নাসাদিয় সুক্ত ও হিরন্যগর্ভ সুক্ত গুলো
"নাসাদাসিস নঃ সদাসিত্ তদানীম নাসিদ রজ ন ব্যামাপ্রো যৎ..."
"শুরুতে কোন অস্তিত্ব (সৎ) বা অনস্তিত্ব (অসৎ) ছিলনা।সেখানে ছিলনা কোন বায়ুমন্ডল"
(ঋগবেদ ১০/১২৯/১)
"তম অসিৎ তমস... তপসস্তন্মহিনাজায়াতৈকম”
"চারদিক ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। সমস্ত জিনিস একত্রে পুন্জীভুত ছিল। সেখান থেকে প্রচন্ড তাপের সৃষ্টি হল"
(ঋগবেদ ১০/১২৯/৩)
পবিত্র বেদের গুরুত্বপূর্ণ হিরন্যগর্ভ সুক্তঃ—
"হিরন্যগর্ভ সামাভরতাগ্রে.."
"প্রথমেই হিরন্যগর্ভ সৃষ্টি হল"
(ঋগবেদ ১০/১২১/১)
যঃ প্রানতো নিমিষতো মহিত্বৈক ইদ রাজা জগতো বভূব।
য ঈশে অস্য দ্বিপদশ্চতুষ্পদঃ কস্মৈ দেবায় হবিষ বিধেম।।
(ঋগ্বেদ ১০.১২১.৩)
অনুবাদ-সেই মহত্তম,যিনি নিশ্চিতভাবেই সকল জীব ও জড়জগতের প্রভু,সকল মনুষ্য ও প্রানীজগতের স্রষ্টা, সেই অদ্বিতীয়কে ভিন্ন কাকেই বা উপাসনা করব!
"আপ হ য়দ বৃহাতিরিবিশ্বমায়ান গর্ভম..."
"সেই হিরন্যগের্ভ ছিল উত্তপ্ত তরল যাতে ছিল সৃষ্টির সমস্ত বীজ"
(ঋগবেদ ১০/১২১/৭)
একই ধরনের কথা বলছে শতপথ ব্রাহ্মণ ১১.১.৬.১
"হিরন্যগর্ভানি অপঃ তে সলিলা..."
"প্রথমে হিরন্যগর্ভ সৃষ্টিহল। সেখানেছিল উত্তপ্ত গলিত তরল। এটি ছিল মহাশুন্যে ভাসমান। বছরের পরবছর এই অবস্থায় অতিক্রান্ত হয়।"
"তারপর যেখানে বিস্ফোরন ঘটল গলিত পদার্থ থেকে, বিন্দু থেকে যেন সব প্রসারিত হতে শুরু হল"
(ঋগবেদ ১০.৭২.২)
"সেই বিস্ফোরিত অংশসমূহ থেকে বিভিন্ন গ্রহ,নক্ষত্র তৈরী হল"
(ঋগবেদ ১০.৭২.৩)
"তার এক জীবনপ্রদ অংশ থেকে পৃথিবী সৃষ্টি হল"
(ঋগবেদ ১০.৭২.৪)
"তারপর সৃষ্ট ক্ষেত্রে সাতধাপে সংকোচন-প্রসারন সম্পন্ন হল। তারপর সৃষ্টি হল ভারসাম্যের।"
(ঋগবেদ ১০.৭২.৮-৯)
এই অংশটুকু পরলেই স্পষ্ট বোঝা যায় বেদের সৃষ্টিতত্ত আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ।সৃষ্টিতত্তের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মডেল “Lambda-CDM Concordance Model” অনুযায়ী “The evolution of the universe from a very uniform, hot, dense primordial state to its present অর্থাৎ একটি উত্তপ্ত, কেন্দ্রীভূত আদি অবস্থা থেকেই বর্তমান অবস্থার উত্থান।” এছাড়া বেদএ উল্লেখিত বিস্ফোরণ বর্তমান বিশ্বের বহুল আলোচিত বিগ ব্যাংগ তত্তের সাথে প্রায় পুরোপুরি মিলে যায়। আশ্চর্যের এখানেই শেষ নয়।
বেদ এর মতে সৃষ্টির শুরুতেই ওঁম উচ্চারিত হয় আর এর প্রভাবেই হয় বিস্ফোরন। বেদান্ত সূত্র (4/22) "অনাবৃতিঃ শব্দহম" অর্থাৎ শব্দের মাধ্যমেই সৃষ্টির শুরু যা মাত্র দুই বছর আগে বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছেন। এই শব্দ তরঙ্গকে আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় Cosmic sound wave বলা হয়। ইউনিভার্সিটি অব এরিজোনা এর এস্ট্রোনমির প্রফেসর ডেনিয়েল জে আইনস্টাইন এবং জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যার প্রফেসর চার্লস বার্নেটের সম্মিলিত আর্টিকেল "Cosmic sound wave rules" থেকে কি করে এই শব্দের মাধ্যমে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হল তার ব্যখ্যা দেয়া হল। আমরা জানি যে সৃষ্টির শুরুতে মহাবিশ্ব ছিল একটি ঘন, উত্তপ্ত পিন্ড (বেদের ভাষায় হিরন্যগর্ভ বা হিরন্ময় ডিম)।
এই পিন্ডের মধ্যস্থিত পদার্থসমূহকে Cosmologist রা দুই ভাগে ভাগ করেন- Baryonic&Non-baryonic.Baryonic পদার্থ হল ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন। এইসময় এরা সকলেই ছিল আয়নিত অবস্থায়। প্রসারন শুরু হবার জন্য মূল ভূমিকা ই ছিল এই উত্তপ্ত ও আয়নিত Baryonic পদার্থগুলোর মধ্যস্থিত ইলেকট্রনগুলোর মাধ্যমে নিঃসৃত ফোটন কনাগুলো (Compton scattering of photon from electron)। এই ফোটন কনাগুলো উত্তপ্ত প্লাসমার সাথে Baryon-photon fluid তৈরী করে।কনাসমূহের মধ্যে সংঘর্ষের কারনে এই Fluid এর সংকোচন ঘটে কিন্তু এই সংকোচিত প্লাসমাই ফোটনসমূহকে উচ্চ বেগে বিচ্ছুরিত করে। যে স্থান থেকে ফোটনসমূহ নির্গত হয়ে যায় সেই স্থান ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় সেখানে একটি নিম্নচাপ যুক্ত স্থান তৈরী হয় যা তার চারদিকের Fluid দ্বারা চাপ প্রাপ্ত হয়। আর এই চাপই সেই পানিতে একটি শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করে, শুধু পার্থক্য হল এই যে এখানে কাউকে মুখে শব্দ করে তরঙ্গ তৈরী করতে হয়নি বরং ফোটন নির্গত হয়ে যাওয়ায় সৃষ্ট চাপের কারনেই এই তরঙ্গের তৈরী হয়। আর বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্ব মতে এই শব্দ হল ওঁ, তাই বেদের সৃষ্টিতত্ত্বের পড়ে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এর Dr. Kevin Hurley বলেছিলেন।
"How could Aryan sages have known all this 6000 years ago, when scientists have only
recently discovered this using advanced equipments which didn't exist that time!"
নোবেল লরেট Count Maurice Maeterlinck বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে বলেন "A Cosmogony which no European conception has ever surpassed!"
সূর্যের সৃষ্টি কীভাবে হলো? বলা হয় আকাশ গঙ্গা বা ছায়াপথ থেকে। আবার বলা হয় আকাশ গঙ্গা সৃষ্টি হয়েছে Big Bang বা 'আদি বিস্ফোরণ' এর মাধ্যমে। কিন্তু এই Big Bang এর পূর্বে কি ছিল তা কিন্তু বিজ্ঞান বলতে পারে না। বেদের ঋষি এখানে বিষয়টি ব্রহ্মের উপর ছেড়ে দিয়েছেন।
শ্রীমদ্ভগবত গীতা ১০ম অধ্যায় - (বিভূতি যোগ)
শ্লোক নং- ০৬
শ্রী ভগবান উবাচ
মহর্ষয়ঃ সপ্ত পূর্বে চত্বারো মনবস্তথা ।
মদভাবা মানসা জাতা যেষাং লোক ইমাঃ প্রজাঃ ।। ৬ ।।
#অর্থঃ– সপ্ত মহর্ষি,তাঁদের পূর্বজাত সনকাদি চার কুমার ও চতুর্দশ মনু, সকলেই আমার মন থেকে উৎপন্ন হয়ে আমা হতে জন্মগ্রহণ করেছে এবং এই জগতের স্থাবর-জঙ্গম আদি সমস্ত প্রজা তাঁরাই সৃষ্টি করেছেন।
#তাৎপর্যঃ– পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এখানে এই ব্রহ্মান্ডের অধিবাসীদের সংক্ষিপ্ত বংশানুক্রমিক বিবরণ দান করেছেন। সৃষ্টির আদিতে পরমেশ্বর ভগবানের হিরন্যগর্ভ নামক শক্তি থেকে প্রথম ব্রহ্মার সৃষ্টি হয়। ব্রহ্মা থেকে সপ্ত ঋষি এবং তাঁদের আগে চারজন মহর্ষি-সনক, সনন্দ, সনাতন ও সনৎকুমার এবং তারপর চতুদর্শ মনুর সৃষ্টি হয়। এই পঁচিশজন মহর্ষিরা হচ্ছেন সমগ্র ব্রহ্মান্ডের জীবসমূহের পিতৃকুল। এই জগতে অনন্ত ব্রহ্মান্ড রয়েছে এবং প্রতিটি ব্রহ্মান্ডে অগনিত গ্রহলোক রয়েছে এবং প্রতিটি গ্রহলোক নানা রকম প্রানী দ্বারা অধ্যুষিত। তারা সকলেই এই পঁচিশজন পিতৃপুরুষের দ্বারা জাত।
➡ ব্রহ্মা দেবতাদের সময়ের হিসেবে এক সহস্র বৎসর কঠোর তপস্যা করার পর জানতে পারেন কিভাবে জগৎ সৃষ্টি করতে হবে। তারপর ব্রহ্মা থেকে সনক, সনন্দ, সনাতন ও সনৎকুমারের আবির্ভাব হয় । তার পরে রুদ্র ও সপ্ত ঋষি এবং এভাবেই সমস্ত ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়েরা পরম পুরুষোত্তম ভগবানের শক্তি থেকে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রহ্মাকে বলা হয় পিতামহ এবং শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন প্রপিতামহ। কারন, তিনি পিতামহ ব্রহ্মারও পিতা। ভগবদগীতার একাদশ অধ্যায়ে (১১/৩৯) এই বিষয়ে বর্ননা করা হয়েছে ।
ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি।
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, চট্টগ্রাম)

0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার