Bablu Malakar

पवित्र वेद धर्म मानव मात्र का एक है, मानवों के धर्म अलग अलग नहीं होते

সনাতন ধর্ম শাস্ত্রীয় বেশকিছু পুরাণ মতে মনসাপূজার তত্ত্ব


                           মা মনসা পূজা
আষাঢ় মাসের পূর্ণিমার পর যে পঞ্চমী তিথি (শ্রাবণ) তাকে নাগপঞ্চমী বলে। নাগপঞ্চমীতে উঠানে সিজগাছ স্থাপন করে মনসা পূজা করা হয়। ভাদ্রমাসের কৃষ্ণা পঞ্চমী পর্যন্ত পূজা করার বিধান আছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে একমাস যাবত্ পূজা করে পূজা সমাপনান্তে বিশেষভাবে পূজা করা হয় অথবা শুধুমাত্র শেষ দিনে পুরোহিত দ্বারা পূজা করা হয়। উল্লেখ্য, নাগকুল কশ্যপমুনির জাত যা সাধারণ সাপ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন।

      নাগপঞ্চমীর দিনে নাগ পূজা কেন করা হয়?

শ্রাবণ মাসের শুক্ল পঞ্চমী তিথিটি সারা ভারতেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এদিন নাগ পঞ্চমী। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, নাগ লোক বা পাতাল থেকে নাগ বা সর্পকুল মানবের উদ্দেশে এদিন আশিস প্রেরণ করেন। পারিবারিক সমৃদ্ধি ও সার্বিক কুশলের জন্য এই আশীর্বাদকে অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন লক্ষ লক্ষ ভারতীয়। এই সর্পোপাসনার উৎস কোথায়, খোঁজ নিতে বসলে প্রথমেই চোখ যায় পুরাণ ও মহাকাব্যের দিকে। তার পরে আসা যেতে পারে এর সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায়।

             কেন এদিন পূজা পাই সর্পকুল

গরুড়পুরাণ থেকে জানা যায়, ব্রহ্মার পুত্র মহামুনি কাশ্যপের তৃতীয়া স্ত্রী কদ্রু ছিলেন নাগ বংশের কন্যা। তিনিই নাগকুলের জননী। অন্যদিকে, অন্য এক স্ত্রী বিনতা জন্ম দেন গরুড়ের। বিনতার প্রতি কদ্রু বিদ্দিষ্ট ছিলেন। গরুড় বাল্যকালে মায়ের কষ্ট দেখে প্রতিজ্ঞা করেন, তিনি সর্পকুল ধ্বংস করবেন। কিন্তু পরে তা থেকে তিনি বিরত হন। কিন্তু সর্পকুলের সঙ্গে গরুড়ের শত্রুতা থেকেই যায়। তবে এই পুণ্য জন্মের কারণে নাগকুলও পূজিত হতে থাকেন।

মহাভারত জানায়, কুরু বংশীয় রাজা পরিক্ষিৎ তক্ষক নাগের আঘাতে মারা গেলে তাঁর পুত্র জন্মেজয় পৃথিবী সর্পশূন্য করেন বলে প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি এক সর্পযজ্ঞ শুরু করেন, যেখানে মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে কোটি কোটি সাপ যজ্ঞানলে পড়ে মারা যেতে থাকে। এমন সময়ে জরৎকারু মুনির পুত্র আস্তিক (লৌকিক বিশ্বাস মতে, জরৎকারুর স্ত্রী হলেন সর্পদেবী মনসা) এই নিষ্ঠুর যজ্ঞ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে জন্মেজয়ের কাছে পৌঁছান এবং তাঁরই হস্তক্ষেপে জন্মেজয় এই ভয়ঙ্কর কর্ম থেকে নিরস্ত হন। যে দিনটিতে সর্পযজ্ঞ বন্ধ হয়, সেই দিনটি ছিল শ্রাবণের শুক্লপঞ্চমী। সেই থেকেই এই পূজার প্রচলন।

• সমাজ নৃতত্ত্বের দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, সর্বাস্তিবাদী ভারতীয় সভ্যতায় নাগেরাও পূজ্য ছিলেন। তন্ত্র গ্রন্থাদিতে নাগদের অতিলৌকিক প্রাণী বলে বর্ণনা করা হয়। এবং তাদের তুষ্ট করার উপায়ও বহু তন্ত্রশাস্ত্র উল্লেখ করে। দক্ষিণ ভারতে ‘নাগ’ সভ্যতা নামে এক প্রাচীন সভ্যতা ছিল। এই সভ্যতার সঙ্গে আর্যদের আদান প্রদান শুরু হয় অনেক পরে। পুরাণ, মহাকাব্যে যে ‘নাগলোক’-এর কথা পাওয়া যায়, তা এই অঞ্চল বলেই নৃতাত্ত্বিকরা মনে করেন।

আজকের ভারতে নাগপঞ্চমী এক অতি জনপ্রিয় উৎসব। বিশেষত মধ্যভারতে, নাগ এক সর্বজনমান্য দেবতা। নাগপুরের নামকরণই এর প্রমাণ। এখানে নাগোবা মন্দিরে এদিন বিশেষ পূজা হয়। গোটা উত্তর ভারত জুড়ে পালিত হয় নাগপঞ্চমী। কাশীর কুস্তির আখড়াগুলিতে সর্পোপাসনা দেখবার মতো। বাংলায় এদিন মা মনসার বিশেষ পূজা শুরু হয়। দক্ষিণ ভারতে পূজা শুরু হয় অমাবস্যার দিন। পঞ্চমী হল মূল পূজার দিন। নেপালে গরুড়ের সঙ্গে নাগকুলের যুদ্ধ নাটকের আঙ্গিকে অভিনীত হয়।

নাগদেবতার মূর্তির সামনে এদিন রাখা হয় দুধ। রাখা হয় চন্দন, হলুদ ও সিঁদুর। মূর্তির সামনে জ্বালানো হয় কর্পূরের প্রদীপ। পাঠ করা হয় নাগপঞ্চমী ব্রতকথা (কদ্রু-বিনতার কাহিনি, জন্মেজয়ের সর্পযজ্ঞের আখ্যান)। পারিবারিক সমৃদ্ধি ও সার্বিক কুশলের জন্য নাগদের আশীর্বাদকে অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন লক্ষ লক্ষ ভারতীয়।

                          সনাতন শাস্ত্রে

ভারতবর্ষে সর্প পূজা একটি প্রাচীন অনুষ্ঠান। মনসা সাপের দেবী। তিনি মূলত লৌকিক দেবী। পরবর্তীকালে পৌরাণিক দেবী রূপে স্বীকৃত হন। শ্রাবণ মাসের শেষ দিনে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের প্রতিটি ঘরে ঘরে মনসা দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

'মনস' শব্দের উত্তর স্ত্রীলিঙ্গের আপ প্রত্যয় করে 'মনসা' শব্দের উৎপত্তি। ব্যুৎপত্তিগত অর্থে মনসা মনের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। দেবী ভাগবত ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে সর্পভয় থেকে মনুষ্যগণকে পরিত্রাণের জন্য ব্রহ্মা কশ্যপ মুনিকে মন্ত্র বা বিদ্যা বিশেষ আবিষ্কারের জন্য আদেশ করেন। ব্রহ্মার আদেশে কশ্যপ যখন মনে মনে এ বিষয়ে চিন্তা করছিলেন তখন তাঁর মনন ক্রিয়ার সাকার রূপ পরিগ্রহ করে এক মহাদেবী দীপ্যমান হন। তিনটি কারণে এই মহাদেবীর নাম হয় মনসা। প্রথমত তিনি কশ্যপ মুনির মানস কন্যা, দ্বিতীয়ত মনুষ্যগণের মনই তাঁর ক্রীড়া ক্ষেত্র, তৃতীয়ত তিনি নিজেও মনে মনে বা যোগবলে পরমাত্মার ধ্যান করেন। মনসার দ্বাদশটি নাম আছে। জরৎকারু, জগদ্গৌরি, মনসা, সিদ্ধ যোগিনী, বৈষ্ণবী,নাগ ভগিনী, শৈবী, নাগেশ্বরী, জরৎকারু-প্রিয়া, আস্তিক-মাতা, বিষহরী, মহাজ্ঞানযুতা।

মনসা শব্দটির বিশ্লেষণ করলে অর্থ দাঁড়ায় মনে চিন্তন। কিন্তু দেবী রূপে মনসা কি চিন্তনের কোন বিষয়? মনের মধ্যে বিষ থাকতে পারে, সেই বিষ অবশ্যই মনকে বিষাক্ত করে এবং চিন্তার খোরাক যোগায়, মনন কে সুখশ্রাবী করার জন্য মন্ত্রের উদ্ভব। মন্ত্রই মনকে ঊর্ধ্বগামী করে। সেই মন যদি বিষক্রিয়ায় জর্জরিত হয় তবে তো সমগ্র দেহই বিষাক্ত হয়ে যাবে। তাই মনসার উৎপত্তি যেমন আর্যঋষি গণ দেখিয়েছেন বিষহরী দেবীরুপে সেরূপ বিষহরণ করে মনকে বিষযুক্ত করারও ব্যবস্থা তার হাতে। সাপের দাঁতে বিষ আছে কিন্তু নিজে যখন খায় তাতে বিষ লাগে না। কিন্তু হিংসায় বা আত্মরক্ষায় যখন দংশন করে তখন দংশিত স্থানে বিষ ছড়ায়। তাই মনে বিষ হলো হিংসা ক্রোধ, লোভ এগুলো দূর করার দেবী মনসা। চিন্তা থেকে আমাদের মুক্তি নেই তবু চিন্তা যাতে যুক্ত হতে পারে, চিন্তা যাতে রিপুর বশ না হয় তার চেষ্টাই আমাদের করতে হবে-এই শিক্ষাই দিয়েছেন দেবী মনসা।

                     মনসা দেবীর পরিচয়

মনসা বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় সর্পদেবী। মনসা মধ্যযুগের লোক কাহিনী বিষয়ক মনসামঙ্গল কাব্যের প্রধান চরিত্র। প্রতিটি প্রাচীন জনগোষ্ঠীর গাথা-কাহিনীর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে রয়েছে সর্প-সংশ্লেষ।

প্রাচীন মেসোপটমিয়া, মিশর, গ্রিস, ক্রিট, ফিনিশিয়া, স্ক্যান্ডিনেভিয়া প্রভৃতি দেশে সর্পপূজার প্রমাণ পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০-৩০০০ অব্দের সুমেরিয় শিল্পকলার নিদর্শনে দুটি পেচানো সাপের প্রতীকী উপস্থাপনা দেখা যায়।

মিশরের ফারাওদের প্রতীক ছিল সাপ এবং ঈগল। এছাড়া তাদের ভূদেবতার মাথা ছিল সর্পাকৃতির এবং তিনি ছিলেন সকল সাপের অধিষ্ঠাতা দেবতা। হরপ্পা সভ্যতার সিলে সর্প-মানবের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে গ্রিকবীর আলেকজান্ডারের সঙ্গে ভারতে আসা সঙ্গীদের বর্ণনায় ভারতবর্ষে সর্প পূজার জন প্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আলেকজান্ডার যখন ভারতে একের পর এক নগর অধিকার করছিলেন তখন তিনি কোনো এক স্থানে অন্যান্য পশুর সঙ্গে বৃহদাকৃতির সাপকে গুহার মধ্যে আবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান।

অথর্ববেদে প্রথমবারের মতো ঘৃতাচী নামক কিরাত কন্যার সর্পবিশ নাশের ক্ষমতার বর্ণনা পাওয়া যায়।

গৃহ্যসূত্রে সর্পদংশন থেকে কীভাবে রক্ষা পাওয়া যায় সে উপায় বর্ণিত হয়েছে- বর্ষাকালে চার মাস মাটিতে শয্যা নিষিদ্ধ, শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা রাতে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উঁচু শয্যা এবং কয়েক মাস পরে অগ্রহায়ণ পূর্ণিমায় প্রত্যাবোরহন নামক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুনরায় ঘরের মেঝেতে শয্যা যাপন শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে সর্পদংশন থেকে রক্ষা পেতে শ্রাবণ-পূর্ণিমা থেকে অগ্রাহায়ণ-পূর্ণিমা পর্যন্ত প্রত্যহ সাপের উদ্দেশে বিভিন্ন ভোগ দেওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু সম্প্রদায় দেবী মনসার পূজা আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে পালন করে। বর্ষার প্রকোপে এ সময় সাপের বিচরণ বেড়ে যায়, তাই সাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ভক্তকূল দেবীর আশ্রয় প্রার্থনা করে। এছাড়া ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্তুতির জন্য সর্পদেবীর ভক্ত তার দ্বারস্থ হয়। মনসা একজন লৌকিক দেবী। তবুও তার অসাধারণ জনপ্রিয়তার কারণে হিন্দু সমাজের সকল সম্প্রদায় তাকে দেবী হিসেবে মর্যাদা দেয়। আদি পুরাণ গুলিতে মনসার কোনো উল্লেখ নেই। অপেক্ষাকৃত নবীন পুরান ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান ও দেবীভাগবত পুরাণে মনসার উল্লেখ রয়েছে। মধ্যযুগের সাহিত্যকর্ম মনসামঙ্গল কাব্যে মনসার মাহাত্ম্য নিয়ে রচিত হয়েছে নানা গাথা কাহিনী।বৌদ্ধতন্ত্র মতে মনসাকে জাঙ্গুলি দেবী বলা হয়।

মনসার উৎপত্তি বিষয়ে পুরাণ ও মঙ্গলকাব্যে রয়েছে দু’ধরণের ভাষ্য। পুরাণের ভাষ্য অনুযায়ী ব্রহ্মার নির্দেশে কশ্যপ মুনি সর্প বিষনাশক মন্ত্র রচনাকালে ধ্যানমগ্নাবস্থায় মন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর আবির্ভাব ঘটে এবং তার মন থেকে আবির্ভাব ঘটায় দেবীর নাম হয় মনসা। পরবর্তী সময়ে তাকে বিয়ে দেওয়া হয় জরৎকারু মুনির সঙ্গে। মহাভারতে কশ্যপ ও কদ্রুর বিয়ে এবং তাদের ঘরে সহস্র সর্পের জন্ম সে সঙ্গে জরৎকারু ঋষির সঙ্গে সর্পরাজ বাসুকির বোন জরৎকারুর বিয়ে এবং আস্তিক মুনির জন্মলাভের কাহিনী বিবৃত হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে আস্তিক মুনি রাজা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ হতে মাতৃকূলকে রক্ষা করেন অর্থাৎ নাগ বংশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে। মহাভারতে মনসা নামক কোনো সর্পদেবীর উল্লেখ নেই। তবে এ কাহিনী ঈষৎ পরিবর্তিত হয়ে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান ও দেবীভাগবতম পুরাণে জরৎকারু স্ত্রী স্বনাম্নি জরৎকারুর স্থান দখল করেছে মনসা। পুরাণের কাহিনী অনুযায়ী মনসা কশ্যপ মুনির কন্যা। তিনি জন্মের পর কৈলাসপর্বতে গিয়ে হাজার বছর আরাধনা করে মহাদেবের কাছ থেকে দিব্যজ্ঞান লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে, কশ্যপ মুনি কন্যা মনসাকে জরৎকারু ঋষির নিকট সম্প্রদান করেন। কোনো এক সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় ঘুমন্ত স্বামীকে উপাসনার জন্য জাগালে, জরৎকারু ক্রোধান্বিত হয়ে স্ত্রী পরিত্যাগে উদ্যত হলে মনসার কাতর আহবানে বিষ্ণু, মহাদেব, কশ্যপ মুনির নিকট উপস্থিত হয়ে স্ত্রী পরিত্যাগে জরৎকারুকে নিবৃত করতে ব্যর্থ হয়। তবে নিজ ধর্ম রক্ষার্থে মনসার গর্ভে পুত্র উৎপাদনের আদেশ করেন দেবতাগণ। জরৎকারু দেবতাদের অনুরোধ রক্ষা করতে মন্ত্রবলে মনসার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করেন। সন্তানের নাম রাখা হয় আস্তিক, যিনি রাজা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ থেকে মাতৃকূল রক্ষা করেন। পুরাণে এভাবেই মনসার কাহিনী বিবৃত হয়েছে। পুরাণে মনসাকে কশ্যপ ও জরৎকারুর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ফলে তিনি মর্যাদা লাভ করেন।

অন্য এক কাহিনীতে, মঙ্গলকাব্যের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে মনসা ও চাঁদ সওদাগরকে কেন্দ্র করে। পৃথিবীতে মনসার পূজা প্রচলনের প্রধান বাধা চাঁদ সওদাগর। চাঁদ শিব উপাসক তাই সে নিম্নবর্গের উপাস্যকে অর্ঘ্যদানে অনাগ্রহী। কিন্তু চাঁদ সওদাগর যতটা অনাগ্রহী মনসা ততটাই আগ্রহী কারণ চাঁদের পূজা না পেলে ধরণীতে তার পূজা প্রতিষ্ঠিত হবে না। চাঁদের স্ত্রী মনসার উপাসক, মনসা চাঁদের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য একে একে তার ছয় ছেলেকে বাণিজ্য জাহাজসহ সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়। সর্বশেষ সন্তান লখিন্দরকে মনসার নির্দেশে বাসরঘরে সর্প দংশন করে। পুত্রবধূ বেহুলা স্বামী লখিন্দরের লাশ কলাগাছের ভেলায় ভাসিয়ে নদী পথ ধরে দেবপুরের উদ্দেশ্যে গমন করে এবং নানা বিপদ-আপদ পেরিয়ে অবশেষে নৃত্যগীতে দেবতাদের তুষ্ট করে। মহাদেব ও অন্যান্য দেবতাদের নির্দশে মনসা চাঁদ কর্তৃক ধরণীতে পূজার শর্তে লখিন্দরের জীবন সেই সঙ্গে চাঁদের অন্যান্য পুত্রদের সপ্তডিঙ্গাসহ ফিরিয়ে দেয়। বেহুলা ও চাঁদের স্ত্রী শুলকার পুনঃপুনঃ অনুরোধে অবশেষে চাঁদ মনসাকে পূজা দিতে রাজি হয় এবং মর্ত্যলোকে প্রতিষ্ঠিত হয় মনসা পূজা।

মঙ্গলকাব্যে শিবের কন্যা হিসেবেও দেখানো হয়েছে মনসাকে। বাংলায় শিব এক অতিসাধারণ হতদরিদ্র দেবতা যিনি কুঁড়েঘরে বাস করেন, যার সঙ্গে সমুদ্র মন্থনে প্রাপ্ত অনল পানকারী ত্রিশূলধারী পৌরাণিক শিবের অনেক পার্থক্য। বাংলায় শিব সাধারণ মানুষের  আপনজন হিসেবে ‘ঈশ্বর’ ও মহাকাল। 'গোসাই’ হিসেবে পরিচিত- যার প্রতীক লাঙল। মঙ্গলকাব্যের এ কাহিনীর মধ্যে লুকিয়ে আছে সাধারণের মধ্যে প্রবল জনপ্রিয় এক দেবীর অনেক প্রচেষ্টার পর উচ্চবর্গের স্বীকৃতি আদায়ের বিবরণ। কোনো কোনো মনসামঙ্গল কাব্যে মনসার আরেক নাম সিদ্ধযোগিনী।

মনসা নামটির উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে নানা মত- কারো মতে, ভারতের কানাড়া অঞ্চল থেকে ‘মনে-মাঞ্চাম্মা’ নামক দেবীর নাম থেকে মনসা নামটি এসেছে, কারো মতে মহীশূরের ‘মুদামা’ নামক দেবীর নাম থেকে নামটি বাংলায় এসেছে। আবার কারো মতে ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরাঞ্চল প্রদেশের ‘মনসা’ দেবী বা মধ্যপ্রদেশের কোল উপজাতীয়দের ‘মনসা দেও’ নামক দেবতার নাম থেকে এসেছে নামটি। মনে-মঞ্চাম্মা’র অস্তিত্ব বাস্তবে নেই, সে এক অদৃশ্য সাপিনীর নাম, এ সাপিনীর উপর দেবীত্ব আরোপ করে বছরে একদিন নাগপঞ্চমীর দিনে পূজা নিবেদন করা হয়, তার কোনো প্রতিমা নির্মিত হয় না। মুদামা অর্ধ-নারী অর্ধ-সর্প আকৃতির প্রতিমা এবং নিম্নবর্গ কর্তৃক পূজিত কিন্তু সমাজের উচ্চকোটিতে পৌরাণিক চরিত্র সর্পরাজ বাসুকি জনপ্রিয়। পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরাঞ্চল প্রদেশের মনসা কোনো উল্লেখযোগ্য দেবী নয় আর মনসা দেও কোনো দেবী নয় দেবতার নাম। ফলে বাংলার জনপ্রিয় দেবী মনসার নাম এসব অপ্রধান দেবী থেকে আসার সম্ভাবনা কম। মনসা এদেশেরই দেবী।
 
যেমনঃ— অনন্ত , শিষ , বাসুকি প্রভৃতি উদাহরণ স্বরূপ বিষ্ণুর মস্তকের উপরে থাকে শিষ নাগ ।

                 মনসামঙ্গলের মূল কাহিনী

"নেতা বলে বিষহরী, হেথা রহিয়া কি বা করি মর্তভূবনে চল যাই। মর্তভূবনে গিয়া, ছাগ-মহিষ বলি খাইয়া, সেবকেরে বর দিতে চাই"

কবি বিজয় গুপ্তের লেখা আখ্যানধর্মী কাব্য মনসামঙ্গল বা #পদ্মপুরাণ এর সূচনা হয়েছে এই চরণদুটির মাধ্যমে। ধারণা করা হয় এই কাব্যের আদি কবি কানা হরিদত্ত। সম্ভবত ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ বা চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে তিনি বর্তমান ছিলেন। তার রচিত কোন কাব্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তার পরিচয় পাওয়া যায় কবি বিজয় গুপ্তের কাব্যে। বিজয় গুপ্ত তার বদনাম করার কারনে তার পরিচয় পাওয়া যায়।

“মুর্খে রচিল গীত, না জানে বৃত্তান্ত। প্রথমে রচিল গীত, কানাহরি দত্ত।" এখানে গীত মানে মনসামঙ্গল কাব্য।
কবি বিজয় গুপ্ত নিজের #আত্মপরিচয় দিয়েছেন। ‘পদ্মাপুরাণ’ তথা ‘মনসা মঙ্গলের’ পদে। ফতেয়াবাদ মুলুকের বাঙ্গজোড়া তকসিমের অন্তর্গত ঘাগর নদীর পূর্ব, গন্ডেশ্বর নদীর পশ্চিমে ফুল্লশ্রী গ্রামে তাঁর নিবাস ছিল (বর্তমান নাম গৈলা, বরিশাল জেলা)। গ্রামটি ছিল বেশ শিক্ষা দীক্ষায় উন্নত। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য জাতির আবাস এই গ্রামে শাস্ত্র চর্চার প্রাবল্য ছিল। বিজয় গুপ্ত নিজে বৈদ্য ছিলেন। তাঁর পিতা সনাতন গুপ্ত, মাতা ছিলেন রুক্মিনী।

                   বিজয়ের গুপ্তরে ভাষ্য

"সনাতন তনয় রুক্মিনী গর্ভজাত,
সেই বিজয় গুপ্তরে রাখ জগন্নাথ।।

"মনসামঙ্গল একটি আখ্যানকাব্য। এই কাব্যের প্রধান আখ্যানটিও আবর্তিত হয়েছে মর্ত্যলোকে মনসার নিজ পূজা প্রচারের প্রয়াসকে কেন্দ্র করে। কাব্যের মূল উপজীব্য চাঁদ সদাগরের উপর দেবী মনসার অত্যাচার, চাঁদের পুত্র লখিন্দরের সর্পাঘাতে মৃত্যু ও পুত্রবধূ বেহুলার আত্মত্যাগের উপাখ্যান। এই কাব্যে সেযুগের হিন্দু বাঙালি সমাজের সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি, আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদি সম্পর্কে নানা অনুপূঙ্খ বর্ণনা পাওয়া যায়। চাঁদ সদাগর শুধুমাত্র এই কাব্যেরই নয়, বরং সমগ্র বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বলিষ্ঠ চরিত্র।

বেহুলা-লখিন্দরের করুণ উপাখ্যানটিও তার মানবিক আবেদনের কারণে আজও বাঙালি সমাজে জনপ্রিয়। 
মনসামঙ্গল কাব্যের প্রধান দেবতা সর্পদেবী মনসা। মনসা মূলগতভাবে অনার্য দেবী। ভারতের আদিবাসী ও অন্ত্যজ সমাজে সর্পদেবী মনসার পূজা সুপ্রচলিত। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, খ্রিষ্টীয় দশম-একাদশ শতাব্দীতে বাংলায় মনসার পূজা প্রবর্তিত হয়।

পদ্মপুরাণ, দেবীভাগবত পুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত
পুরাণ - এর মতো কয়েকটি আধুনিক উপপুরাণ গ্রন্থে দেবী মনসার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই গ্রন্থগুলি অবশ্য খ্রিষ্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্বে রচিত হয়নি। লৌকিক দেবী হলেও কালক্রমে মনসা ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক হিন্দুসমাজেও প্রতিপত্তি অর্জন করে।

এমনকি চৈতন্যদেবের সমসাময়িক কালে শিক্ষিত
বাঙালি সমাজেও মনসার পূজা প্রচলিত হয়। মনসার জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কে পদ্মপুরাণ হতে জানা যায়।

বাসুকীর মা একটি ছোটো মেয়ের মূর্তি নির্মাণ করেছিলেন। শিবের বীর্য এই মূর্তি স্পর্শ করলে মনসার জন্ম হয়। বাসুকী তাঁকে নিজ ভগিনীরূপে গ্রহণ করেন। রাজা পৃথু পৃথিবীকে গাভীর ন্যায় দোহন করলে উদগত বিষের দায়িত্বও বাসুকী মনসাকে দেন। শিব মনসাকে দেখে কামার্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু মনসা প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে তিনি শিবেরই কন্যা। শিব তখন মনসাকে স্বগৃহে আনয়ন করেন। শিবের পত্নী চণ্ডী মনসাকে শিবের উপপত্নী মনে করেন। তিনি মনসাকে অপমান করেন এবং ক্রোধবশত তাঁর একটি চোখ দগ্ধ করেন। পরে শিব একদা বিষের জ্বালায় কাতর হলে মনসা তাঁকে রক্ষা করেন। একবার চণ্ডী তাঁকে পদাঘাত করলে তিনি তাঁর বিষদৃষ্টি হেনে চণ্ডীকে অজ্ঞান করে দেন। শেষে মনসা ও চণ্ডীর কলহে হতাশ হয়ে শিব মনসাকে পরিত্যাগ করেন। দুঃখে শিবের চোখ থেকে যে জল পড়ে সেই জলে জন্ম হয় মনসার সহচরী নেতার। পরে জরৎকারুর সঙ্গে মনসার বিবাহ হয়। কিন্তু চণ্ডী মনসার ফুলশয্যার রাতটিকে ব্যর্থ করে দেন। তিনি মনসাকে উপদেশ দিয়েছিলেন সাপের অলঙ্কার পরতে আর বাসরঘরে ব্যাঙ ছেড়ে রাখতে যাতে সাপেরা আকর্ষিত হয়ে তাঁর বাসরঘরে উপস্থিত হয়। এর ফলে, ভয় পেয়ে জরৎকারু পালিয়ে যান। পরে তিনি ফিরে আসেন এবং তাঁদের পুত্র আস্তিকের জন্ম হয়।

মনসামঙ্গল মতে মনসা তাঁর সহচরী নেতার সঙ্গে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন মানব ভক্ত সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে। প্রথম দিকে লোকেরা তাঁকে ব্যঙ্গ করে। কিন্তু যারা তাকে পূজা করতে অস্বীকার করে, তাদের চরম দুরবস্থা সৃষ্টি করে তাদের পূজা আদায় করেন মনসা। তিনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের পূজা লাভে সক্ষম হন। এমনকি মুসলমান শাসক হাসানও তাঁর পূজা করেন। কিন্তু শিব ও চণ্ডীর পরমভক্ত চাঁদ সদাগর তাঁর পূজা করতে অস্বীকার করেন। পূর্বজন্মে চাঁদকে মনসা একটি অভিশাপ দিয়েছিলেন। তার পাল্টা অভিশাপে মনসার ভক্ত সংগ্রহে অসুবিধা হতে থাকে। কারণ এই শাপে বলা হয়েছিল, চাঁদ মনসার পূজা না করলে মর্ত্যে মনসার পূজা প্রচলন লাভ করবে না। চাঁদের পূজা আদায়ের জন্য মনসা চাঁদের ছয় পুত্রকে হত্যা করেন এবং তাঁকে নিঃস্ব করে দেন। পরে তিনি চাঁদের কনিষ্ঠ পুত্র লখিন্দরকে হত্যা করলে, তাঁর বিধবা পুত্রবধূ বেহুলা চাঁদকে মনসা পূজায় রাজি করাতে সক্ষম হন। চাঁদ মনসার দিকে না তাকিয়ে বাম হাতে তাঁকে ফুল ছুঁড়ে দেন। মনসা তাতেই খুশি হয়ে চাঁদের ছয় পুত্রকে জীবিত করেন এবং তাঁর সকল সম্পত্তি ফিরিয়ে দেন। এরপরই মনসা পূজা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। শ্রাবণ, একমাস ধরে মনসামঙ্গল কাব্যগ্রন্থটি আসরে বসে সুর করে পাঠ করা হয়। অতঃপর শ্রাবণের নাগপঞ্চমী তিথিতে মনসার পূজা করা হয়।

অনেকের কাছে মনসামঙ্গল কোন ধর্মীয়গ্রন্থ নয়। এক মহাকাব্য। মনসামঙ্গল বা পদ্মাপু্রাণ মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্য ধারার অন্যতম প্রধান কাব্য। এই ধারার অপর দুই প্রধান কাব্য চণ্ডীমঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল কাব্যের তুলনায় মনসামঙ্গল প্রাচীনতর। এই কাব্যের আদি কবি কানাহরি দত্ত সম্ভবত ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ বা চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বর্তমান ছিলেন। অনুমিত হয়, মনসামঙ্গল কাব্যের উৎপত্তি পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অথবা বিহার অঞ্চলে। পরে পূর্ববঙ্গ ও উত্তরবঙ্গেও এই কাব্যের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

         অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন,

"বাংলা দেশের নানা অঞ্চলে বহু মনসামঙ্গল কাব্য পাওয়া গিয়েছে, তন্মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কাব্যগুলি ‘মনসামঙ্গল’ ও পূর্ববঙ্গে প্রায়শই ‘পদ্মাপুরাণ’ নামে পরিচিত। মনসামঙ্গল কাব্যের প্রধান দেবতা সর্পদেবী মনসা। মনসা মূলগতভাবে অনার্য দেবী। ভারতের আদিবাসী ও অন্ত্যজ সমাজে সর্পদেবী মনসার পূজা সুপ্রচলিত। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, খ্রিষ্টীয় দশম-একাদশ শতাব্দীতে বাংলায় মনসার পূজা প্রবর্তিত হয়। 
 কেউ কেউ আবার ভিন্ন তথ্য পরিবেশনা করেন -
"ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে মনসা ঋষি কশ্যপের কন্যা। একদা সর্প ও সরীসৃপগণ পৃথিবীতে কলহ শুরু করলে কশ্যপ তাঁর মন থেকে মনসার জন্ম দেন। ব্রহ্মা তাঁকে সর্প ও সরীসৃপদের দেবী করে দেন। মনসা মন্ত্রবলে বিশ্বের উপর নিজ কর্তৃত্ব স্থাপন করেন। এরপর মনসা শিবের সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করেন। শিব তাঁকে কৃষ্ণ -আরাধনার উপদেশ দেন। মনসা কৃষ্ণের আরাধনা করলে কৃষ্ণ তুষ্ট হয়ে তাঁকে সিদ্ধি প্রদান করেন এবং প্রথামতে তাঁর পূজা করে মর্ত্যলোকে তাঁর দেবীত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। কশ্যপ জরুৎকারুর সঙ্গে মনসার বিবাহ দেন। মনসা তাঁর অবাধ্যতা করলে, তিনি মনসাকে ত্যাগ করবেন– এই শর্তে জরুৎকারু মনসাকে বিবাহ করেন। একদা মনসা দেরি করে তাঁর নিদ্রাভঙ্গ করলে তাঁর পূজায় বিঘ্ন ঘটে। এই অপরাধে জরুৎকারু মনসাকে ত্যাগ করেন। পরে দেবতাদের অনুরোধে তিনি মনসার কাছে ফিরে আসেন এবং আস্তিক নামে তাঁদের একটি পুত্রসন্তান পূজায় বিঘ্ন ঘটে। এই অপরাধে জরুৎকারু মনসাকে ত্যাগ করেন। পরে দেবতাদের অনুরোধে তিনি মনসার কাছে ফিরে আসেন এবং আস্তিক নামে তাঁদের একটি পুত্রসন্তান জন্মায়।

"পদ্মপুরাণ, দেবীভাগবত পুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এর মতো কয়েকটি আধুনিক উপপুরাণ গ্রন্থে দেবী মনসার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই গ্রন্থগুলি অবশ্য খ্রিষ্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্বে রচিত হয়নি। লৌকিক দেবী হলেও কালক্রমে মনসা ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক হিন্দু সমাজেও প্রতিপত্তি অর্জন করে। এমনকি চৈতন্যদেবের সমসাময়িক কালে শিক্ষিত বাঙালি সমাজেও মনসার পূজা প্রচলিত হয়। এবং মনসামঙ্গল কাব্য মঙ্গলকাব্য গুলির অধিকাংশ চৈতন্য পূর্ব যুগে লেখা। মঙ্গলকাব্য প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতি, পোষাক - পরিচ্ছদ- আহার বিহার- সমাজ জীবন যাত্রা জানবার উপায়। কারন বাঙ্গালী কবি গণ স্বর্গের দেব দেবীদের বাঙালিয়ানা দিয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন মঙ্গল কাব্য গুলিতে। এবং কবিরা নিজের সময় জীবনযাত্রা, সংস্কৃতিকেই মঙ্গলকাব্যে ফুটিয়ে দিয়েছেন। তবে মঙ্গলকাব্যের বর্ণনা শুনে দেব দেবীদের প্রতি ভক্তির থেকে ভয় আসে বেশী। বঙ্গপ্রদেশ নদীমাতৃক। এমন ছায়া ভরা, ঠান্ডা শীতল পরিবেশে নাগেদের বাসস্থানের উপযুক্ত। তাই নাগের সাথে মানুষের সংঘাত ও বিষাক্ত ছোবোলে মৃত্যু- এই ভয় থেকেই বাংলায় মনসা পূজা বিস্তৃতি হয়। তাছাড়া হিন্দু ধর্মে নাগকে কুণ্ডলিনী শক্তি ধরা হয়। নিদ্রিত অবস্থায় নাগ কুণ্ডলী মেরে পড়ে থাকে, জাগ্রত অবস্থায় সে ফনা তোলে। যোগের দ্বারা যোগীরা কুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণ ঘটান। মনসামঙ্গল কাব্যের ঘটনা সকলেরই জানা। মনসামঙ্গল কাব্যে সর্বপ্রথম গীত রচনা করেন কানা হরিদত্ত নামক এক কবি। তাঁর রচনার কোনো লিপি পাওয়া যায় না। বরিশাল জেলার গৈলা গ্রামে মনসামঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি বিজয়গুপ্ত জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর রচনায় তিনি কানা হরিদত্ত নামক এক কবির নাম উল্লেখ করেছেন। বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল রচনার কাল ১৪৯৪ খ্রীঃ।

বসিরহাট চব্বিশ পরগনার কাছে বিপ্রদাস পিপলাই নামক এক কবির নাম পাওয়া যায়। ১৪৯৫ অব্দে তিনি মনসামঙ্গল কাব্যরচনা করেন বলে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিকদের মত। নারায়ন দেব নামক এক কবির কথা পাওয়া যায়। তাঁর নাম সুকবিবল্লভ নারায়নদেব। এঁনার মনসামঙ্গল কাব্য অসম ও বাংলাদেশে উভয় স্থানে জনপ্রিয় উভয় জায়গার লোক এঁদের নিজের লোক বলে দাবী করেন। তবে শ্রীহট্ট ও ময়মনসিংহ স্থানে এই কবির সমর্থন বেশী। অনেকে মনে করেন সুকবিবল্লভ ও নারায়ন দেব দুজন আলাদা কবি।

চৈতন্য পরবর্তী যুগে কিছু মনসামঙ্গল কাব্যের কবির নাম পাওয়া যায়। “বাইশ কবি পদ্মাপুরাণ” নামক এক কাব্য পাওয়া যায়। বলা হয় ২২ জন কবি মিলে এই কাব্য রচনা করেছেন। দ্বিজ বংশীদাস নামক এক কবির নাম পাওয়া যায়। তিনি ময়মনসিংহের। এই কবি পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর রচনায় অলঙ্কার ও ছন্দের বিন্যাস প্রয়োগ দেখা যায়। ১৫৭৫-৭৬ সনের মধ্যে ইনি কাব্য রচনা সম্পন্ন করেন। কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ নামক এক কবির নাম পাওয়া যায়। তিনি বাংলার মানচিত্র ও ভগৌলিক পরিচয় বেহুলার যাত্রাপথের সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। উত্তরবঙ্গের জগজ্জীবন ঘোষাল নামক এক কবির সন্ধান পাওয়া যায়। এছাড়া সপ্তদশ শতকে বেশ কয়েকজন কবির নাম পাওয়া গেলেও তাঁদের রচনা খুব একটা উল্লেখ্য নয়। মনসামঙ্গল কাব্যে সতী রূপে বেহুলা চরিত্র, পুত্রহারা সনকার করুন চরিত্র, তেজোদীপ্ত পুরুষ রূপে চাঁদ বণিক ও ক্রোধী দেবী রূপেই মনসা চরিত্র কে ব্যাখায়িত করা হয়েছে।

মনসামঙ্গল কাব্য চৈতন্য পূর্ব যুগের বাংলা ভাষা, ছন্দ, অলঙ্কার, সমাজ সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটায়।

                    পদ্মাপুরাণের PDF ইবুক
https://upload.wikimedia.org/wikisource/bn/4/4a/%E0%A6%AA%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%A3_-_%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%A3_%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%AC.pdf

আশাকরি পাঠকগন মনসা পূজাের বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা পাবেন। ভালো লাগলে অবশ্যই বিষয়টি শেয়ার করতে ভুলবেন না।

জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব
                      (শ্রী বাবলু মালাকার)
মনসাপূজা উপলক্ষে আপনাদের সবাইকে শুভেচ্ছা জানাই। মা ভবতারিণী আপনাদের সবার মঙ্গল করুন।

Post a Comment

0 Comments