'মণ্ডনসূত্রধারে’ বিশ্বকর্মার রূপ বর্ণনা পাওয়া যায়,
"বিশ্বকর্মা চতুর্বাহুরক্ষমালাঞ্চ পুস্তকম্
কম্বাং (ম্বং) কমণ্ডলং ধত্তে ত্রিনেত্রৌ হংসবাহনঃ।।"
অর্থাৎ চতুর্ভুজ বিশ্বকর্মার হাতে যথাক্রমে পুস্তক, অক্ষমালা, শঙ্খ এবং কমণ্ডলু, শোভা পাচ্ছে। তিনি ত্রিনেত্রযুক্ত ও হংস বাহনারূঢ়। এক অন্য বিবরণে বিশ্বকর্মার মস্তকে মুকুট আছে। কিন্তু বর্তমানে বহু ক্ষেত্রেই শাস্ত্ররূপ অনুসরণ না করে বিশ্বকর্মার হাতে হাতুড়ি, বিভিন্ন যন্ত্র, কাস্তে প্রভৃতি দিয়ে তাঁকে গজপৃষ্ঠে আরোহণ করানো হচ্ছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁকে শ্রমজীবীর প্রতীক হিসাবে বরণ করে তাঁকেও যেন শ্রমজীবী হিসাবেই কল্পনা করা হচ্ছে।
শিল্পী ও নির্মাতাদের দেবতা বিশ্বকর্মা। ব্রহ্মাপুত্র বিশ্বকর্মাই গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নকশা তৈরিকারক। বিষ্ণু পুরাণ মতে বিশ্বকর্মা একজন দেবশিল্পী। মহাভারত অনুযায়ী বিশ্বকর্মা হলের শিল্পকলার দেবতা এবং হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী ও বিশ্বকর্মা শিল্পের দেবতা, দেবশিল্পী নামে পরিচিত বিশ্বকর্মার বাহন হাতি। বেদের যিনি বিশ্ব স্রষ্টা, পুরানে তিনি দেবতাদের শিল্পী বিশ্বকর্মা। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের দুটি বিশিষ্ট সূক্তে বিশ্বকর্মাকে স্তব করা হয়েছে। দুল্যক ও ভূলোক প্রথমে জলাকার ও সম্মিলিত ছিল। উভয়ের সীমা যত বৃদ্ধি পেলো- ততই তারা পরস্পর দূরবর্তী হতে লাগলো। এবং এক সময় পৃথক হল। বিশ্বকর্মা মনে মনে এই বিষয়ে চিন্তা করে নিরীক্ষণ করলেন। এই বিশ্ব তাঁরই কর্ম বলে তাঁর নাম বিশ্বকর্মা। বিশ্বকর্মা ‘বিমনা’ অর্থাৎ তিনি সমষ্টি মনা। বিশ্বকর্মা ‘ধাতা’ অর্থাৎ তিনি স্রষ্টা, বিশ্বকর্মা শ্রেষ্ঠ, বিশ্বকর্মা সর্ব দ্রষ্টা, এবং তিনি ‘ধামানি বেদ ভুবনানি বিশ্বা’, বিশ্ব ভুবনের সকল ক্ষেত্রই তাঁর পরিজ্ঞাত এবং তিনি সর্ব অন্তর্যামী।
বিশ্বকর্মার চোখ, বদন, বাহু, পদ সর্বত্র, সর্ব দিকে। তিনি বিশ্বতশ্চক্ষু, বিশ্বতোমুখ , বিশ্বতস্পাৎ। এই বিশ্ব যজ্ঞে তিনি নিজেকে আহুতি দিয়েছেন। অর্থাৎ বিশ্ব জগতের কল্যাণে তিনি সর্বদা চিন্তা রত। তিনি বাচস্পতি অর্থাৎ বাক্যের অধীশ্বর। তিনি মনোজেব অর্থাৎ মনের ন্যায় বেগ মান। তিনি বিশ্বের সমস্ত প্রানীর মঙ্গলকারী। তিনি সাধুকর্মা অর্থাৎ তাঁর চেষ্টা ও বিধান মঙ্গলময়। বিশ্বকর্মার রচিত স্থাপত্যশিল্প বিষয়ক গ্রন্থটির নাম "বাস্তুশাস্ত্রম"। "মানসার" এবং "ময়মতম" গ্রন্থে বস্তু ও বাস্তু শব্দদুটিকে সমার্থক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। 'বস্তু' শব্দ থেকে 'বাস্তু' কথাটা এসেছে। 'বাস্তু' শব্দের অর্থ পৃথিবী। ব্যাপক অর্থে সমস্ত প্রাণীর আবাসস্থলই বাস্তু। অর্থাৎ, স্রষ্টার যে-কোনো সৃষ্টিই বাস্তু। কাজেই শুধু পরিকল্পিত মনুষ্যগৃহই নয়, দেবতা থেকে শুরু করে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর আবাসকেই বাস্তু বলে। বাস্তুশাস্ত্রে বাস্তু শব্দের অর্থ ব্যাপক। এই শিল্পকে নির্মাণ শিল্পকে না-বুঝিয়ে পরিকল্পনা, নির্মাণ, চিত্র, অলংকরণ, স্বর্ণ-চর্ম-বয়নশিল্প, অস্ত্রশিল্প, পোতনির্মাণ, মূর্তিনির্মাণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে পরিব্যাপ্ত আছে।
পুরাণে উল্লেখ আছে, চারটি বেদের মতো চারটি উপবেদও আছে। উপবেদগুলি হল আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গান্ধর্ববেদ এবং স্থাপত্যবেদ। এই উপবেদ স্থাপত্যবিদ্যা বা বাস্তুবিদ্যার রচয়িতা হলেন বিশ্বকর্মা। বলা হয় তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রধান বাস্তুকার। তাঁর রচিত অন্তত দশখানি পুথি এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অন্যদিকে মৎস্যপুরাণের ২৪২ থেকে ২৪৭ অধ্যায়, অগ্নিপুরাণের ১০৪ থেকে ১০৬ অধ্যায়, গরুড়পুরাণের ৪৬ থেকে ৪৭ অধ্যায়, ভবিষ্যপুরাণ, বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণের তৃতীয় খণ্ড, বিভিন্ন আগম, শুক্রনীতিসারের চতুর্থ অধ্যায়, বৃহসংহিতা, গৃহ্যসূত্র, অর্থশাস্ত্র প্রভৃতিতে বাস্তুশাস্ত্রের আলোচনা পাওয়া যায়। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় গণপতিশাস্ত্রী বাস্তুবিদ্যা বা বাস্তুশাস্ত্রম গ্রন্থটি আবিষ্কার করে মুদ্রিত করেন। বিশ্বকর্মার নামে প্রচলিত বাস্তুশাস্ত্রটির নাম "বিশ্বকর্মাবাস্তুশাস্ত্রম"।
আর্যাবর্তের শিল্পধারা বিশ্বকর্মার দ্বারা প্রবর্তিত বলে মনে করা হয়। বিশ্বকর্মার "বাস্তুশাস্ত্রম"-এর প্রথমেই বলা হয়েছে, জগতের কল্যাণ কামনায় এই শাস্ত্র প্রচার করছেন - "বাস্তুশাস্ত্রং প্রবক্ষ্যামি লোকানাং হিতকাম্যয়া"। বিশ্বকর্মার নামে এরকম গ্রন্থ অন্ততপক্ষে দশটি পাওয়া গেছে।
বেদ উপনিষদে বিশ্বকর্মা,
এষ দেবো বিশ্বকর্মা মহাত্মা সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ।
হৃদা মনীষা মনসাভিকপ্তো য এতদ্ বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি।।
(শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ্-৪/১৭)
অনুবাদঃ— এই বিশ্বকর্তা মহাত্মা পরমেশ্বর সর্বদা সমস্ত মানুষের হৃদয়ে সমগ্র রূপে অবস্থিত তথা হৃদয়দ্বারা বুদ্ধিদ্বারা এবং মনদ্বারা ধ্যানে আনীত হলে প্রত্যক্ষ হন, যে সমস্ত সাধক এই রহস্য জ্ঞাত হন তাঁরা অমৃতস্বরূপ হন।
বিশ্বকর্মার প্রনাম মন্ত্রে বলা হয়,
"ওঁ বিশ্বকর্মন্ মহাভাগ সুচিত্রকর্মকারক্ ।
বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃক্ ত্বঞ্চ রসনামানদণ্ডধৃক্ ।।"
এর অর্থ, হে দংশপাল (বর্মের দ্বারা পালনকারী), হে মহাবীর, হে বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ও বিশ্ব বিধাতা, হে সুন্দর চিত্র রূপ কর্মকারক, আপনি মাল্য চন্দন ধারন করে থাকেন।
"দেবশিল্পী মহাভাগ দেবানাং কার্য্যসাধক।
বিশ্বকর্মন্নমস্তুভ্যং সর্বাভীষ্টপ্রদয়ক।।"
এর অর্থ, দেবশিল্পী, মহাভাগ (দয়াদি অষ্ট গুন যুক্ত) দেবতা দের কারু কার্য্যসাধক সর্বাভীষ্ট প্রদানকারী হে বিশ্বকর্মা আপনাকে নমস্কার।
বিশ্বকর্মার ধ্যানমন্ত্র
দংশপালঃ মহাবীরঃ সুচিত্রঃ কর্মকারকঃ।
বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃকতঞ্চ বাসনামানো দণ্ডধৃক।।
ওঁ বিশ্বকর্মণে নমঃ।
ধ্যান ও প্রনাম মন্ত্রে বিশ্বকর্মার যে পরিচয় পাওয়া গেলো সেটি হল বিশ্বকর্মা মহাবীর আবার দয়াদি অষ্ট গুন যুক্ত। তিনি সৃষ্টি কর্তা আবার সৃষ্টি বিধাতা। তিনি মহাশিল্পী আবার মহাযোদ্ধা। বিশ্বকর্মার এই চরিত্র বেদ এবং পুরানে আরোও পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠে।
কীর্তি ও স্থাপত্য
বিশ্বকর্মা লঙ্কা নগরীর নির্মাতা। তিনি বিশ্বভুবন নির্মাণ করেন। বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিব এর ত্রিশূল, কুবের এর অস্ত্র, ইন্দ্রের বজ্র, কার্তিকেয়র শক্তি প্রভৃতি তিনি তৈরি করেছেন। শ্রীক্ষেত্রর প্রসিদ্ধ জগন্নাথ মূর্তিও তিনি নির্মাণ করেছেন।
বিশ্বকর্মা পূজা
ভাদ্রমাসের সংক্রান্তির দিন বিশ্বকর্মার পূজা করা হয়। সূতার-মিস্ত্রিদের মধ্যে এঁর পূজার প্রচলন সর্বাধিক। তবে বাংলাদেশে স্বর্ণকার,কর্মকার এবং দারুশিল্প, স্থাপত্যশিল্প, মৃৎশিল্প প্রভৃতি শিল্পকর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিগণও নিজ নিজ কর্মে দক্ষতা অর্জনের জন্য বিশ্বকর্মার পূজা করে থাকেন।
পবিত্র বেদের দশম মণ্ডলের সুক্তে বিশ্বকর্মার মহিমা বলা হয়েছে,
বিশ্বতশ্চক্ষুরূত বিশ্বতোমুখো বিশ্বতো বাহুরুতবিশ্বতস্পাৎ।
সং বাহুভ্যাং ধমতি সং পতত্রৈর্দ্যাবাভূমী জনযন্ দেব একঃ।।
(ঋগ্বেদ ১০/৮১/২)
অনুবাদঃ— সেই এক দেবতা, –সর্বব্যাপী তাঁর চক্ষু, বিশ্বময় তাঁর মুখ, –সর্বময় তাঁর হাত এবং পা, –তিনি বাহুদ্বারা স্বর্গকে সম্যক্অরূপে স্থাপন করে, পদদ্বারা স্বর্গ-মর্ত্য সৃষ্টি করে এক অদ্বিতিয়রূপে বিরাজ করছেন।
গ্রন্থঃ- ঋগ্বেদ, মুণ্ডকোপনিষ, শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ, হিন্দু দেবদেবী তত্ত্ব
বিশ্বকর্মা বৈদিক দেবতা, ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলে ৮১ এবং ৮২ সূক্তদ্বয়ে বিশ্বকর্মার উল্লেখ আছে।
ঋগ্বেদ অনুসারে তিনি সর্বদর্শী এবং সর্বজ্ঞ।
তাঁর চক্ষু, মুখমণ্ডল, বাহু ও পদ সবদিকে পরিব্যাপ্ত। তিনি বাচস্পতি, মনোজব, বদান্য, কল্যাণকর্মা ও বিধাতা অভিধায় ভূষিত। তিনি ধাতা, বিশ্বদ্রষ্টা ও প্রজাপতি।
বিশ্বতশ্চক্ষুরুত বিশ্বতোমুখো বিশ্বতোবাহুরুত বিশ্বতস্পাৎ।
সং বাহুভ্যাং ধমতি সং পতত্রৈর্দ্যাবাভূমী জনয়ন্দেব একঃ।।
(ঋগ্বেদ, ১০/৮১/৩)
অনুবাদঃ-সে এক প্রভু, তাঁর সকল দিকে চক্ষু, সকল দিকে মুখ, সকল দিকে হস্ত, সকল দিকে পদ, ইনি দু হস্তে এবং বিবিধ পক্ষ সঞ্চালনপূর্বক নির্বাণ করেন, তাতে বৃহৎ দ্যুলোক ও ভূলোক রচনা হয়।
(ঋগ্বেদ ১০/৮২/১ থেকে ৭)
১) চোখ ও মনের সংবেদনশীলতার সৃষ্টিকর্তা, সুরক্ষাকর্তা ও বর্ধনকারী, অবিরত ও অলঙ্ঘ্যনীয়, তার নিজস্ব ইচ্ছা ও সংকল্প দ্বারা মহত হতে অহঙ্কারকে অর্থাৎ সম্ভাবনাময় প্রকৃতির নমনীয়তাকে প্রকাশ করেন, অতঃপর আধিদৈবিক ও ভৌতিক গঠনের দ্বৈত সম্ভাবনাময় বিবিধ গঠন উপযোগীতা (একদিকে মন ও চেতনা এবং অন্যদিকে সুক্ষ্ম উপাদান) প্রকাশিত হয় ৷ এবং যখন এইসকল মূল বন্ধনসমূহ গঠিত হয় ও স্থায়ী হয় তখন এসকল বোধগম্য ও ভৌত অস্তিত্বময় সুনির্দিষ্ট গঠনসম্পন্ন দ্যুলোক ও ভূলোক সমূহ বৃদ্ধি পায়, বিস্তৃত হয় ও সম্প্রসারিত হয় ৷
২) বিশ্বকর্মা অনন্তগুনে জ্ঞানী, তিনি অসীম পরিব্যাপক, সকল কিছুর প্রতিপালক, সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক, সর্বপ্রধান, সকল কিছুর প্রত্যক্ষকারী ও জাগ্রত ৷ তার সর্বব্যাপীতা ও অনুপ্রেরনা গুন দ্বারা জীবগন তাদের পছন্দের আকাঙ্খিত বস্তু উপভোগ করে ৷ ইনি সেই পরমাত্মা যাহাকে সকল ঋষিগন এক ও অদ্বিতীয় হিসেবে সন্মান করেন ও প্রশংসা করেন ৷ ইহা তার থেকেই আসে যাহাকে সকল সাত মন্ত্র স্তবে বর্ধিত করে তার প্রতি ফিরে যায় ৷
৩) বিশ্বকর্মা আমাদের পিতা ও মাতা, তিনি প্রতিপালক, শাসক ও নিয়ন্ত্রক, তিনি বিশ্বজগতের সকল আবাসস্থল ও মন্ডল সম্পর্কে অবহিত আছেন, তিনি প্রকৃতির, পদ্ধতিগত কার্যসমূহের ও সকল দেবগনের নামের একমাত্র আদেশ দাতা এবং একের মধ্যে এসকল কিছুর একমাত্র ঐক্য, এবং সকল প্রশ্নের মধ্যে এক উপলব্ধিমূলক প্রশ্ন, তিনি এক পরম সত্বা যাহাতে সকল মন্ডল ও জগত মিলিত ও একীভুত ৷
৪) পূর্বতন ঋষিগন (সৃষ্টিশীল বিকাশ প্রক্রিয়ায় আদি প্রকৃতির শক্তি) সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় সৃষ্টিকর্তার প্রতি পুরোহিতগনের ন্যায় যজ্ঞীয় সেবা প্রদান করেছিলেন এবং তাদের সেরা হব্য অর্পণ করেছিলেন ৷ গতিশীল ও অগতিশীল উপাদানসমূহ ও গঠনসমূহের শোরগোলে স্থাপিত ও স্থিত হয়ে তারা ঈশ্বরের ইচ্ছার প্রতি আনুগত হয়ে পরবর্তী গঠনসমূহ তৈরী করে ৷
৫) সেই উৎপাদক একই সাথে উত্থানশীল শক্তি ও প্রকৃত সত্য কোনটি যাহা দ্যুলোক সমূহ অতিক্রম করিয়া আছে, এই পৃথিবী ও গোটা বিশ্বজগত অতিক্রম করিয়া আছে, দেবগন ও শক্তিসমূহ অতিক্রম করিয়া আছে, অস্তিত্বশীল সকল কিছুর উর্দ্ধে অতিক্রম করিয়া আছে। সেই অস্তিত্ব কোনটি, কোনটি সেই হিরণ্যগর্ভ, বিশ্বজগতের সোনালী বীজের গঠন যাহা আদি প্রকৃতির কণিকা ধারন করে এবং যাহা স্বয়ং সেই কণিকাসমূহ ধারন করে ও উৎপাদন করে, যেথায় সকল অস্তিত্বসমূহ নিজেদের খুজে পায় ও অনুধাবন করে।
৬) সেই বিশ্বকর্মা হলেন আদি শক্তি ও সত্বা যিনি অর্ন্তনিহীত সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আদি প্রকৃতির কণা ধারন করেন এবং যিনি সর্বোৎকৃষ্ট প্রধান শক্তি হিসেবে কণিকা সমূহকে সৃষ্টি করেন, ধারন করেন ও নিয়ন্ত্রন করেন যেথায় সকল দেবগন একবিন্দুতে মিলিত থাকে ও নিজেদের অনুধাবন করে৷ সেই সকল কিছু হল শ্বাশত, অজাত ও অবিনশ্বর শক্তির কেন্দ্রিয় উৎপাদী মজ্জায় স্বয়ং সীমাবদ্ধ, এবং সেথায় বিশ্বজগতের সকল মন্ডল নিহীত থাকে৷
৭) তুমি সেই শক্তিকে অনুধাবন করতে পারবে না যিনি সকল অস্তিত্বশীল জগতকে সৃষ্টি করেছেন ৷ ইহা এমন একটি বিষয় যাহা তুমি স্বয়ং অনুভব কর ও জান তার থেকে গভীর থেকে গভীরতর ৷ বর্হিজগত সম্পর্কে কৌতুহলী চিন্তার কুয়াশা দ্বারা আবৃত, শুধুমাত্র শব্দ নাড়াচাড়া করে, প্রাণময় অস্তিত্বের সহিত সুখী ও সন্তুষ্ট থাকে, সন্তুষ্টিলাভের জন্য গান গায়, মনুষ্যগন লক্ষ্যহীনভাবে চারিদিকে বিচরন করে এবং ঘূর্নায়মান জগতসমূহের কেন্দ্রস্থল হতে বিচ্যুত হয় ৷
(ঋগ্বেদের ১০ মন্ডল ৮২ সুক্ত সমাপ্ত)৷
দেবনগরী ভাষাকে ইংরেজীতে (ডঃ তুলসীরাম শর্মার ইংরেজী বেদভাষ্য হতে অনুবাদকৃত)______
(ঋগ্বেদের ১০/৮১/১ থেকে ৭)
১) শ্বাশত ঋষি যিনি সৃষ্টিকর্তা ও মহাজাগতিক যাজক, আমাদের জন্মদাতা পিতা, যিনি এ মহাবিশ্বের সকল জগতকে অস্তিত্বময় করেন যারা সদা স্বয়ং তাহাকেই মেনে চলে ৷ আত্মার প্রতি তাহার আর্শ্বীবাদের সহিত সম্পদ দান করার আকাঙ্খায় চালিত হয়ে তিনি মূল প্রকৃতিকে প্রথম সৃষ্টি করেন ইহাকে সজ্জিত করেন তার দিব্য ইচ্ছা দ্বারা অতঃপর একই সাথে আদি প্রকৃতির ধরন ও গঠন অনুপ্রবেশ করেন ও পরিব্যাপ্ত করেন যেহেতু তারা বিকশিত হয়।
২) প্রধান উপাদান কি ছিল? আদির ও আদি কোনটি, কোন শ্রেণী ও কোথা থেকে, সর্বজ্ঞ বিশ্বকর্মা যিনি বিশ্বজগতের সকল কিছুর তত্বাবধানকারী তিনি কোথা থেকে এই পৃথিবী ও অন্তরীক্ষ সৃষ্টি করেছেন। তাহাদিগকে আকৃতি দান করেছেন এবং দিব্য মহিমায় বিভুষিত করেছেন।
৩) মহাজাগতিক চক্ষু দ্বারা সকল কিছু দেখছেন, মহাজাগতিক বাক্যের দ্বারা সকল কিছু বলছেন, মহাজাগতিক অস্ত্রের দ্বারা সকল কিছুকে সুরক্ষিত করছেন এবং মহাজাগতিক সংস্থাপন দ্বারা সকলকে প্রতিপালন করছেন, সেই এক স্বয়ং দীপ্তিমান সৃষ্টিকর্তা পৃথিবী ও অন্তরীক্ষকে সৃষ্টি করেছেন তার হস্ত দ্বারা বিশ্বজগতকে নিয়ন্ত্রন করেন ও আকৃতি দান করেন, (অর্থাৎ চিন্তা ও সংকল্পের সহিত প্রাকৃতিক শক্তির অভিঘাতে বস্তুসমূহকে গঠন করেন।
৪) কোনটি সেই বন ও কোনটি সেই বৃক্ষ যাহা থেকে প্রকৃতির দিব্যশক্তি অন্তরীক্ষ ও পৃথিবীকে উৎকীর্ণ করেছেন ও আকৃতি দিয়েছেন। হে দিব্য দর্শনের ঋষি ও জ্ঞানীগন, তোমার হৃদয় ও বুদ্ধিমত্তার সহিত সেই সর্বজ্ঞ প্রভুকে প্রশ্ন কর যিনি এ সকল অস্তিত্বশীল জগতকে পরিচালনা করছেন, তাহাদিগকে ধারন করছেন ও সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রন করছেন৷
৫) জগতের সৃষ্টিকর্তা ও নির্মাতা হে বিশ্বকর্মা ! যে মন্ডলই হোক না কেন, তাহাদের নাম ও গঠন যাই হোক না কেন তাহারা তোমারই সৃষ্টি, উচ্চতম হোক বা দূরতম হোক অথবা মাঝামাঝি কোনটি, অথবা নিম্নতম ও নিকটতম (তাহা তোমারই সৃষ্টি), প্রার্থনা করি বন্ধুত্বপূর্ণ অন্বেষকগন ও অনুসারীগনকে তাহাদের সম্পর্কে জ্ঞানদান কর ৷ হে প্রভু তোমার নিজের আদি প্রকৃতির শক্তি দ্বারা ও প্রাকৃতিক বিধান দ্বারা তুমি স্বয়ং এই প্রাকৃতিক যজ্ঞ চালিয়ে যাও, সুগন্ধী হবিষ্য অর্পণ করছ এবং মহাজাগতিক গঠন কাঠামোকে প্রসারিত করছ।
৬) হে বিশ্বকর্মা! তুমি স্বয়ং প্রকৃতি মধ্যস্থিত পবিত্র দ্রব্যাদির সহিত পৃথিবী ও অন্তরীক্ষের যজ্ঞ সুসম্পন্ন করছ ও তত্ত্বাবধান করছ, প্রসারনশীল জগতে তুমি নিজেকে মহিমান্বিত করছ৷ এখানে রহস্য সম্পর্কে অনবহিত অন্য মনুষ্যগন সশ্রদ্ধ বিষ্ময় অনুভব করেন, কিন্তু আমরা প্রার্থনা করি সর্বশক্তিমান প্রভু পরম দাতা আমাদের জ্ঞান দান করুন৷
৭) আমাদের জ্ঞানের জন্য এবং অস্তিত্বের সংগ্রামে বিজয় অর্জনের জন্য আজ আমরা বিশ্বকর্মাকে আহবান করি যিনি প্রসারনশীল জগতের ও বিশ্বজনীন বাক্ এর প্রভু, সৃষ্টিশীল মহাজাগতিক চেতন সত্বা তিনি মনুষ্যগনের মন ও চিন্তাকে উদ্বুদ্ধ করছেন, এবং আমরা প্রার্থনা করি পবিত্র কর্ম ও বিশ্বজনীন কল্যানময় প্রভু আমাদের প্রার্থনা শুনুন এবং আমাদের আহবান, প্রার্থনা ও আরাধনার সুফল দান করুন৷
(ঋগ্বেদের ১০ মন্ডল ৮১ সুক্ত সমাপ্ত)৷
ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি
জয় শ্রীরাম
জয় শ্রীকৃষ্ণ
হর হর মহাদেব
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন ধর্মের প্রচারক)

0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার