ঈশ্বর এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব জায়গাতেই আছেন। সকল জীবের মধ্যেই তিনি আত্মারূপে বিরাজ করেন। তিনি সবাইকে দেখতে পাই কিন্তু আমরা তাকে প্রত্যক্ষভাবে দেখতে পাই না। আমরা তাঁর নানা সৃষ্টির মধ্যদিয়ে তাকে বুঝতে পারি। কারণ সৃষ্টির মধ্যেই ঈশ্বরের রূপ প্রকাশিত। তাই ঈশ্বর তার লীলা প্রকাশের জন্য সৃষ্টি করেন। ঈশ্বরের লীলার একটি উদ্দেশ্য আনন্দ উপভােগ করা। জীব ও জগতের সৃষ্টিও ঈশ্বরের একটি লীলা। ঈশ্বর যা কিছু সৃষ্টি করেন সেটাই তার লীলা, বিশ্বের সর্বত্র তার লীলা প্রকাশিত বিচিত্র তার লীলা আর বিচিত্র তার সৃষ্টি।
"ঈশ্বর সর্বব্যাপক, সর্বশক্তিমান, শরীররহিত, ক্ষতরহিত, স্নায়ুরহিত, জ্বরাহীন, জন্মরহিত, শুদ্ধ, নিষ্পাপ, সর্বজ্ঞ, অন্তর্য্যামী, দুষ্টের দমন কর্তা ও অনাদি। তিনি তাঁহার শাশ্বত প্রজা জীবের অন্য যথাযথা ফলের বিধান করেন।
(যজুর্বেদ, ৪০/৮)
ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, তিনি যেহেতু সর্বশক্তিমান তিনি যেমন নিরাকার হতে পারেন তিনি তেমন সাকারো হতে পারেন।ঈশ্বর সকল সৃষ্টির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের লীলার মধ্যদিয়ে আনন্দ উপভােগ করছে।
এই জীবাত্মার হৃদয়রূপ গুহায় স্থিত পরমাত্মা সূক্ষ্ম থেকে আরও সূক্ষ্ম আর বিরাট থেকেও অতি বিরাট আত্মার সেই মহিমা কামনারহিত আর শোকরহিত সর্বাশ্রয় পরমেশ্বরর কৃপাতে দেখতে পায়।
(কঠোপনিষদ, ১/২/২০), (শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ, ৩/২০)
(কঠোপনিষদ, ১/২/২০), (শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ, ৩/২০)
ঈশ্বরের মাহাত্ম্য প্রকাশ
"সম্পূর্ণ বেদশাস্ত্র যে গন্তব্য নির্দেশ করে এবং সর্ববিধ তপস্যা যে তত্ত্ব প্রতিপাদন করে, যে বস্তুর অভিলাষী হয়ে লােকে ব্রহ্মচারীর ব্রত পালন করে সেই ঈশ্বর তত্ত্ব তােমাকে সংক্ষেপে বলছি, উনি (ওঁ) ওঙ্কার পদবাচ্য।
(ওঁ)
ওঙ্কার সাধনা শ্রেষ্ঠ সাধনা
সকল বেদ যে পরম পদের বার বার প্রতিপাদন করেছেন এবং সকল তপস্যা যে পদের কথা বলে অর্থ্যাৎ যাঁকে পাবার সাধনার কথা বলে যাঁকে পাবার জন্য সাধকগণ ব্রহ্মচর্যের পালন করেন সেই পদ তোমাকে (আমি) সংক্ষেপে বলছি (সে হচ্ছে এই ওঁ)।
(কঠোপনিষদ, ১/২/১৫)
বেদসমূহ একবাক্যে যে ঈপ্সিত বস্তুর প্রতিপাদন করেন, অখিল তপস্যাদি কর্মরাশি যাঁহার প্রাপ্তির সহায় এবং যাঁহার কামনায় লোকে ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে,আমি তোমায় সেই প্রাপ্যবস্তুর সম্বন্ধেই উপদেশ করিতেছি - ইঁহা ওম্ এবং ওঙ্কার ইঁহার প্রতিক। অতএব এই ওঙ্কার অপরব্রহ্ম এবং পরব্রহ্ম উভয়াত্মক। এই ওঙ্কারকে ব্রহ্মরূপে উপাসনা করিয়া যিনি যাহা ইচ্ছা করেন তাঁহার তাঁহাই (অর্থ্যাৎ অপরব্রহ্ম-প্রাপ্তি বা পরব্রহ্ম-জ্ঞান হইয়া থাকে) ইহাই শ্রেষ্ঠ অবলম্বন, ইহাই পরব্রহ্ম ও অপরব্রহ্ম এই উভয়-বিষয়ক। এই অবলম্বন কে জানিয়া সাধক ব্রহ্মলোকে মহীয়ান হন।
"ওঙ্কাররূপ এই অক্ষরই প্রসিদ্ধ অপরব্রহ্ম, এই অক্ষরই সুনিশ্চিত পরমব্রহ্ম। "(কঠোপনিষদ, ১/২/১৫, ১/২/১৬, ১/২/১৭) বাণীর মধ্যে আমিই একাক্ষর ওঁ ওঙ্কার।
মহর্ষিগণের মধ্যে আমি ভৃগু, শব্দসকলের মধ্যে আমি একাক্ষর ওঁকার, যজ্ঞসকলের মধ্যে আমি জপযজ্ঞ এবং স্থাবর পদার্থের মধ্যে আমি হিমালয়।
(শ্রীমদ্ভগবদগীতা, ১০/২৫)
আমি এই জগতের পিতা, মাতা, বিধাতা, পিতামহ; যাহা কিছু জ্ঞেয় এবং পবিত্র বস্তু তাহা আমিই। আমি ব্রহ্মবাচক ওঙ্কার, আমি ঋক্, সাম ও যজুর্বেদ স্বরূপ।
(শ্রীমদ্ভগবদগীতা, ৯/১৭)
উপনিষদ আমাদের শিক্ষাদেয়
ব্রহ্মের সব থেকে নিকটতম প্রতিশব্দ হল ওঁ তাই কেউ যখন ওম্ উচ্চারণ করেন, তখন তিনি ব্রহ্মেরই উপাসনা করছেন বুঝতে হবে। অর্থাৎ ব্রহ্মের প্রতীক হল এই ওঁ এবং এই ওম্ কে ব্রহ্মের সঙ্গে অভেদ জেনেই আরাধনা করতে হবে। ওঙ্কার (ওঁ) ব্রহ্ম এক ও অভিন্ন। ওঁ কেবল ব্রহ্মের প্রতীক নয়, অউমই ব্রহ্ম। উপনিষদ আমাদের এই শিক্ষা দেয়, যখন সাধক অউম শব্দটি আবৃত্তি করেন তখন তিনি আসলে ব্রহ্মেরই উপাসনা করছেন।
ওঁ খং ব্রহ্ম
(যজুর্বেদ, ৪০/১৭)
যেমন অউম খম্ অবতীত্যোম, আকাশ মিব ব্যাপকত্বাৎ খম্, সর্বেবভ্যো বৃহত্বাদ্ ব্রহ্মা।
ওঁ রক্ষা করেন বলে "অউম" আকাশের ন্যায় ব্যাপক বলে "খম" এবং সবথেকে বড় বলে "ব্রহ্ম" ঈশ্বরের নাম। অর্থাৎ ওঁ এই সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম।
"ওঁ" ঈশ্বরের সর্বোত্তম নাম ওঙ্কারপূর্বক এই নামে ঈশ্বরকে ডাকতে ভুলবেন না। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, "ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ নাম ও সুতরাং ঐ ওঙ্কার জপ কর, তার ধ্যান কর, তার ভিতর যে ঈশ্বরের শক্তি অপূর্ব অর্থসমূহ নিহিত রয়েছে, তা ভাবনা কর। সর্বদা ওঙ্কার জপ-ই হল যথার্থ উপাসনা। ওঙ্কার সাধারন শব্দমাত্র নয়, স্বয়ং ঈশ্বরস্বরূপ!"
এই হেতু ব্রহ্মবাদিগণের যজ্ঞ, দান ও তপস্যাদি শাস্ত্রোক্ত কর্ম সর্বদা 'ওঁ" উচ্চারণ করিয়া অনুষ্ঠিত হয়।
(শ্রীমদ্ভগবদগীতা, ১৭/২৪)
ওঁ (ওঙ্কার) ঈশ্বর শক্তির প্রকাশ। ঈশ্বর তাঁর সৃষ্টি সকল জীবের জন্য কর্ম অনুযায়ী যথাযথ ফলের বিধান করেন তাই তাঁর সকল সৃষ্টিকে আলাদা আলাদা তিনটি গুণকর্মে আবদ্ধ করে দিয়েছেন। শ্রীমদ্ভগবদ গীতা অনুসারে ভগবান ভক্তকে ৩টি গুণগত শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন।
১) সাত্ত্বিক,
২) রাজসিক,
৩) তামসিক।
(সত্ত্ব, রজ, ও তম) প্রকৃতির তিনটি গুনের দ্বারা কর্মে প্রভাবিত। তুমি সেই গুণ গুলি অতিক্রম করে প্রাকৃতির চেতনায় স্থিত হও। শ্রীমদ্ভগবদগীতা অষ্টাদশ অধ্যায়ে কর্ম ৩ প্রকার যথাঃ—
১। সাত্ত্বিক কর্মঃ—
যে নিয়ত (নির্দিষ্ট) কর্ম ফলাকাঙ্ক্ষাবর্জিত মানুষের দ্বারা রাগ (আসক্তি) — দ্বেষ ও কর্তৃত্বাভিমান রহিত হয়ে করা হয় তাকে বলে সাত্ত্বিক কর্ম। (গীতা ১৮/২৩)
২। রাজসিক কর্মঃ—
যে কর্ম ভোগেচ্ছাযুক্ত মানুষের দ্বারা অহংকার অথবা পরিশ্রমপীর্বক শুরু করা হয় তাকে রাজসিক কর্ম বলে।
(গীতা ১৮/২৪)
৩। তামসিক কর্মঃ—
যে কর্ম পরিণাম, ক্ষতি, হিংসা ও নিজ সামর্থ্য না বুঝে মোহপূর্বক আরম্ভ করা হয় তাকে তামসিক কর্ম বলে।
(গীতা ১৮/২৫)
এই ত্রিগুণাত্মিকা অলৌকিকী আমার মায়া নিতান্ত দুস্তরা। যাহারা একমাত্র আমারই শরণাগত হইয়া ভজনা করেন, তাহারাই কেবল এই সুদুস্তরা মায়া উত্তীর্ণ হইতে পারেন।
(শ্রীমদ্ভগবদগীতা, ৭/১৪)
ঈশ্বরের লীলার শক্তির মহিমা
ওঁ ওঙ্কার ঈশ্বরই একমাত্র শক্তি প্রকাশ। এই শক্তির মৃত্যু নেই, তিনি লীলার শক্তির মহিমা শক্তি কেবলমাত্র তাঁর মায়া। শুদ্ধ মন দ্বারা এই শক্তির তত্ত্ব প্রাপ্তি যোগ্য।
(শুদ্ধ) মন দ্বারা এই পরমাত্মা তত্ত্ব প্রাপ্তি-যোগ্য এই জগতে (এক পরমাত্মার অতিরিক্ত) ভিন্ন-ভিন্ন ভাব কিছুই নেই (এজন্য) যে এই জ্গতে বিভিন্ন প্রকার দেখে সেই ব্যক্তি মৃত্যু থেকে মৃত্যুতে গমন করে অর্থাৎ বারবার জন্মায় এবং মরে।
(কঠোপনিষদ, ২/১/১১)
বায়ুরনিলমমৃতমথেধং ভষ্মান্ত শরীরম্।
ওঁম ক্রুতো স্মর ক্লিবে স্মর কৃত স্মর।।
(যজুর্বেদ, ৪০/১৫)
হে কর্মশীল জীব! শরীর ত্যাগের সময় পরমাত্মার নাম ওঙ্কার স্বরণ কর, আধ্যাত্মিক সামর্থ্য প্রাপ্তির জন্য স্বরণ কর কৃতকর্মকে স্মরণ কর। প্রথম আধ্যাত্মিক প্রান, আদিদৈবিক প্রান পুনরায় সেই প্রানস্বরুপ পরমাত্মাকে প্রাপ্ত হও। তৎপর এই ভৌতিক শরীর ভষ্মে পরিনত।
যাঁর মধ্যে সমস্ত দেবগণ ভালোভাবে স্থিত সেই অবিনাশী পরব্যোমে সম্পূর্ণ বেদ বিদ্যমান যে মানুষ তাঁকে জানে তারা এতে সম্যকরূপে অবস্থিত।
(শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ, ৪/৮), (ঋগ্বেদ মণ্ডল ১ সূত্র ১৬৪-র ৩৯ নং), (অথর্ববেদের ৯/১৫/১৮ তে ও পরিলক্ষিত হয়)।
এক সত্তা পরব্রহ্মকে জ্ঞানীরা ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, অগ্নি, দিব্য, সুপর্ণ, গরুৎমান, যম, মাতরিশ্বা আদি বহু নামে অভিহিত করেন।
(ঋগ্বেদ, ১/১৬৪/৪৬)
আমরা এই ঈশ্বরের সকল সৃষ্টি সম্পর্কে তত্ত্ব জানতে চাইলে বেদ পাঠ করতে হয়। তাই বেদ পাঠ করলে স্রষ্টা, বিশ্বপ্রকৃতি ও জীবন সম্পর্কে জ্ঞানলাভ হয়। প্রত্যেকটি বেদের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ঋগ্বেদ সংহিতা পাঠ করলে আমরা বিভিন্ন দেব-দেবীর সম্পর্কে জানতে পারি এবং এর মাধ্যমে দেব-দেবীর স্তুতি বা প্রশংসা করতে শিখি। অগ্নি, ইন্দ্র, উষা, রাত্রি, বায়ু প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরের অসীম ক্ষমতা উপলব্ধি করা যায়। তাদের কর্মচাঞ্চল্যকে আদর্শ করে, আমরা আমাদের জীবনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চেষ্টা করব। যজ্ঞের মন্ত্রের সংগ্রহ হচ্ছে যজুর্বেদ। এ থেকে জানতে পারি সেকালে উপাসনা পদ্ধতি কেমন ছিল। যজুর্বেদ অনুসরণে বিভিন্ন সময়ে যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ষপঞ্জি বা ঋতু সম্পর্কে ধারণা জন্মে। বিভিন্নভাবে এবং বিভিন্ন সময়ব্যাপী যজ্ঞানুষ্ঠান করা হতাে। যজ্ঞের বেদি নির্মাণের কৌশল থেকেই জ্যামিতি বা ভূমি পরিমাপ বিদ্যার উদ্ভব ঘটেছে। সামবেদ থেকে সেকালের গান ও রীতি সম্পর্কে জানতে পারি। অথর্ববেদ হচ্ছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূল। এখানে নানা প্রকার রােগব্যাধি এবং সেগুলাের প্রতিকারের উপায় স্বরূপ নানা প্রকার লতা, গুল্ম বৃক্ষাদির বর্ণনা করা হয়েছে। আয়ুর্বেদ নামে চিকিৎসা শাস্ত্রের আদি উৎস এই অথর্ববেদসংহিতা। বলা যায়, অথর্ববেদ থেকে জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। সুতরাং সমগ্র বেদ পাঠে পরমাত্মা, বৈদিক দেব-দেবী, যজ্ঞ, সঙ্গীত, চিকিৎসাসহ নানা বিষয়ের জ্ঞান লাভ করে জীবনকে সুন্দর, সুস্থ ও পরিপাটি করে তােলা যায় আর এজন্যই এ গ্রন্থ আমাদের প্রত্যকের পাঠ করা অবশ্যই কর্তব্য।
ইনি ব্রহ্মা, ইন্দ্র, প্রজাপতি এই সমস্ত দেবতা তথা এই পৃথ্বী বায়ু, আকাশ, জল এবং তেজ এইরুপ এই পাঁচ মহাভূত এবং এই ছোট ছোট সম্মিলিত ন্যায় বীজরূপ সমস্ত প্রাণী এবং এ সমস্ত থেকে ভিন্ন অন্য ও অণ্ডজসমূহ এবং জরায়ুজ তথা স্বেদজ এবং উদ্ভিদ তথা ঘোড়াগুলি গোসমূহ হস্তিসমূহ মানবগণ যা কিছু এই জগৎ এবং যা ডানাবিশিষ্ট এবং জঙ্গম এবং স্থাবর প্রাণিসমুদয় তা সমস্ত প্রজ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মাতেই প্রতিষ্ঠিত ব্রহ্মণ্ড প্রজ্ঞান স্বরুপ পরমাত্মা থেকেই জ্ঞানশক্তি সম্পন্ন প্রজ্ঞানস্বরুপ পরমাত্মাই এইসবের স্থিতির আধার এই প্রজ্ঞানই ব্রহ্ম।
(ঐতরেয়োপনিষদ, ৩/১/৩)
ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি!
জয় শ্রীরাম
জয় শ্রীকৃষ্ণ
হর হর মহাদেব
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন ধর্মের প্রচারক)

0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার