্রয়াত আত্মার যে সমাবেশ হয় তাহাকে মহালয় বলা হয়। মহালয় থেকে মহালয়া পিতৃপক্ষের ও শেষদিন এটি সনাতন ধর্ম অনুসারে বছরে একবার পিতা-মাতার উদ্দেশ্যে পিন্ড দান করতে হয়, সেই তিথিতে করতে হয় যে তিথিতে উনারা প্রয়াত হয়েছেন। সনাতন ধর্মের কার্যাদি কোন তারিখ অনুসারে করা হয় না, তিথি অনুসারে হয়।
মহালয়াতে যারা গঙ্গায় অঞ্জলি প্রদান করেন পূর্বদের আত্মার শান্তির জন্য, তাহারা শুধু পূর্বদের নয়, পৃথিবীর সমগ্র কিছুর জন্য প্রার্থনা ও অঞ্জলি প্রদান করেন। যে-অবান্ধবা বান্ধবা বা যেন্যজন্মনি বান্ধবা - অর্থাৎ যারা বন্ধু নন, অথবা আমার বন্ধু ও যারা জন্ম জন্মান্তরে আমার আত্মীয় বন্ধু ছিলেন, তারা সকলেই আজ আমার অঞ্জলি গ্রহন করুন।
যাদের পুত্র নেই, যাদের কেউ নেই আজ স্মরন করার তাদের জন্য ও অঞ্জলী প্রদান করতে হয়।
যেযাং, ন মাতা, ন পিতা, ন বন্ধু - অর্থাৎ যাদের মাতা, পিতা, বন্ধু কেউ নেই আজ স্মরন করার তাদেরকে ও স্মরন করছি ও প্রার্থনা করছি তাদের আত্মা তৃপ্তিলাভ করুক।
সনাতন ধর্মাবলম্বী মতে মহালয় এবং পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার সম্পর্কে তত্ত্ব—
সনাতন ধর্মাবলম্বী মতে ‘মহালয়’ বলতে ‘পিতৃলোক’কে বোঝায় যেখানে বিদেহী পিতৃপুরুষের অবস্থান। তাই যদি হয়, তাহলে পিতৃলোককে স্মরণের অনুষ্ঠানই হল মহালয়া এই দিনটি পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার পরম লগ্ন৷
কিন্তু তাহলে শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ হল কেন?
কারণ, পিতৃপক্ষের অবসানে, অমাবস্যার অন্ধকার পেরিয়ে আমরা যখন আলোকময় দেবীপক্ষের আগমনকে প্রত্যক্ষ করি, সেই মহা লগ্ন আমাদের জীবনে ‘মহালয়ার’ বার্তা বহন করে আনে। এক্ষেত্রে স্বয়ং দেবীই সেই মহান আশ্রয়, তাই উত্তরণের লগ্নটির নাম মহালয়া।
মহালয়া পক্ষের পনেরোটি তিথি হল প্রতিপদ, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী ও অমাবস্যা। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা প্রতিপদ থেকে শুরু হয়ে পরবর্তী অমাবস্যা পর্যন্ত সময়কে বলে পিতৃপক্ষ৷ হিন্দু মহাকাব্য অনুযায়ী, সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়। শাস্ত্র মতে, ব্রহ্মার নির্দেশে দেবীপক্ষের আগের কৃষ্ণা প্রতিপদে মর্ত্যে নেমে আসেন পিতৃপুরুষেরা অপেক্ষা করেন, উত্তরসূরীদের কাছ থেকে জল পাওয়ার৷ তাই বিশ্বাস, এই সময় কিছু অর্পণ করা হলে তা সহজে তাঁদের কাছে পৌঁছয় সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করে, তাঁরা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান। গোটা পক্ষকাল ধরে পিতৃপুরুষকে স্মরণ করে তর্পণ করা হয়৷ যার চূড়ান্ত প্রকাশ বা মহালগ্ন হল মহালয়া৷ মহালয়ার দিন অমাবস্যায় পূর্বপুরুষের উদ্দেশে জলদানই হল তর্পণ৷ অনেকেই এই দিনটিকে দেবীপক্ষের সূচনা বলে থাকেন৷ এটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা৷ মহালয়া পিতৃপক্ষের শেষ দিন৷ পরের দিন শুক্লা প্রতিপদে দেবীপক্ষের সূচনা৷ সেই দিন থেকে কোজাগরী পূর্ণিমা পর্যন্ত ১৫ দিন হল দেবীপক্ষ৷
তর্পণ অনেক প্রকার, মনুষ্য তর্পণ, ঋষি তর্পণ, দিব্য পিতৃতর্পণ, যম তর্পণ, ভীষ্ম তর্পণ, বাম তর্পণ, শূদ্র তর্পণ প্রভৃতি। ‘ময়া দত্তেন তোয়েন তৃপ্যান্ত ভুবনত্রয়ম’, অর্থাৎ স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল-- তিন ভুবনকেই মন্ত্রের মাধ্যমে স্মরণ করা হয় তিন গণ্ডুষ জল অঞ্জলি দিয়ে৷ হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তর্পণ করতে চান, তাঁকে তাঁর পিতার মৃত্যুর তিথিতেই তর্পণ করতে হয়। পুরাণবিদরা বলেন, মহালয়ায় যদি তর্পণ সম্ভব না হয় কার্তিক মাসের অমাবস্যা বা দীপান্বিতা অমাবস্যা পর্যন্ত যে কোনও দিন তর্পণ করা যায়৷ সম্ভব হলে শ্রাদ্ধও করা যেতে পারে৷ হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পিতৃলোকে বাস করেন। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত। পিতৃলোকের শাসক যম। তিনিই সদ্যমৃত ব্যক্তির আত্মাকে মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। পরবর্তী প্রজন্মের একজনের মৃত্যু হলে পূর্ববর্তী প্রজন্মের একজন পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গমন করেন এবং পরমাত্মায় বিলীন হন। গরুড় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘পুত্র বিনা মুক্তি নাই।’ মার্কণ্ডেয় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘পিতৃগণ শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন।’
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন ধর্মের প্রচারক)
জয় মা দুর্গা
জয় মা আদ্যাশক্তি।
👏 সকলেই সুখি হোক 👏
বিষয়টি ভালো লাগে শেয়ার করতে ভুলবেন না।

0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার